ঢাকা ১২:৫৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৮ মার্চ ২০২৬

১৮ তম তারাবি: কোরআন মহান আল্লাহর সত্য বাণী

## ১৮তম তারাবি: হেদায়েতের আলোয় কোরআনের শিক্ষা

আজকের তারাবিতে পবিত্র কোরআনের ২৯তম থেকে ৩৩তম সূরা, অর্থাৎ আনকাবুত (৪৫-৬৯), রুম, লোকমান, সিজদাহ এবং আহযাবের (১-৩০) আয়াত তেলাওয়াত করা হবে। এর মাধ্যমে ২১তম পারা সম্পন্ন হবে। এই অংশে আল্লাহর সত্য বাণী, নবীদের সত্যতা, মানব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা এবং ঐশী বিধিবিধানের এক অমূল্য ভান্ডার উন্মোচিত হবে।

সূরা আনকাবুত (৪৫-৬৯): সত্যের পথে অবিচল থাকার আহ্বান

সূরার শুরুতে কোরআন তেলাওয়াত ও সালাতের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। কোরআন যে আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এবং নবী মুহাম্মদ (সা.) যে নিরক্ষর হওয়া সত্ত্বেও এর জ্ঞান দান করেছেন, তা উল্লেখ করে কাফিরদের সন্দেহ খণ্ডন করা হয়েছে। বিশ্বাসীদের জন্য কোরআনই যথেষ্ট বলে ঘোষণা করা হয়েছে। সূরায় ধৈর্য ধারণ এবং মাতৃভূমি ত্যাগের সময় আল্লাহ তায়ালার রিজিক প্রদানের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে সান্ত্বনা দেওয়া হয়েছে। যারা আল্লাহর পথে সাধনা করে, আল্লাহ তাদের সুপথ দেখাবেন – এই আশ্বাস দিয়ে সূরার ইতি টানা হয়েছে।

সূরা রুম: আল্লাহর কুদরত ও ভবিষ্যদ্বাণীর সাক্ষ্য

এই সূরায় আল্লাহর সত্য কালাম কোরআনের একটি বিশেষ ভবিষ্যদ্বাণীর উল্লেখ রয়েছে। সেই সময়ে রোমানরা যখন চরম সংকটে ছিল, তখন কোরআন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে তারা পারসিকদের ওপর বিজয় লাভ করবে। এই ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবে পরিণত হলে মুশরিকরা হতবাক হয়ে গিয়েছিল। সূরায় আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি-কুশলতা, যেমন – জীবন থেকে মৃত্যু, নিষ্প্রাণ মাটি থেকে মানুষ সৃষ্টি, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি, নিদ্রা দ্বারা প্রশান্তি দান, আকাশে বিদ্যুৎ চমকানো এবং বৃষ্টি দ্বারা মৃত জমিকে পুনরুজ্জীবিত করা – এসব নিদর্শন তুলে ধরা হয়েছে। এ সবই তাওহীদ ও একত্ববাদের শিক্ষা দেয়। সুদ সম্পদ হ্রাস করে এবং যাকাত সম্পদ বৃদ্ধি করে, এমন গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাও এখানে রয়েছে।

সূরা লোকমান: প্রজ্ঞা ও নৈতিকতার আলোকবর্তিকা

সূরা লোকমানের সূচনা কোরআন নিয়ে আলোচনা দিয়ে। এরপর আল্লাহর সৃষ্টি-কুশলতার বিবরণ রয়েছে। সূরার দ্বিতীয় রুকুতে হজরত লোকমান (আ.) তাঁর সন্তানকে আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক না করা, বাবা-মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার, সালাত কায়েম করা, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বাধা দেওয়া, ধৈর্য ধারণ, অহংকার পরিহার, চলাফেরায় মধ্যম পন্থা অবলম্বন এবং নিচু স্বরে কথা বলার মতো গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ দিয়েছেন। এই উপদেশগুলো কেবল সন্তানের জন্য নয়, বরং সকল মুমিনের জন্য প্রযোজ্য। মানুষের রিজিক, মৃত্যু, কেয়ামত, বৃষ্টি এবং মাতৃগর্ভের বাচ্চা – এই পাঁচ বিষয়ের জ্ঞান কেবল আল্লাহর কাছেই রয়েছে – এমন ঘোষণার মাধ্যমে সূরায় আল্লাহর অসীম জ্ঞানের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।

