দেশের প্রধান খাদ্যশস্য ইরি-বোরো মৌসুমের ভরা চাষাবাদ চলাকালে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের কৃষিখাতে। সার ও সেচ সুবিধার অনিশ্চয়তায় কৃষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম আতঙ্ক। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এরই মধ্যে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, জ্বালানি তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
ত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন কৃষিপ্রধান জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। নওগাঁ সদরের কৃষক বজলুর রহমান জানান, ডিজেল সংকটের কারণে পাম্প মালিকরা ঠিকমতো পানি দিতে পারছেন না। মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হওয়ায় পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদী অনাবৃষ্টিতে ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। অনেক এলাকায় পাম্প মালিকরা এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায় ঘুরেও পর্যাপ্ত ডিজেল সংগ্রহ করতে পারছেন না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বোরো ক্ষেতে।
সরকার সারের পর্যাপ্ত মজুতের দাবি করলেও মাঠ পর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা যুদ্ধের অজুহাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন। গাইবান্ধা ও রংপুরের কৃষকদের অভিযোগ, ডিলাররা সার নেই বলে ফিরিয়ে দিচ্ছেন, অথচ পর্দার আড়ালে চড়া দামে বিক্রি করছেন। বিশেষ করে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের ক্ষেত্রে প্রতি কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি গুণতে হচ্ছে প্রান্তিক চাষিদের।
বাংলাদেশের সারের চাহিদার বড় একটি অংশ মেটানো হয় সৌদি আরব ও কাতার থেকে আমদানির মাধ্যমে। এছাড়া দেশীয় উৎপাদনেও আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর নির্ভর করতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় সরবরাহ রুট বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি অনিরাপদ হয়ে পড়ায় এই আমদানি প্রক্রিয়া এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
তবে কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে ৫.৫ লাখ টন ইউরিয়া, ৩.২১ লাখ টন টিএসপি, ৫.৩৩ লাখ টন ডিএপি এবং ৩.৩১ লাখ টন এমওপি সারের মজুত রয়েছে, যা দিয়ে বর্তমান মৌসুম অনায়াসেই পার করা সম্ভব। কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহাম্মদ আশ্বস্ত করেছেন যে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বন্ধ থাকা সার কারখানাগুলো পুনরায় চালু করা এবং চীন ও মিসরের মতো বিকল্প উৎস থেকে সার আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিসিআইসি চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান জানিয়েছেন, দুবাইয়ের সঙ্গে জিটুজি চুক্তির আওতায় ৩ লাখ টন সার আমদানির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
বোরো আবাদের প্রায় ৬০ শতাংশই ডিজেলচালিত সেচের ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ কমে যাওয়ায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানির জন্য দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কৃষকদের তেল কেনার পরিমাণ সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খানের মতে, ডিজেল সরবরাহ ও ভর্তুকি নিশ্চিত করা না গেলে বোরো উৎপাদন ব্যাহত হবে, যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে।
সরকারের পক্ষ থেকে সেচ কাজে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ে তেলের জন্য হাহাকার কমছে না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দাবি, তেলের অভাবে কোথাও সেচ বন্ধ হয়নি, বরং ভবিষ্যৎ সংকটের আতঙ্কে কৃষকরা পাম্পে ভিড় করছেন। মাঠ পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে সক্রিয় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বড় ঋণ জালিয়াতি বা যুদ্ধের মতো বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় কেবল সাময়িক পদক্ষেপে কাজ হবে না। যদি দ্রুত বিকল্প জ্বালানি উৎস নিশ্চিত করা এবং সারের বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙা না যায়, তবে বোরো আবাদের উৎপাদন খরচ হেক্টর প্রতি ৫০০ টাকার বেশি বেড়ে যেতে পারে। এতে কৃষক লাভবান হওয়া তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খাবে।
রিপোর্টারের নাম 

























