পবিত্র মাহে রমজানের ১৭তম তারাবিতে আজ তিলাওয়াত করা হবে পবিত্র কোরআনের ২০তম পারা। আজকের তারাবিতে সূরা আন-নামলের শেষাংশ (আয়াত ৬০-৯৩), সম্পূর্ণ সূরা আল-কাসাস এবং সূরা আল-আনকাবুতের প্রথমাংশ (আয়াত ১-৪৪) পাঠ করা হবে। এই দীর্ঘ অংশে মহান আল্লাহর অসীম কুদরত, তাওহিদ বা একত্ববাদ, পূর্ববর্তী নবীদের সংগ্রাম এবং দাম্ভিক পাপাচারীদের করুণ পরিণতির কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
সূরা আন-নামল: সৃষ্টির নিপুণতায় স্রষ্টার পরিচয়
তারাবির শুরুতেই সূরা আন-নামলের শেষাংশে মহান আল্লাহর সৃষ্টিজগতের বিস্ময়কর সব নিদর্শনের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। আসমান-জমিন সৃষ্টি, আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ এবং সেই সিক্ত মাটি থেকে মনোরম বাগবাগিচা তৈরির কারিগর যে একমাত্র আল্লাহ, তা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশাল পাহাড়ের স্থিতি এবং দুই সমুদ্রের পানির মাঝে অদৃশ্য অন্তরাল সৃষ্টির মাধ্যমে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রমাণ দেওয়া হয়েছে। বিপদে অসহায়ের ডাক শোনা এবং অন্ধকারে পথ দেখানো যে একমাত্র তাঁরই কাজ, তা এই সূরায় বর্ণিত হয়েছে। সূরার শেষভাগে কিয়ামতের ভয়াবহতা এবং কোরআনের বিধান আঁকড়ে ধরার মাধ্যমেই প্রকৃত মুক্তি নিহিত বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
সূরা আল-কাসাস: মুসা (আ.)-এর সংগ্রাম ও কারুনের পতন
আজকের তিলাওয়াতের বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে সূরা আল-কাসাস। এই সূরায় হজরত মুসা (আ.)-এর জীবনের চড়াই-উতরাইয়ের রোমাঞ্চকর ও শিক্ষণীয় বর্ণনা রয়েছে। ফেরাউনের নিষ্ঠুরতা থেকে বাঁচতে শিশু মুসাকে নীল নদে ভাসিয়ে দেওয়া, অলৌকিকভাবে শত্রুর ঘরেই মায়ের কোলে লালিত হওয়া, যৌবনে মাদয়ানে হিজরত এবং নবুয়ত লাভের বিস্তারিত বিবরণ এখানে তুলে ধরা হয়েছে। ফেরাউন ও তার মন্ত্রী হামানের দম্ভ কীভাবে ধূলিসাৎ হয়েছিল, তার বর্ণনা মক্কাবাসীদের জন্য ছিল এক চরম সতর্কবার্তা।
একই সূরায় ইতিহাসের অন্যতম সম্পদশালী ব্যক্তি কারুনের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। অগাধ সম্পদের মালিক হয়ে কারুন যখন অহংকারে মত্ত হয়ে স্রষ্টাকে ভুলে গিয়েছিল এবং মুসা (আ.)-এর উপদেশ উপেক্ষা করেছিল, তখন আল্লাহ তাকে তার ধনভাণ্ডারসহ মাটির নিচে ধসিয়ে দেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, মেধা বা সম্পদ নয়, বরং আল্লাহর অনুগ্রহই শেষ কথা। সূরার সমাপ্তিতে ঘোষণা করা হয়েছে—আল্লাহ ছাড়া সব কিছুই ধ্বংসশীল, চূড়ান্ত কর্তৃত্ব কেবল তাঁরই।
সূরা আল-আনকাবুত: ঈমানের পরীক্ষা ও বাতিলের অসারতা
তারাবির শেষ অংশে সূরা আল-আনকাবুতের মাধ্যমে মুমিনদের ধৈর্য ও ঈমানের পরীক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা জানিয়েছেন, কেবল মুখে ঈমানের দাবি করলেই মুক্তি পাওয়া যাবে না, বরং পূর্ববর্তী জাতিগুলোর মতো কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে। সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য স্পষ্ট করতেই এই পরীক্ষা। নুহ (আ.), ইবরাহিম (আ.), লুত (আ.) ও শুআইব (আ.)-সহ অন্য নবীদের ত্যাগের কথা উল্লেখ করে মুসলমানদের সান্ত্বনা দেওয়া হয়েছে যে, চূড়ান্ত বিজয় সত্যের পথেই আসে।
এই সূরার নামকরণ করা হয়েছে ‘আনকাবুত’ বা মাকড়সার নামে। এখানে মহান আল্লাহ এক চমৎকার উপমা দিয়েছেন। যারা আল্লাহকে ছেড়ে অন্য কোনো শক্তি বা মূর্তির ওপর ভরসা করে, তাদের সেই আশ্রয়কে মাকড়সার জালের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। মাকড়সার জাল যেমন অত্যন্ত নড়বড়ে এবং সামান্য আঘাতেই ছিঁড়ে যায়, তদ্রূপ বাতিল ও অসত্য শক্তির ওপর ভরসা করা মানুষের অবস্থাও ঠিক তেমনি দুর্বল ও অসার।
আজকের তারাবির এই তিলাওয়াত মুমিনদের মনে আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস জাগিয়ে তোলার পাশাপাশি ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হওয়ার প্রেরণা জোগাবে।
রিপোর্টারের নাম 

























