পবিত্র রমজান মাস মুমিনের জীবনে আত্মশুদ্ধি, সংযম এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অনন্য সুযোগ। এই বরকতময় মাসের শেষ দশ দিন আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ, যার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ‘ইতিকাফ’। ইতিকাফের মাধ্যমে একজন মুমিন দুনিয়ার যাবতীয় ব্যস্ততা ও কোলাহল থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আল্লাহর ঘরে ইবাদতে আত্মনিয়োগ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর ওফাত পর্যন্ত প্রতি বছর রমজানের শেষ দশ দিন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ইতিকাফ পালন করেছেন এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর সহধর্মিণীগণও এই ধারা অব্যাহত রেখেছেন।
ইতিকাফের মূল লক্ষ্য হলো মনকে জাগতিক সব মোহ থেকে মুক্ত করে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর দিকে নিবিষ্ট করা। পবিত্র কুরআনে মসজিদে ইতিকাফ অবস্থায় জাগতিক বিশেষ কিছু কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা প্রমাণ করে এটি একটি গভীর আধ্যাত্মিক সাধনা। এই ইবাদতের অন্যতম বড় প্রাপ্তি হলো ‘লাইলাতুল কদর’ বা হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ রজনী অনুসন্ধান করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন রমজানের শেষ দশকে এই মহিমান্বিত রাতটি খুঁজে নিতে। ইতিকাফকারী ব্যক্তি মূলত একটি গুনাহমুক্ত পরিবেশে থেকে আল্লাহর সান্নিধ্য পাওয়ার চেষ্টা করেন, যেখানে নিছক অবস্থান করাও ইবাদতের পর্যায়ভুক্ত।
তবে বর্তমান সময়ে ইতিকাফের এই পবিত্র পরিবেশ ও গভীর ধ্যানের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ইতিকাফে বসেও মুমিনরা সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করা, অপ্রয়োজনীয় চ্যাটিং বা ইন্টারনেটে খবর পড়ে সময় অতিবাহিত করছেন। এতে ইতিকাফের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও আধ্যাত্মিকতা চরমভাবে ব্যাহত হয়। হাদিসের শিক্ষা অনুযায়ী, অনর্থক বিষয় পরিত্যাগ করাই ইসলামের সৌন্দর্যের অন্যতম দিক। ইতিকাফের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতে মগ্ন থেকে ডিজিটাল ডিভাইসে বুঁদ হয়ে থাকা মূলত এই শিক্ষার পরিপন্থী।
ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ ও আলেমদের মতে, ইতিকাফকে যতটা সম্ভব ‘ডিভাইসমুক্ত’ রাখা বাঞ্ছনীয়। তবে একান্ত প্রয়োজনে যদি কাউকে মোবাইল ব্যবহার করতেই হয়, তবে সেখানে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। বর্তমানে ইন্টারনেটে বিচরণ করতে গিয়ে অনিচ্ছাসত্ত্বেও অনেক সময় অশ্লীল বা নীতিবিরুদ্ধ ছবি ও ভিডিও সামনে চলে আসে, যা ইতিকাফের পবিত্রতা নষ্ট করতে পারে। এই ঝুঁকি এড়াতে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমানে ‘কাহাফ গার্ড’ (Kahf Guard)-এর মতো অ্যাপ্লিকেশন বেশ কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। এটি মূলত ডিএনএস (DNS) লেভেলে কাজ করে লক্ষ লক্ষ পর্নোগ্রাফিক ও অশ্লীল সাইট ব্লক করে দেয়, ফলে ইন্টারনেটে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো বিষয় সামনে আসার পথ বন্ধ হয়। এছাড়া নিরাপদ ব্রাউজিংয়ের জন্য ‘কাহাফ ব্রাউজার’ (Kahf Browser) ব্যবহার করা যেতে পারে। এই ব্রাউজারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইন্টারনেটের আপত্তিকর দৃশ্যগুলো ঝাপসা করে দেয়, যা একজন ইতিকাফকারীকে নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।
ইতিকাফ মূলত আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের একটি আধ্যাত্মিক সফর। এই মূল্যবান সময়টি যদি ডিভাইসের স্ক্রিনে অপচয় হয়, তবে তা হবে চরম দুর্ভাগ্যের বিষয়। তাই রমজানের শেষ দশকের এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমাদের উচিত জাগতিক সব বিভ্রান্তি থেকে দূরে থাকা। সচেতনভাবে মোবাইল ও ইন্টারনেটের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ইতিকাফ সত্যিই আমাদের হৃদয়কে আলোকিত করবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সহায়ক হবে।
রিপোর্টারের নাম 

























