আজ ১৩তম তারাবিতে পবিত্র কোরআনের ১৬তম পারা থেকে তিলাওয়াত করা হবে সূরা কাহফের শেষাংশ (৭৫-১১০ আয়াত), সম্পূর্ণ সূরা মারয়াম ও সূরা ত্বহা। এই তিন মহান সূরায় বর্ণিত হয়েছে ঐশী কুদরতের বিস্ময়কর নিদর্শন, জ্ঞানার্জনে মুসা (আ.) ও খিজরের (আ.) অবিস্মরণীয় সফর, নবীদের দৃঢ়সংকল্প সংগ্রাম এবং দাওয়াতের কাজে অবিচল থাকার প্রেরণা।
জ্ঞানের অন্বেষণ ও ঐশী হেকমত: সূরা কাহফ
পবিত্র কোরআনের ১৬তম পারার শুরুতে সূরা কাহফের ৭৫ থেকে ১১০ নম্বর আয়াত পর্যন্ত পড়া হবে। এই অংশে হযরত মুসা (আ.) ও খিজর (আ.) এর মধ্যকার শিক্ষণীয় ঘটনা (৬০-৮২) বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। জ্ঞান অর্জনের জন্য মুসা (আ.) এর দীর্ঘ সফর এবং খিজর (আ.) এর মাধ্যমে ঘটে যাওয়া আপাতদৃষ্টিতে আশ্চর্যজনক কিন্তু গভীর হেকমতপূর্ণ ঘটনাগুলো আমাদের শেখায় যে, পারিপার্শ্বিক অনেক ঘটনার আড়ালেই লুকিয়ে থাকে মহান আল্লাহর প্রচ্ছন্ন রহস্য। যারা কেবল চাক্ষুষ বিষয়ের ওপরই বিশ্বাস স্থাপন করেন, তাদের জন্য এই ঘটনা গভীর শিক্ষার উপাদান যোগায়।
এরপর আলোচনা করা হয়েছে ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ জুলকারনাইনের ঘটনা (৮৩-১০১)। আল্লাহ তায়ালা তাকে বিশেষ ক্ষমতা দান করেছিলেন, যার মাধ্যমে তিনি বিশাল সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন। তিনি এমন এক জনগোষ্ঠীর দেখা পান, যারা ইয়াজুজ-মাজুজ নামক এক বর্বর গোষ্ঠীর অত্যাচারে নিপীড়িত ছিল। তাদের আবেদনে জুলকারনাইন একটি মজবুত প্রাচীর নির্মাণ করে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। এই প্রাচীর কেয়ামতের আগে ভেঙে যাবে এবং ইয়াজুজ-মাজুজ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে। সূরা কাহফের শেষাংশে (১১০) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যে ব্যক্তি তার রবের সাক্ষাৎ লাভে ইচ্ছুক, সে যেন সৎকর্ম করে এবং আল্লাহর ইবাদতে কাউকে শরিক না করে।
আল্লাহর একত্ব, পুনরুত্থান ও নবীদের জীবন: সূরা মারয়াম
মক্কায় অবতীর্ণ ৯৮ আয়াত ও ৬ রুকু বিশিষ্ট সূরা মারয়ামে আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্ব, একত্ববাদ, পুনরুত্থান এবং পরকালে হিসাব-নিকাশ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরায় বেশ কয়েকজন নবীর (আ.) জীবনচিত্র তুলে ধরা হয়েছে:
জাকারিয়া (আ.): বৃদ্ধ বয়সে অলৌকিকভাবে সন্তান লাভের জন্য আল্লাহর কাছে তার প্রার্থনা এবং এর বরকতে ইয়াহইয়া (আ.) নামক পুত্র সন্তান লাভ (২-১৫) ঐশী কুদরতের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ঈসা (আ.): কুমারী মারয়ামের গর্ভে পিতা ছাড়া ঈসা (আ.) এর জন্ম এবং নবজাতক অবস্থায় তার মুখে মায়ের চারিত্রিক পবিত্রতার ঘোষণা (১৬-৩৪) আল্লাহর অসীম ক্ষমতা ও কুদরতকে প্রমাণ করে।
ইবরাহিম (আ.): মূর্তিপূজায় লিপ্ত পিতাকে ইবরাহিম (আ.) এর একত্ববাদের দাওয়াত, পিতার অস্বীকৃতি সত্ত্বেও ঈমান রক্ষায় দেশ ও জাতি ত্যাগের দৃঢ়তা এবং তার বংশেই পরবর্তীকালে সকল নবীর আবির্ভাবের (৪১-৫০) ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।
