ঢাকা ০৮:৩৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

যুদ্ধে লন্ডভন্ড শ্রমবাজার: অনিশ্চয়তায় ৬৫ হাজার বিদেশগামী কর্মী

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের প্রধান গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার এখন যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে। চলতি মাসের শুরুতে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আতঙ্কে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে জনশক্তি রপ্তানি খাত। দেশের মোট অভিবাসীর প্রায় ৬৭ শতাংশই যান সৌদি আরবে। এছাড়া কাতার, কুয়েত, আমিরাত ও জর্ডানের মতো শীর্ষ বাজারগুলো মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক হওয়ায় পুরো খাতটি এখন এক ভয়াবহ সংকটের মুখে।

তথ্যমতে, গত ২৮ মার্চ পর্যন্ত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যের মোট ৭৯৭টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে ১ ও ২ মার্চ সবচেয়ে বেশি (যথাক্রমে ৪০ ও ৪৬টি) ফ্লাইট বাতিল হয়। ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বেশ কয়েকটি দেশ তাদের আকাশসীমা বন্ধ রাখায় ঢাকার সঙ্গে এই অঞ্চলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ওমান বা জেদ্দার মতো দু-একটি রুট খোলা থাকলেও সাধারণ কর্মীদের জন্য সেই ভাড়া মেটানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিএমইটির পরিসংখ্যান বলছে, গত এক মাসে অন্তত ৬৫ হাজার কর্মী বিদেশে যাওয়ার কথা থাকলেও ফ্লাইট বন্ধের কারণে তারা যেতে পারেননি। যুদ্ধ শুরুর পর বিএমইটির ছাড়পত্র নেওয়ার হারও তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। ১ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত মাত্র ৩৬ হাজার ৬৭৩ জন ছাড়পত্র নিয়েছেন, যার অর্ধেকের বেশি সৌদি আরবের জন্য। তবে ছাড়পত্র থাকলেও ফ্লাইট না থাকায় কেউই দেশ ছাড়তে পারছেন না।

নতুন কর্মীদের পাশাপাশি ছুটিতে দেশে এসে আটকা পড়েছেন কয়েক হাজার প্রবাসী। কুয়েত প্রবাসী আহাদ ইসলামের মতো অনেকেই ১০-১৫ দিনের ছুটিতে এসে এখন ভিসা বাতিলের শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। যদিও কিছু দেশ ভিসার ব্যাপারে শিথিলতার আশ্বাস দিয়েছে, কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সেই সুযোগ কতদিন থাকবে তা নিয়ে সংশয় কাটছে না।

বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম এই পরিস্থিতিকে ‘আত্মবিশ্বাস তলানিতে ঠেকে যাওয়া’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি জানান, বিদেশি কোম্পানিগুলো ডিমান্ড নোট পাঠালেও কর্মী পাঠানোর নিশ্চয়তা না থাকায় তারা সেগুলো নিতে পারছেন না। অন্যদিকে, জনশক্তি রপ্তানিকারক মোবারক উল্ল্যাহ শিমুলের মতে, শুধুমাত্র সৌদি আরব বা মধ্যপ্রাচ্য নির্ভরতা এবং মালয়েশিয়া, জাপান বা ইউরোপের বাজারগুলো সঠিকভাবে ধরতে না পারায় আজ এই বিপর্যয় প্রকট হয়েছে।

শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে সম্ভাবনাময় রুশ শ্রমবাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু অসাধু চক্রের মাধ্যমে বাংলাদেশিদের রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার খবর এই বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ফলে বাংলাদেশের শ্রমবাজার এখন একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা এবং অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

পারমাণবিক ইস্যু অজুহাত, যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ইরান

যুদ্ধে লন্ডভন্ড শ্রমবাজার: অনিশ্চয়তায় ৬৫ হাজার বিদেশগামী কর্মী

আপডেট সময় : ১২:৫৭:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের প্রধান গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার এখন যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে। চলতি মাসের শুরুতে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আতঙ্কে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে জনশক্তি রপ্তানি খাত। দেশের মোট অভিবাসীর প্রায় ৬৭ শতাংশই যান সৌদি আরবে। এছাড়া কাতার, কুয়েত, আমিরাত ও জর্ডানের মতো শীর্ষ বাজারগুলো মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক হওয়ায় পুরো খাতটি এখন এক ভয়াবহ সংকটের মুখে।

তথ্যমতে, গত ২৮ মার্চ পর্যন্ত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যের মোট ৭৯৭টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে ১ ও ২ মার্চ সবচেয়ে বেশি (যথাক্রমে ৪০ ও ৪৬টি) ফ্লাইট বাতিল হয়। ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বেশ কয়েকটি দেশ তাদের আকাশসীমা বন্ধ রাখায় ঢাকার সঙ্গে এই অঞ্চলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ওমান বা জেদ্দার মতো দু-একটি রুট খোলা থাকলেও সাধারণ কর্মীদের জন্য সেই ভাড়া মেটানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিএমইটির পরিসংখ্যান বলছে, গত এক মাসে অন্তত ৬৫ হাজার কর্মী বিদেশে যাওয়ার কথা থাকলেও ফ্লাইট বন্ধের কারণে তারা যেতে পারেননি। যুদ্ধ শুরুর পর বিএমইটির ছাড়পত্র নেওয়ার হারও তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। ১ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত মাত্র ৩৬ হাজার ৬৭৩ জন ছাড়পত্র নিয়েছেন, যার অর্ধেকের বেশি সৌদি আরবের জন্য। তবে ছাড়পত্র থাকলেও ফ্লাইট না থাকায় কেউই দেশ ছাড়তে পারছেন না।

নতুন কর্মীদের পাশাপাশি ছুটিতে দেশে এসে আটকা পড়েছেন কয়েক হাজার প্রবাসী। কুয়েত প্রবাসী আহাদ ইসলামের মতো অনেকেই ১০-১৫ দিনের ছুটিতে এসে এখন ভিসা বাতিলের শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। যদিও কিছু দেশ ভিসার ব্যাপারে শিথিলতার আশ্বাস দিয়েছে, কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সেই সুযোগ কতদিন থাকবে তা নিয়ে সংশয় কাটছে না।

বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম এই পরিস্থিতিকে ‘আত্মবিশ্বাস তলানিতে ঠেকে যাওয়া’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি জানান, বিদেশি কোম্পানিগুলো ডিমান্ড নোট পাঠালেও কর্মী পাঠানোর নিশ্চয়তা না থাকায় তারা সেগুলো নিতে পারছেন না। অন্যদিকে, জনশক্তি রপ্তানিকারক মোবারক উল্ল্যাহ শিমুলের মতে, শুধুমাত্র সৌদি আরব বা মধ্যপ্রাচ্য নির্ভরতা এবং মালয়েশিয়া, জাপান বা ইউরোপের বাজারগুলো সঠিকভাবে ধরতে না পারায় আজ এই বিপর্যয় প্রকট হয়েছে।

শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে সম্ভাবনাময় রুশ শ্রমবাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু অসাধু চক্রের মাধ্যমে বাংলাদেশিদের রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার খবর এই বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ফলে বাংলাদেশের শ্রমবাজার এখন একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা এবং অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।