সূরা সিজদাহ: ঈমান ও আমলের প্রতিদান

পূর্বের সূরার মতো এই সূরারও সূচনা কোরআন নিয়ে আলোচনা দিয়ে। এরপর আল্লাহর একত্ববাদ ও কুদরতের প্রমাণ, এবং সুষম আকৃতির মানুষ সৃষ্টির বিবরণ রয়েছে। সূরায় মোমিন ও অপরাধীদের দুনিয়া ও আখিরাতের অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। মোমিনরা আল্লাহর আনুগত্য করে রাত জেগে ইবাদত করে, তাই তাদের জন্য আখিরাতে রয়েছে নয়নাভিরাম প্রতিদান। পক্ষান্তরে কাফিরদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। মূসা (আ.)-কে তাওরাত দানের প্রসঙ্গ ধরে নবীজিকে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে এবং কাফিরদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সূরা আহযাব: সামাজিক শিষ্টাচার ও ঐশী বিধান

সূরা আহযাবে মৌলিকভাবে তিনটি বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে: সামাজিক শিষ্টাচার, ঐশী বিধিবিধান এবং নবী-যুগে সংঘটিত দুটি যুদ্ধ – গাজওয়ায়ে আহযাব ও গাজওয়ায়ে বনি কুরাইজা। যুদ্ধকালীন ঈমানদারদের অবস্থান এবং মুনাফিকদের কর্মকা-ের প্রতিও এখানে ইঙ্গিত রয়েছে। জাহেলি যুগের কিছু ধ্যানধারণা ও বিশ্বাসের খণ্ডন করা হয়েছে। পালকপুত্র সম্পর্কে ইসলামের নির্দেশনা এবং একই হৃদয়ে ঈমান ও কুফরের সম্মিলন ঘটতে পারে না মর্মে ঘোষণা রয়েছে। আল্লাহ-প্রার্থীদের জন্য নবীজীবনেই রয়েছে উত্তম আদর্শ – এই বার্তা দিয়ে সূরায় ঈমানদারদের জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

লেখক: সিনিয়র পেশ ইমাম, বুয়েট সেন্ট্রাল মসজিদ

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী পুরস্কার পেলেন খালেদা জিয়াসহ ৬ জন

১৮ তম তারাবি: কোরআন মহান আল্লাহর সত্য বাণী

আপডেট সময় : ০৮:২৮:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬

## ১৮তম তারাবি: হেদায়েতের আলোয় কোরআনের শিক্ষা

আজকের তারাবিতে পবিত্র কোরআনের ২৯তম থেকে ৩৩তম সূরা, অর্থাৎ আনকাবুত (৪৫-৬৯), রুম, লোকমান, সিজদাহ এবং আহযাবের (১-৩০) আয়াত তেলাওয়াত করা হবে। এর মাধ্যমে ২১তম পারা সম্পন্ন হবে। এই অংশে আল্লাহর সত্য বাণী, নবীদের সত্যতা, মানব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা এবং ঐশী বিধিবিধানের এক অমূল্য ভান্ডার উন্মোচিত হবে।

সূরা আনকাবুত (৪৫-৬৯): সত্যের পথে অবিচল থাকার আহ্বান

সূরার শুরুতে কোরআন তেলাওয়াত ও সালাতের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। কোরআন যে আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এবং নবী মুহাম্মদ (সা.) যে নিরক্ষর হওয়া সত্ত্বেও এর জ্ঞান দান করেছেন, তা উল্লেখ করে কাফিরদের সন্দেহ খণ্ডন করা হয়েছে। বিশ্বাসীদের জন্য কোরআনই যথেষ্ট বলে ঘোষণা করা হয়েছে। সূরায় ধৈর্য ধারণ এবং মাতৃভূমি ত্যাগের সময় আল্লাহ তায়ালার রিজিক প্রদানের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে সান্ত্বনা দেওয়া হয়েছে। যারা আল্লাহর পথে সাধনা করে, আল্লাহ তাদের সুপথ দেখাবেন – এই আশ্বাস দিয়ে সূরার ইতি টানা হয়েছে।

