ঢাকা ১০:২৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬

মোহাম্মদপুরে ১৬ গ্যাংয়ের রাজত্ব: অপরাধের ‘রাজা’দের কবলে জিম্মি জনজীবন

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:০৫:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
  • ১২ বার পড়া হয়েছে

রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকাটি মাত্র ৭ দশমিক ৪৪ বর্গকিলোমিটারের হলেও এটি বর্তমানে অপরাধীদের এক বিশাল অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৬টি দুর্ধর্ষ গ্যাং পুরো মোহাম্মদপুরকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছে এবং এসব গ্যাংয়ে অন্তত ২৫১ জন সক্রিয় সদস্য রয়েছে। গত ১২ এপ্রিল রায়েরবাজারে দিনদুপুরে এলেক্স ইমনকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ভিডিও চিত্র বা এর চারদিন পর লম্বু আসাদুল খুনের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তোয়াক্কা না করেই তাদের ‘রাজত্ব’ চালিয়ে যাচ্ছে। খুন, ছিনতাই, মাদক কারবার এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা সাধারণ মানুষের মধ্যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।

এলাকাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রায়েরবাজার ও বেড়িবাঁধ এলাকায় রাজত্ব করছে ১৫-১৬ সদস্যের ‘পাটালী গ্রুপ’। চাঁদ উদ্যান ও ভাঙ্গা মসজিদ এলাকা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে ‘লেভেল হাই গ্রুপ’। নবোদয়, ঢাকা উদ্যান ও চন্দ্রিমা হাউজিংয়ের মতো বিশাল এলাকায় ১৫-২০ জন সদস্য নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ‘আনোয়ার গ্রুপ’। বুদ্ধিজীবী ১নং গেট ও বোর্ডঘাট এলাকা ‘ফরহাদ গ্রুপ’-এর দখলে। বসিলা ও রায়েরবাজারের বিভিন্ন অংশ ভাগ করে নিয়েছে ‘আর্মি আলমগীর’, ‘নবী গ্রুপ’ এবং ‘ডাইল্লা গ্রুপ’। এছাড়া ‘এলেক্স গ্রুপ’, ‘আকবর গ্রুপ’, ‘ল ঠেলা’, ‘ভাইব্বা ল কিং’ এবং ‘চেতালেই ভেজাল’-এর মতো গ্যাংগুলো নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক মাদক সেবন, ইভটিজিং ও ছিনতাইয়ের রাজত্ব কায়েম করেছে। এই অপরাধী চক্রগুলো শুধু স্থানীয়ভাবে অরাজকতা সৃষ্টি করে না, বরং চুক্তিতে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে লোকবল সরবরাহ এবং মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিজেদের সাম্রাজ্য শক্তিশালী করছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৬ থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত সাতদিনে তেজগাঁও বিভাগের ছয়টি থানা থেকে ৪২৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৬৮ জনই মোহাম্মদপুর এলাকার। পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার ইবনে মিজান জানিয়েছেন, মোহাম্মদপুর এলাকাটি বড় হওয়ায় একযোগে সব জায়গায় অভিযান চালানো সম্ভব হয় না, তবে বসিলা ও ঢাকা উদ্যানের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত চিরুনি অভিযান চলছে। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এসব অপরাধীদের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতা থাকায় পুলিশ অনেক সময় শক্ত অবস্থান নিতে পারে না। অনেক অপরাধী গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় একই অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও চরম আতঙ্ক তৈরি করেছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মোহাম্মদপুরের এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে শুধু সাময়িক অভিযান যথেষ্ট নয়। সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের মতে, জেনেভা ক্যাম্পের মতো অপরাধের কেন্দ্রবিন্দুগুলোকে পুরোপুরি নির্মূল করতে হবে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। মামলার নথিতে কোনো ফাঁক রাখা যাবে না যাতে অপরাধীরা সহজেই জামিন পেতে পারে। মোহাম্মদপুরের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রান্তিক মানুষের ঘনবসতি এবং অনেক ভাসমান অপরাধীর আশ্রয়স্থল হওয়ার কারণে এখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার ও প্রযুক্তিনির্ভর করা জরুরি। সাধারণ মানুষের মধ্যে হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে অপরাধীদের এই মাকড়সার জাল ছিন্ন করা এখন সময়ের দাবি।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

