ঢাকা ০৩:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৬ মে ২০২৬

‘জোড়াতালি’ দিয়ে চলছে হাম মোকাবিলা, উপেক্ষিত বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ: মৃত্যু প্রায় ৩০০

বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। গত দেড় মাসে হাম ও এর উপসর্গে প্রায় ২৯৪ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। বর্তমানে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ৫ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে এবং সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৪০ হাজারেরও বেশি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ‘সর্বোচ্চ আন্তরিকতার’ কথা বললেও বাস্তবে বিশেষজ্ঞ কমিটির একাধিক সুপারিশ উপেক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতের চরম সমন্বয়হীনতার চিত্র উঠে এসেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এই পরিস্থিতিকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশ কার্যত একটি মহামারীর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সরকার এখনও ‘জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা’ ঘোষণা করেনি। হাসপাতালে শয্যা বাড়ানো এবং আইসোলেশনের নির্দেশ দেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় লজিস্টিক ও জনবল সহায়তার অভাবে অনেক হাসপাতালই ধুঁকছে। বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চলে আইসিইউ সংকটে শিশু মৃত্যুর ঘটনা দেশজুড়ে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

কেন এই বিপর্যয়?
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে বিগত বছরগুলোর টিকাদান কর্মসূচির ব্যর্থতা। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ২০২০ সালে কোভিডের কারণে নিয়মিত বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইনগুলো ব্যাহত হয়েছিল। এর ফলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে। এছাড়া টিকা ও সিরিঞ্জ কেনায় দীর্ঘসূত্রতা এবং অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে, যার ফলে কেন্দ্রীয় ভাণ্ডারে বর্তমানে বেশ কিছু জরুরি টিকার মজুদ শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

উপেক্ষিত কারিগরি সুপারিশ
ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি (NVC) ও নাইট্যাগ (NiTAG) গত এপ্রিলের শুরুতেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছিল:

  • কোনো এলাকায় হাম শনাক্ত হলে নতুন করে পরীক্ষার প্রয়োজন নেই, উপসর্গ দেখলেই আইসোলেশন নিশ্চিত করতে হবে।
  • বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কার্যকর কমিটি গঠন করতে হবে যারা প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেবে।
  • হাম মোকাবিলায় জনস্বাস্থ্যবিধির ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে।

বাস্তবে এই কমিটিগুলোর সুপারিশ আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পর্যন্ত সময়মতো পৌঁছায়নি। এমনকি টিকাদান কর্মসূচির (EPI) প্রধান কর্মকর্তাকে ওএসডি করায় পুরো ব্যবস্থাপনায় স্থবিরতা নেমে এসেছে।

চিকিৎসায় সমন্বয়হীনতা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতিটি হাসপাতালে হামের বিশেষায়িত ইউনিট করার নির্দেশ দিলেও হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেন, শয্যা ও দক্ষ জনবলের ঘাটতি প্রবল। স্বাস্থ্য সচিব ও মহাপরিচালকের বক্তব্যেও তথ্যের অমিল পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগুন লাগার পর তা নেভানোর মতো ‘তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা’ দিয়ে এমন বড় জনস্বাস্থ্য বিপর্যয় মোকাবিলা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

বর্তমানে সারাদেশে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চললেও টিকার মজুদ ফুরিয়ে যাওয়া এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের বেতন-ভাতা সংক্রান্ত অসন্তোষ এই কার্যক্রমকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। সব মিলিয়ে, দেশের শিশুস্বাস্থ্য এখন চরম ঝুঁকির মুখে, যেখানে সরকারি ব্যবস্থাপনা অনেকটাই ‘জোড়াতালি’র ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

হামের চিকিৎসা কেন্দ্র প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান: ঢাবি প্রশাসন ও ডাকসুর পাল্টাপাল্টি দোষারোপ

‘জোড়াতালি’ দিয়ে চলছে হাম মোকাবিলা, উপেক্ষিত বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ: মৃত্যু প্রায় ৩০০

আপডেট সময় : ০৩:২৬:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬

বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। গত দেড় মাসে হাম ও এর উপসর্গে প্রায় ২৯৪ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। বর্তমানে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ৫ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে এবং সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৪০ হাজারেরও বেশি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ‘সর্বোচ্চ আন্তরিকতার’ কথা বললেও বাস্তবে বিশেষজ্ঞ কমিটির একাধিক সুপারিশ উপেক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতের চরম সমন্বয়হীনতার চিত্র উঠে এসেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এই পরিস্থিতিকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশ কার্যত একটি মহামারীর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সরকার এখনও ‘জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা’ ঘোষণা করেনি। হাসপাতালে শয্যা বাড়ানো এবং আইসোলেশনের নির্দেশ দেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় লজিস্টিক ও জনবল সহায়তার অভাবে অনেক হাসপাতালই ধুঁকছে। বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চলে আইসিইউ সংকটে শিশু মৃত্যুর ঘটনা দেশজুড়ে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

কেন এই বিপর্যয়?
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে বিগত বছরগুলোর টিকাদান কর্মসূচির ব্যর্থতা। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ২০২০ সালে কোভিডের কারণে নিয়মিত বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইনগুলো ব্যাহত হয়েছিল। এর ফলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে। এছাড়া টিকা ও সিরিঞ্জ কেনায় দীর্ঘসূত্রতা এবং অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে, যার ফলে কেন্দ্রীয় ভাণ্ডারে বর্তমানে বেশ কিছু জরুরি টিকার মজুদ শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

উপেক্ষিত কারিগরি সুপারিশ
ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি (NVC) ও নাইট্যাগ (NiTAG) গত এপ্রিলের শুরুতেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছিল:

  • কোনো এলাকায় হাম শনাক্ত হলে নতুন করে পরীক্ষার প্রয়োজন নেই, উপসর্গ দেখলেই আইসোলেশন নিশ্চিত করতে হবে।
  • বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কার্যকর কমিটি গঠন করতে হবে যারা প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেবে।
  • হাম মোকাবিলায় জনস্বাস্থ্যবিধির ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে।

বাস্তবে এই কমিটিগুলোর সুপারিশ আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পর্যন্ত সময়মতো পৌঁছায়নি। এমনকি টিকাদান কর্মসূচির (EPI) প্রধান কর্মকর্তাকে ওএসডি করায় পুরো ব্যবস্থাপনায় স্থবিরতা নেমে এসেছে।

চিকিৎসায় সমন্বয়হীনতা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতিটি হাসপাতালে হামের বিশেষায়িত ইউনিট করার নির্দেশ দিলেও হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেন, শয্যা ও দক্ষ জনবলের ঘাটতি প্রবল। স্বাস্থ্য সচিব ও মহাপরিচালকের বক্তব্যেও তথ্যের অমিল পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগুন লাগার পর তা নেভানোর মতো ‘তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা’ দিয়ে এমন বড় জনস্বাস্থ্য বিপর্যয় মোকাবিলা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

বর্তমানে সারাদেশে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চললেও টিকার মজুদ ফুরিয়ে যাওয়া এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের বেতন-ভাতা সংক্রান্ত অসন্তোষ এই কার্যক্রমকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। সব মিলিয়ে, দেশের শিশুস্বাস্থ্য এখন চরম ঝুঁকির মুখে, যেখানে সরকারি ব্যবস্থাপনা অনেকটাই ‘জোড়াতালি’র ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।