ঢাকা ১১:০৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

মাহে রমজান: আত্মনিয়ন্ত্রণ ও পরিমিতিবোধের অনন্য শিক্ষা

পবিত্র মাহে রমজানের মূল নির্যাস হলো সিয়াম সাধনা, যার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো সংযম। রোজা কেবল পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম নয়, বরং এটি মানুষের কুপ্রবৃত্তির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া। দীর্ঘ সময় ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মধ্য দিয়ে যাওয়ার ফলে মানুষের ভেতরের পাশবিক ইচ্ছাগুলো স্তিমিত হয়ে আসে এবং মানবিক গুণাবলি তথা রুহানি শক্তি জাগ্রত হয়। যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ, সহনশীলতা প্রদর্শন এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা একজন রোজাদারের অন্যতম দায়িত্ব। ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে যুক্তিনিষ্ঠ আচরণ এবং মূল্যবোধের চর্চাই সিয়ামের প্রকৃত সার্থকতা।

ইসলামের জীবনদর্শনে সব ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা বা পরিমিতিবোধের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন স্থানে মানুষকে সংযত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। লোকমান হাকিম তাঁর পুত্রকে দেওয়া উপদেশে বিনয় ও শিষ্টাচারের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছিলেন, অহংকারবশত মানুষকে অবজ্ঞা না করতে এবং পথচলায় ও কণ্ঠস্বরে সংযম বজায় রাখতে। কারণ, উদ্ধত অহংকারীকে আল্লাহ পছন্দ করেন না। শৈল্পিক সুষমা যেমন রঙ ও তুলির পরিমিত ব্যবহারে ফুটে ওঠে, তেমনি মানুষের ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্য বিকশিত হয় নিয়মনিষ্ঠা ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে। যেকোনো পরিস্থিতিতে মেজাজ ও আচরণের ভারসাম্য বজায় রাখা একজন মুমিনের ব্যক্তিত্বকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি সামষ্টিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও সংযমের আবশ্যকতা অনস্বীকার্য। সুরা আল-ফুরকানে বলা হয়েছে, প্রকৃত মুমিন তারাই যারা ব্যয়ের ক্ষেত্রে অপচয় ও কার্পণ্য—উভয়টি বর্জন করে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে। এমনকি ইবাদতের ক্ষেত্রেও আতিশয্য পরিহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুরা বনি ইসরাইলে সালাতের সময় স্বর অত্যন্ত উচ্চ বা অতিশয় নিচু না করে মাঝামাঝি পথ অনুসরণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে ভারসাম্য বজায় রাখাই ইসলামের শিক্ষা।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, অতীতে বনি ইসরাইল, লুত ও ছামুদ জাতির পতনের মূলে ছিল সীমালঙ্ঘন ও নৈতিক অবক্ষয়। পবিত্র কোরআনে বারবার সতর্ক করা হয়েছে যে, যারা সীমা অতিক্রম করে আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন না। মাত্রাতিরিক্ত আবেগ বা অবাধ্যতা মানুষের বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, ফলে তারা সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়। সুরা ইউনুসে বলা হয়েছে, মানুষ বিপদে পড়লে আল্লাহকে স্মরণ করে, কিন্তু বিপদ কেটে গেলেই সে পুনরায় সীমালঙ্ঘনের পথে হাঁটে। এমন আচরণ মানুষের বিবেককে অন্ধ করে দেয়। তাই রমজানের এই পবিত্র মাসে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সংযম ও পরিমিতিবোধের চর্চা করা আমাদের অপরিহার্য কর্তব্য।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মাহে রমজান: আত্মনিয়ন্ত্রণ ও পরিমিতিবোধের অনন্য শিক্ষা

আপডেট সময় : ০৯:৩৫:৪৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬

পবিত্র মাহে রমজানের মূল নির্যাস হলো সিয়াম সাধনা, যার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো সংযম। রোজা কেবল পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম নয়, বরং এটি মানুষের কুপ্রবৃত্তির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া। দীর্ঘ সময় ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মধ্য দিয়ে যাওয়ার ফলে মানুষের ভেতরের পাশবিক ইচ্ছাগুলো স্তিমিত হয়ে আসে এবং মানবিক গুণাবলি তথা রুহানি শক্তি জাগ্রত হয়। যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ, সহনশীলতা প্রদর্শন এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা একজন রোজাদারের অন্যতম দায়িত্ব। ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে যুক্তিনিষ্ঠ আচরণ এবং মূল্যবোধের চর্চাই সিয়ামের প্রকৃত সার্থকতা।

ইসলামের জীবনদর্শনে সব ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা বা পরিমিতিবোধের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন স্থানে মানুষকে সংযত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। লোকমান হাকিম তাঁর পুত্রকে দেওয়া উপদেশে বিনয় ও শিষ্টাচারের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছিলেন, অহংকারবশত মানুষকে অবজ্ঞা না করতে এবং পথচলায় ও কণ্ঠস্বরে সংযম বজায় রাখতে। কারণ, উদ্ধত অহংকারীকে আল্লাহ পছন্দ করেন না। শৈল্পিক সুষমা যেমন রঙ ও তুলির পরিমিত ব্যবহারে ফুটে ওঠে, তেমনি মানুষের ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্য বিকশিত হয় নিয়মনিষ্ঠা ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে। যেকোনো পরিস্থিতিতে মেজাজ ও আচরণের ভারসাম্য বজায় রাখা একজন মুমিনের ব্যক্তিত্বকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি সামষ্টিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও সংযমের আবশ্যকতা অনস্বীকার্য। সুরা আল-ফুরকানে বলা হয়েছে, প্রকৃত মুমিন তারাই যারা ব্যয়ের ক্ষেত্রে অপচয় ও কার্পণ্য—উভয়টি বর্জন করে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে। এমনকি ইবাদতের ক্ষেত্রেও আতিশয্য পরিহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুরা বনি ইসরাইলে সালাতের সময় স্বর অত্যন্ত উচ্চ বা অতিশয় নিচু না করে মাঝামাঝি পথ অনুসরণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে ভারসাম্য বজায় রাখাই ইসলামের শিক্ষা।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, অতীতে বনি ইসরাইল, লুত ও ছামুদ জাতির পতনের মূলে ছিল সীমালঙ্ঘন ও নৈতিক অবক্ষয়। পবিত্র কোরআনে বারবার সতর্ক করা হয়েছে যে, যারা সীমা অতিক্রম করে আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন না। মাত্রাতিরিক্ত আবেগ বা অবাধ্যতা মানুষের বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, ফলে তারা সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়। সুরা ইউনুসে বলা হয়েছে, মানুষ বিপদে পড়লে আল্লাহকে স্মরণ করে, কিন্তু বিপদ কেটে গেলেই সে পুনরায় সীমালঙ্ঘনের পথে হাঁটে। এমন আচরণ মানুষের বিবেককে অন্ধ করে দেয়। তাই রমজানের এই পবিত্র মাসে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সংযম ও পরিমিতিবোধের চর্চা করা আমাদের অপরিহার্য কর্তব্য।