সূরা রুম: আল্লাহর কুদরত ও ভবিষ্যদ্বাণীর সাক্ষ্য

এই সূরায় আল্লাহর সত্য কালাম কোরআনের একটি বিশেষ ভবিষ্যদ্বাণীর উল্লেখ রয়েছে। সেই সময়ে রোমানরা যখন চরম সংকটে ছিল, তখন কোরআন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে তারা পারসিকদের ওপর বিজয় লাভ করবে। এই ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবে পরিণত হলে মুশরিকরা হতবাক হয়ে গিয়েছিল। সূরায় আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি-কুশলতা, যেমন – জীবন থেকে মৃত্যু, নিষ্প্রাণ মাটি থেকে মানুষ সৃষ্টি, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি, নিদ্রা দ্বারা প্রশান্তি দান, আকাশে বিদ্যুৎ চমকানো এবং বৃষ্টি দ্বারা মৃত জমিকে পুনরুজ্জীবিত করা – এসব নিদর্শন তুলে ধরা হয়েছে। এ সবই তাওহীদ ও একত্ববাদের শিক্ষা দেয়। সুদ সম্পদ হ্রাস করে এবং যাকাত সম্পদ বৃদ্ধি করে, এমন গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাও এখানে রয়েছে।

সূরা লোকমান: প্রজ্ঞা ও নৈতিকতার আলোকবর্তিকা

সূরা লোকমানের সূচনা কোরআন নিয়ে আলোচনা দিয়ে। এরপর আল্লাহর সৃষ্টি-কুশলতার বিবরণ রয়েছে। সূরার দ্বিতীয় রুকুতে হজরত লোকমান (আ.) তাঁর সন্তানকে আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক না করা, বাবা-মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার, সালাত কায়েম করা, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বাধা দেওয়া, ধৈর্য ধারণ, অহংকার পরিহার, চলাফেরায় মধ্যম পন্থা অবলম্বন এবং নিচু স্বরে কথা বলার মতো গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ দিয়েছেন। এই উপদেশগুলো কেবল সন্তানের জন্য নয়, বরং সকল মুমিনের জন্য প্রযোজ্য। মানুষের রিজিক, মৃত্যু, কেয়ামত, বৃষ্টি এবং মাতৃগর্ভের বাচ্চা – এই পাঁচ বিষয়ের জ্ঞান কেবল আল্লাহর কাছেই রয়েছে – এমন ঘোষণার মাধ্যমে সূরায় আল্লাহর অসীম জ্ঞানের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।

সূরা সিজদাহ: ঈমান ও আমলের প্রতিদান

পূর্বের সূরার মতো এই সূরারও সূচনা কোরআন নিয়ে আলোচনা দিয়ে। এরপর আল্লাহর একত্ববাদ ও কুদরতের প্রমাণ, এবং সুষম আকৃতির মানুষ সৃষ্টির বিবরণ রয়েছে। সূরায় মোমিন ও অপরাধীদের দুনিয়া ও আখিরাতের অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। মোমিনরা আল্লাহর আনুগত্য করে রাত জেগে ইবাদত করে, তাই তাদের জন্য আখিরাতে রয়েছে নয়নাভিরাম প্রতিদান। পক্ষান্তরে কাফিরদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। মূসা (আ.)-কে তাওরাত দানের প্রসঙ্গ ধরে নবীজিকে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে এবং কাফিরদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সূরা আহযাব: সামাজিক শিষ্টাচার ও ঐশী বিধান

সূরা আহযাবে মৌলিকভাবে তিনটি বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে: সামাজিক শিষ্টাচার, ঐশী বিধিবিধান এবং নবী-যুগে সংঘটিত দুটি যুদ্ধ – গাজওয়ায়ে আহযাব ও গাজওয়ায়ে বনি কুরাইজা। যুদ্ধকালীন ঈমানদারদের অবস্থান এবং মুনাফিকদের কর্মকা-ের প্রতিও এখানে ইঙ্গিত রয়েছে। জাহেলি যুগের কিছু ধ্যানধারণা ও বিশ্বাসের খণ্ডন করা হয়েছে। পালকপুত্র সম্পর্কে ইসলামের নির্দেশনা এবং একই হৃদয়ে ঈমান ও কুফরের সম্মিলন ঘটতে পারে না মর্মে ঘোষণা রয়েছে। আল্লাহ-প্রার্থীদের জন্য নবীজীবনেই রয়েছে উত্তম আদর্শ – এই বার্তা দিয়ে সূরায় ঈমানদারদের জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

লেখক: সিনিয়র পেশ ইমাম, বুয়েট সেন্ট্রাল মসজিদ