ঢাকা ১২:২৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬

ঋণের চাপে বাংলাদেশ: অর্থনীতি কি ধীরে ধীরে ‘ঋণের ফাঁদে’ ঢুকছে?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৪৫:০০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬
  • ১৯ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ, রাজস্ব ঘাটতি ও সুদ পরিশোধের বাড়তি চাপের কারণে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ৮ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা পুরো বছরের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছে ৭৮ হাজার ৪৯ কোটি টাকা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ৩০ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আয়ের ঘাটতি ও পরিচালন ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে গিয়ে সরকারকে অতিরিক্ত ঋণ ও টাকা ছাপানোর মতো পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সর্বশেষ ঋণ বুলেটিন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের মোট সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা গত কয়েক বছরে দ্রুত বেড়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক— দুই ধরনের ঋণই সমানতালে বাড়ছে। ২০০৯ সালে সরকারি ঋণের পরিমাণ যেখানে ছিল প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৮ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায়। পরবর্তীতে বৈদেশিক ঋণের পুনর্মূল্যায়নসহ নতুন ঋণ যুক্ত হয়ে এই অঙ্ক আরও বেড়েছে। বর্তমানে মোট ঋণের প্রায় ৫৭ শতাংশ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া হলেও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতাও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার বাজেট সহায়তা হিসেবে আগের তুলনায় বেশি বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও জানিয়েছেন, প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা নিয়েই বর্তমান সরকার কাজ শুরু করেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যেতে পারে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, বাংলাদেশ এখনও সরাসরি ঋণ সংকটে না পড়লেও বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ‘ঋণের ফাঁদে’ পড়ার ঝুঁকি বাড়বে। কারণ সরকারের ব্যয়ের বড় অংশ এখন ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই মোট ব্যয়ের প্রায় ২৬ শতাংশ ব্যয় হয়েছে শুধু সুদ পরিশোধে। এতে শিক্ষা ও উন্নয়নসহ সামাজিক খাতে ব্যয় সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-এর সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করে বলেছেন, দেশি-বিদেশি ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক এবং এ ধারা চলতে থাকলে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদেও পড়তে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে করজাল সম্প্রসারণ, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংস্কার, সাশ্রয়ী বৈদেশিক ঋণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

মিস গ্লোব বাংলাদেশ ২০২৬ হলেন ফারিয়া সালোমে

ঋণের চাপে বাংলাদেশ: অর্থনীতি কি ধীরে ধীরে ‘ঋণের ফাঁদে’ ঢুকছে?

আপডেট সময় : ১০:৪৫:০০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ, রাজস্ব ঘাটতি ও সুদ পরিশোধের বাড়তি চাপের কারণে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ৮ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা পুরো বছরের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছে ৭৮ হাজার ৪৯ কোটি টাকা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ৩০ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আয়ের ঘাটতি ও পরিচালন ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে গিয়ে সরকারকে অতিরিক্ত ঋণ ও টাকা ছাপানোর মতো পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সর্বশেষ ঋণ বুলেটিন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের মোট সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা গত কয়েক বছরে দ্রুত বেড়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক— দুই ধরনের ঋণই সমানতালে বাড়ছে। ২০০৯ সালে সরকারি ঋণের পরিমাণ যেখানে ছিল প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৮ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায়। পরবর্তীতে বৈদেশিক ঋণের পুনর্মূল্যায়নসহ নতুন ঋণ যুক্ত হয়ে এই অঙ্ক আরও বেড়েছে। বর্তমানে মোট ঋণের প্রায় ৫৭ শতাংশ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া হলেও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতাও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার বাজেট সহায়তা হিসেবে আগের তুলনায় বেশি বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও জানিয়েছেন, প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা নিয়েই বর্তমান সরকার কাজ শুরু করেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যেতে পারে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, বাংলাদেশ এখনও সরাসরি ঋণ সংকটে না পড়লেও বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ‘ঋণের ফাঁদে’ পড়ার ঝুঁকি বাড়বে। কারণ সরকারের ব্যয়ের বড় অংশ এখন ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই মোট ব্যয়ের প্রায় ২৬ শতাংশ ব্যয় হয়েছে শুধু সুদ পরিশোধে। এতে শিক্ষা ও উন্নয়নসহ সামাজিক খাতে ব্যয় সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-এর সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করে বলেছেন, দেশি-বিদেশি ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক এবং এ ধারা চলতে থাকলে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদেও পড়তে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে করজাল সম্প্রসারণ, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংস্কার, সাশ্রয়ী বৈদেশিক ঋণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।