মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। সম্প্রতি পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ শহর ও স্থাপনায় ইরানের প্রতিশোধমূলক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় শুধু ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিই হয়নি, বরং এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের সতর্কভাবে গড়ে তোলা শান্তি ও স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তিও ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। এই অপ্রত্যাশিত হামলার পর উপসাগরীয় দেশগুলো এখন এক চরম উভয় সংকটের মুখোমুখি: হয় ইসরায়েলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে পাল্টা হামলা চালানো, নয়তো নিজেদের ভূখণ্ডে আঘাত আসার পরও নিষ্ক্রিয় থাকা। যদিও হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবুও এসব দেশ সম্মিলিতভাবে এ যুদ্ধে না জড়ানোর জোরালো আহ্বান জানাচ্ছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর এই মনোভাবের প্রতিফলন দেখা যায় কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হামাদ বিন জাসিম বিন জাবের আল-সানির মন্তব্যে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সতর্ক করে বলেছেন, উপসাগরীয় সহযোগিতা কাউন্সিলের (জিসিসি) সদস্য দেশগুলোর ‘উচিত হবে না ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর’, যদিও তেহরান জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর ‘সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে’। তিনি আরও লেখেন, ‘কেউ কেউ কাউন্সিলের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে সরাসরি যুক্ত করতে চাইছে। কিন্তু যদি ইরানের সঙ্গে কাউন্সিলভুক্ত দেশগুলোর সংঘর্ষ হয়, তবে এটি উভয়পক্ষের সম্পদের ক্ষতি করবে এবং আমাদেরকে সাহায্যের নামে নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া শক্তিগুলোর জন্য সুযোগ তৈরি করবে।’ তিনি জিসিসি-কে যেকোনো আগ্রাসন মোকাবিলায় ‘একক ও ঐক্যবদ্ধভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার’ আহ্বান জানান। দোহাভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গালফ টাইমসের এডিটর ইন চিফ ফয়সল আল-মুদাহাকা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘এটি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ এবং এর সঙ্গে আমাদের কিছু নেই। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই এতে আমরা আটকা পড়েছি। উপসাগরীয় অঞ্চল সমৃদ্ধি, উন্নতি, নিরাপত্তা ও সংলাপের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। আমরা যুদ্ধে আগ্রহী নই। নেতানিয়াহুর আদর্শ বা ইরানের আদর্শের জন্য আমরা এ যুদ্ধে জড়াতে চাই না।’
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত শনিবার, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর ভয়াবহ আগ্রাসন চালায়। এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ আলী খামেনি ও বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক নেতা নিহত হন। দেশটির সামরিক ও সরকারি স্থাপনাসহ একটি স্কুলও হামলার শিকার হয়, যেখানে অন্তত ১৪৮ জন নিহত হন। এই আগ্রাসনের জবাবে তেহরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতে এই হামলায় তিনজন নিহত ও অন্তত ৫৮ জন আহত হয়েছেন। দুবাইয়ের সুউচ্চ অট্টালিকা, বিমানবন্দর, মানামার দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ এবং কুয়েতের বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র বা সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ আঘাত হেনেছে। দোহার কিছু মহল্লা থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা গেছে। সৌদি আরব জানিয়েছে, দেশটির রিয়াদ ও পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। কাতার ১৬ জন, ওমান ৫ জন, কুয়েত ৩২ জন ও বাহরাইন ৪ জন আহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে। চলমান পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েল থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
বস্তুত, উপসাগরীয় দেশগুলো কখনোই এই যুদ্ধ চায়নি। হামলার আগের সপ্তাহে ওমান ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনার মধ্যস্থতা করছিল এবং ওমানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী একটি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছানোর কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু এর কয়েক ঘণ্টা পরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আগ্রাসন শুরু করে। গালফ টাইমসের এডিটর ইন চিফ আল-মুদাহাকা প্রশ্ন তুলেছেন, যখন ওবামা আমলের চেয়েও ভালো একটি চুক্তির দিকে দুই পক্ষ অগ্রসর হচ্ছিল, তখন কেন যুদ্ধ শুরু করা হলো। কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-সানিও যুদ্ধ না করার, বিশেষ করে উপসাগরীয় মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে এক্ষেত্রে ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। আল-মুদাহাকা আরও মন্তব্য করেন, হামলার পরপরই নেতৃত্ব হারিয়ে তেহরান ‘আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায়’ চলে গেছে এবং মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলাকে তিনি ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অনুধাবনের ঘাটতি’ হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জিসিসি তাদের আকাশসীমা মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনে ব্যবহৃত হওয়ার অনুমতি না দেওয়ার বিষয়ে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো এক উভয় সংকটে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশগুলো যুদ্ধ এড়াতে কূটনৈতিক পন্থায় বহু চেষ্টা করেছে। এখন নিজেদের শহর পুড়তে দেখে তারা দীর্ঘ সময় নিশ্চুপ থাকবে, তা সম্ভব নয়। নিজেদের ভূমি, জনগণ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশগুলোর সরকারকে অবশ্যই পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে এই পদক্ষেপগুলো উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের সিদ্ধান্তমতোই নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 
























