ঢাকা ০৩:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬

হকার পুনর্বাসনের নামে ডিজিটাল চাঁদাবাজি ও নগরবাসীর ক্রমবর্ধমান ভোগান্তি

ঢাকার ফুটপাত দখলমুক্ত করার লক্ষ্যে পরিচালিত সাম্প্রতিক উচ্ছেদ অভিযানগুলো এখন চরম বিতর্কের মুখে পড়েছে। সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদী কোনো পুনর্বাসন পরিকল্পনা ছাড়া আকস্মিক এসব অভিযানে সাময়িক স্বস্তি মিললেও কয়েকদিন যেতে না যেতেই রাজপথের পুরনো দৃশ্য ফিরে এসেছে। উচ্ছেদকৃত হকাররা পুনরায় ফুটপাত ও সড়কের সিংহভাগ দখল করে বসায় রাজধানীর মোড়ে মোড়ে তৈরি হচ্ছে তীব্র যানজট। নগরবাসী এই উচ্ছেদ কার্যক্রমকে কেবল ‘লোকদেখানো’ এবং ‘আইওয়াশ’ বলে অভিহিত করছেন। তাদের মতে, প্রশাসনের এই ‘ইঁদুর-বেড়াল’ খেলায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমার বদলে বরং কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন হকারদের জন্য ডিজিটাল ‘হকার কার্ড’ চালুর যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাকে ঘিরে উঠেছে গুরুতর সব অভিযোগ। গুলিস্তান ও মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এই কার্ড বিতরণে স্বচ্ছতার পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে যে, বর্তমানে সিটি করপোরেশনের প্রশাসকদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে একটি নির্দিষ্ট বলয়ের নেতাদের সুপারিশ ছাড়া এই কার্ড পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

অনেক হকার জানিয়েছেন, আগে যারা ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করত, তাদের বদলে এখন নতুন প্রভাবশালীরা এর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এই কার্ড পাওয়ার জন্য হকারদের কাছ থেকে এককালীন বড় অঙ্কের অর্থ এবং নিয়মিত দৈনিক চাঁদা আদায়ের অভিযোগও এখন ওপেন সিক্রেট। হকারদের একটি অংশ মনে করছে, টাকা দিয়ে এই কার্ড সংগ্রহ করার মাধ্যমে তারা এখন সড়কে বসার এক ধরণের ‘অলিখিত বৈধতা’ পেয়ে গেছে, ফলে পুলিশ বা ম্যাজিস্ট্রেট চাইলেই আর তাদের আগের মতো সরিয়ে দিতে পারবে না।

অন্যদিকে, নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা এই কার্ড ব্যবস্থার আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, ফুটপাত বা সড়ক পথচারী ও যানবাহন চলাচলের জন্য সংরক্ষিত, সেখানে কাউকে ব্যবসার জন্য কার্ড দেওয়ার অর্থ হলো রাষ্ট্রীয় জায়গায় অবৈধ দখলদারিত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় নীতিমালা এবং হকারদের জন্য পৃথক জোন নির্ধারণ না করে এভাবে হুটহাট কার্ড বিতরণ করা নগরীর নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

পথচারীদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা রাখার কথা সিটি করপোরেশন দাবি করলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বর্তমানে হকারদের এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়া এবং কার্ড কেন্দ্রিক জটিলতা কেবল ফুটপাতের দখলদারিত্বই বাড়াচ্ছে না, বরং সরকারের ভাবমূর্তিও সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সাধারণ নাগরিকদের দাবি, দ্রুত এই চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব বন্ধ করে একটি বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে হকারদের স্থায়ী কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় স্থানান্তর করা হোক, যাতে রাজপথ ও ফুটপাত কেবল জনগণের চলাচলের জন্যই উন্মুক্ত থাকে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের পর সহিংসতার চিত্র উদ্বেগজনক: লেখকের পর্যবেক্ষণ

হকার পুনর্বাসনের নামে ডিজিটাল চাঁদাবাজি ও নগরবাসীর ক্রমবর্ধমান ভোগান্তি

আপডেট সময় : ১১:৪১:০০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬

ঢাকার ফুটপাত দখলমুক্ত করার লক্ষ্যে পরিচালিত সাম্প্রতিক উচ্ছেদ অভিযানগুলো এখন চরম বিতর্কের মুখে পড়েছে। সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদী কোনো পুনর্বাসন পরিকল্পনা ছাড়া আকস্মিক এসব অভিযানে সাময়িক স্বস্তি মিললেও কয়েকদিন যেতে না যেতেই রাজপথের পুরনো দৃশ্য ফিরে এসেছে। উচ্ছেদকৃত হকাররা পুনরায় ফুটপাত ও সড়কের সিংহভাগ দখল করে বসায় রাজধানীর মোড়ে মোড়ে তৈরি হচ্ছে তীব্র যানজট। নগরবাসী এই উচ্ছেদ কার্যক্রমকে কেবল ‘লোকদেখানো’ এবং ‘আইওয়াশ’ বলে অভিহিত করছেন। তাদের মতে, প্রশাসনের এই ‘ইঁদুর-বেড়াল’ খেলায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমার বদলে বরং কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন হকারদের জন্য ডিজিটাল ‘হকার কার্ড’ চালুর যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাকে ঘিরে উঠেছে গুরুতর সব অভিযোগ। গুলিস্তান ও মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এই কার্ড বিতরণে স্বচ্ছতার পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে যে, বর্তমানে সিটি করপোরেশনের প্রশাসকদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে একটি নির্দিষ্ট বলয়ের নেতাদের সুপারিশ ছাড়া এই কার্ড পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

অনেক হকার জানিয়েছেন, আগে যারা ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করত, তাদের বদলে এখন নতুন প্রভাবশালীরা এর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এই কার্ড পাওয়ার জন্য হকারদের কাছ থেকে এককালীন বড় অঙ্কের অর্থ এবং নিয়মিত দৈনিক চাঁদা আদায়ের অভিযোগও এখন ওপেন সিক্রেট। হকারদের একটি অংশ মনে করছে, টাকা দিয়ে এই কার্ড সংগ্রহ করার মাধ্যমে তারা এখন সড়কে বসার এক ধরণের ‘অলিখিত বৈধতা’ পেয়ে গেছে, ফলে পুলিশ বা ম্যাজিস্ট্রেট চাইলেই আর তাদের আগের মতো সরিয়ে দিতে পারবে না।

অন্যদিকে, নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা এই কার্ড ব্যবস্থার আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, ফুটপাত বা সড়ক পথচারী ও যানবাহন চলাচলের জন্য সংরক্ষিত, সেখানে কাউকে ব্যবসার জন্য কার্ড দেওয়ার অর্থ হলো রাষ্ট্রীয় জায়গায় অবৈধ দখলদারিত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় নীতিমালা এবং হকারদের জন্য পৃথক জোন নির্ধারণ না করে এভাবে হুটহাট কার্ড বিতরণ করা নগরীর নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

পথচারীদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা রাখার কথা সিটি করপোরেশন দাবি করলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বর্তমানে হকারদের এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়া এবং কার্ড কেন্দ্রিক জটিলতা কেবল ফুটপাতের দখলদারিত্বই বাড়াচ্ছে না, বরং সরকারের ভাবমূর্তিও সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সাধারণ নাগরিকদের দাবি, দ্রুত এই চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব বন্ধ করে একটি বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে হকারদের স্থায়ী কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় স্থানান্তর করা হোক, যাতে রাজপথ ও ফুটপাত কেবল জনগণের চলাচলের জন্যই উন্মুক্ত থাকে।