এছাড়াও সূরা মারয়ামে মুসা, হারুন, ইসমাইল ও ইদরিস (আ.) এর মতো আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত বান্দাদের আলোচনা করা হয়েছে। তবে তাদের পরে আসা একদল লোকের নামাজ নষ্ট করা এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করার মাধ্যমে বিচ্যুতির চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে (৫১-৫৯)। সূরার শেষাংশে (৯৬-৯৮) পুনরুত্থান ও প্রতিদান দিবস অস্বীকারকারী মোশরেকদের জাহান্নামে একত্র করার (৮৬-৯৫) বিবরণ এবং মোমিনদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ ভালোবাসা ও কাফেরদের পূর্ববর্তীদের মতো ধ্বংস করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে।
দাওয়াতের প্রেরণা ও মুসা (আ.) এর বর্ণিল জীবন: সূরা ত্বহা
মক্কায় অবতীর্ণ ১৩৫ আয়াত ও ৮ রুকু বিশিষ্ট সূরা ত্বহার প্রায় পুরোটা জুড়েই রয়েছে হযরত মুসা (আ.) এর জীবনের বর্ণিল বিবরণ। এই সূরার প্রথমদিকে আল্লাহ তায়ালা নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে সান্ত্বনা দিয়েছেন, যিনি কোরআনের বাণী প্রচারে অশেষ মেহনত ও কষ্ট করতেন। মূলত মুসা (আ.) এর ঘটনা আলোচনার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, নবীজি (সা.) এবং তার উম্মতকে এ বার্তা দেওয়া যে, আল্লাহ তায়ালা সর্বদা তার প্রিয় বান্দাদের হেফাজতের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকেন।
সূরা ত্বহার ৯-৯৮ নম্বর আয়াত পর্যন্ত একাধারে মুসা (আ.) এর জীবনের বড় বড় প্রায় সব ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে: আল্লাহর আদেশে শিশু মুসাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ, শত্রুর ঘরে মায়ের কোলে লালন-পালন, নবুয়ত লাভ, আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি কথোপকথন, ফেরাউনের কাছে দাওয়াত নিয়ে যাওয়া, ফেরাউন কর্তৃক জাদুকরদের একত্রীকরণ, মুসা (আ.) এর বিজয়, জাদুকরদের ঈমান আনায়ন, বনি ইসরাইলের মিশর ত্যাগ, ফেরাউন বাহিনীর ধাওয়া এবং সমুদ্রে তাদের বিনাশ। এরপর বর্ণিত হয়েছে মহা দয়ালু রবের নেয়ামতের বিপরীতে বনি ইসরাইলের অকৃতজ্ঞতা, সামিরি কর্তৃক গো-বাছুর বানানো এবং তাদের পথভ্রষ্টতা, তাওরাত নিয়ে মুসা (আ.) এর তুর পর্বত থেকে প্রত্যাবর্তন এবং নিজের ভাইয়ের প্রতি ক্রোধ প্রকাশের ঘটনা।
এরপর কেয়ামতের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে পরকালে আল্লাহবিমুখ বান্দাদের শাস্তির বিবরণ দেওয়া হয়েছে (১০২-১১২, ১২৪-১২৮)। মাঝে আদম (আ.) কে ইবলিসের সিজদা না করার ঘটনাও বর্ণিত হয়েছে (১১৬-১২৩)। মোশরেকদের কথায় কান না দিয়ে দাওয়াতের কাজে অবিচল থাকার নির্দেশনার মাধ্যমে সূরাটি সমাপ্ত হয়েছে (১২৯-১৩৫)। এই সূরাগুলো মুসলিম উম্মাহকে ঐশী জ্ঞান, নবীদের সংগ্রামের ইতিহাস এবং দাওয়াতের কাজে অবিচল থাকার গুরুত্ব সম্পর্কে গভীর শিক্ষা প্রদান করে।
রিপোর্টারের নাম 
