বটবাহিনী দিয়ে রাজনীতি হয় না, মানুষের পাশে থেকে কাজ করতে হয়: শামা ওবায়েদ

মোহাম্মদপুরে ১৬ গ্যাংয়ের রাজত্ব: অপরাধের ‘রাজা’দের কবলে জিম্মি জনজীবন

আপডেট সময় : ০৯:০৫:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬

রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকাটি মাত্র ৭ দশমিক ৪৪ বর্গকিলোমিটারের হলেও এটি বর্তমানে অপরাধীদের এক বিশাল অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৬টি দুর্ধর্ষ গ্যাং পুরো মোহাম্মদপুরকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছে এবং এসব গ্যাংয়ে অন্তত ২৫১ জন সক্রিয় সদস্য রয়েছে। গত ১২ এপ্রিল রায়েরবাজারে দিনদুপুরে এলেক্স ইমনকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ভিডিও চিত্র বা এর চারদিন পর লম্বু আসাদুল খুনের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তোয়াক্কা না করেই তাদের ‘রাজত্ব’ চালিয়ে যাচ্ছে। খুন, ছিনতাই, মাদক কারবার এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা সাধারণ মানুষের মধ্যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।

এলাকাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রায়েরবাজার ও বেড়িবাঁধ এলাকায় রাজত্ব করছে ১৫-১৬ সদস্যের ‘পাটালী গ্রুপ’। চাঁদ উদ্যান ও ভাঙ্গা মসজিদ এলাকা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে ‘লেভেল হাই গ্রুপ’। নবোদয়, ঢাকা উদ্যান ও চন্দ্রিমা হাউজিংয়ের মতো বিশাল এলাকায় ১৫-২০ জন সদস্য নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ‘আনোয়ার গ্রুপ’। বুদ্ধিজীবী ১নং গেট ও বোর্ডঘাট এলাকা ‘ফরহাদ গ্রুপ’-এর দখলে। বসিলা ও রায়েরবাজারের বিভিন্ন অংশ ভাগ করে নিয়েছে ‘আর্মি আলমগীর’, ‘নবী গ্রুপ’ এবং ‘ডাইল্লা গ্রুপ’। এছাড়া ‘এলেক্স গ্রুপ’, ‘আকবর গ্রুপ’, ‘ল ঠেলা’, ‘ভাইব্বা ল কিং’ এবং ‘চেতালেই ভেজাল’-এর মতো গ্যাংগুলো নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক মাদক সেবন, ইভটিজিং ও ছিনতাইয়ের রাজত্ব কায়েম করেছে। এই অপরাধী চক্রগুলো শুধু স্থানীয়ভাবে অরাজকতা সৃষ্টি করে না, বরং চুক্তিতে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে লোকবল সরবরাহ এবং মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিজেদের সাম্রাজ্য শক্তিশালী করছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৬ থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত সাতদিনে তেজগাঁও বিভাগের ছয়টি থানা থেকে ৪২৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৬৮ জনই মোহাম্মদপুর এলাকার। পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার ইবনে মিজান জানিয়েছেন, মোহাম্মদপুর এলাকাটি বড় হওয়ায় একযোগে সব জায়গায় অভিযান চালানো সম্ভব হয় না, তবে বসিলা ও ঢাকা উদ্যানের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত চিরুনি অভিযান চলছে। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এসব অপরাধীদের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতা থাকায় পুলিশ অনেক সময় শক্ত অবস্থান নিতে পারে না। অনেক অপরাধী গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় একই অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও চরম আতঙ্ক তৈরি করেছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মোহাম্মদপুরের এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে শুধু সাময়িক অভিযান যথেষ্ট নয়। সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের মতে, জেনেভা ক্যাম্পের মতো অপরাধের কেন্দ্রবিন্দুগুলোকে পুরোপুরি নির্মূল করতে হবে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। মামলার নথিতে কোনো ফাঁক রাখা যাবে না যাতে অপরাধীরা সহজেই জামিন পেতে পারে। মোহাম্মদপুরের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রান্তিক মানুষের ঘনবসতি এবং অনেক ভাসমান অপরাধীর আশ্রয়স্থল হওয়ার কারণে এখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার ও প্রযুক্তিনির্ভর করা জরুরি। সাধারণ মানুষের মধ্যে হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে অপরাধীদের এই মাকড়সার জাল ছিন্ন করা এখন সময়ের দাবি।