## শিরোনাম: আমের মুকুলে সেজেছে রাজশাহী, স্বপ্ন বুনছেন কৃষকরা
রাজশাহী: আমের রাজধানী খ্যাত রাজশাহী অঞ্চলজুড়ে এখন আমের মুকুলের মনমাতানো সুবাস। ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসে ভেসে আসা এই মিষ্টি ঘ্রাণ জানান দিচ্ছে নতুন মৌসুমের আগমনী বার্তা। বাড়ির আঙ্গিনা থেকে শুরু করে রাস্তার ধার, পুকুরপাড় কিংবা বিস্তীর্ণ সবুজ বাগান—সর্বত্রই গাছে গাছে শোভা পাচ্ছে হলুদ-সবুজ মুকুলের সমারোহ। এই মুকুল শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেরই প্রতীক নয়, বরং আগামী দিনের সুস্বাদু পাকা আমের স্বপ্ন আর সম্ভাবনার হাতছানি নিয়ে এসেছে কৃষক ও সাধারণ মানুষের জীবনে।
এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে আমের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ আম দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়, পাশাপাশি বিদেশেও এর চাহিদা রয়েছে। তাই মুকুল আসার সঙ্গে সঙ্গেই কৃষকদের মনে জেগে ওঠে নতুন আশা ও প্রত্যাশার আলো।
কৃষকের চোখে স্বপ্ন, শঙ্কাও:
বাঘা এলাকার আমচাষি আলী আহম্মেদ জানান, বছরজুড়ে গাছের নিয়মিত পরিচর্যার সুফল হিসেবে প্রতি বছরই ভালো ফলন পাওয়া যায়। এবারও তিনি তার গাছের যত্ন নিচ্ছেন এবং ইতোমধ্যে কিছু গাছে মুকুল দেখা দিয়েছে। তবে, তিনি কিছুটা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, সঠিক সময়ে শোষক পোকার আক্রমণ দমন করা না গেলে আমের ফলন কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
রাজশাহী মহানগরসহ জেলার বাঘা, চারঘাট, পুঠিয়া ও পবা উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, গাছের প্রতিটি ডাল যেন মুকুলে আবৃত। কিছু কিছু গাছে পাতার চেয়ে মুকুলই বেশি। মৌমাছির গুঞ্জনে মুখর হয়ে উঠেছে বাগানগুলো। বসন্তের দখিনা হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়া এই সুবাস কেবল প্রকৃতিপ্রেমীদেরই মুগ্ধ করছে না, বরং কৃষকদের মনেও নতুন করে আশার সঞ্চার করছে।
অনুকূল আবহাওয়া ও বাড়তি মুকুল:
চারঘাটের কালুহাটি গ্রামের আমচাষি মোজাফফর হোসেন বলেন, এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় মুকুল আগেভাগেই এসেছে এবং সংখ্যায়ও অনেক বেশি। গাছভর্তি মুকুল দেখে তিনি আনন্দিত। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, কুয়াশা ও ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে মুকুল রক্ষা পেলে এ বছর বিপুল পরিমাণ আম উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
পবা উপজেলার আমচাষি মনিরুল ইসলাম জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর শীত ও কুয়াশার তীব্রতা অনেক কম থাকায় তারা ভালো ফলনের ব্যাপারে আশাবাদী। তবে, মুকুল আসার সময়টাকেই তিনি সবচেয়ে স্পর্শকাতর বলে উল্লেখ করেন। চারঘাটের আরেক চাষি তুহিন আলী বলেন, প্রায় সব গাছেই মুকুল এসে গেছে। কিন্তু হপার বা শোষক পোকার আক্রমণ সময়মতো নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ফলন মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। এ বিষয়ে তারা সতর্ক রয়েছেন।
প্রশাসনের নজরদারি ও বৈজ্ঞানিক পরামর্শ:
কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী, চাষিরা মুকুলকে রোগবালাই থেকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ছিটানোর কাজ শুরু করেছেন। বাগান মালিক আক্তার হোসেন আশাবাদী, “গাছভর্তি মুকুল মানেই স্বপ্ন। এখন শুধু চাই—আবহাওয়া ভালো থাকুক।”
রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুল ইসলাম জানান, এবার মুকুল বেশ আগেভাগে এসেছে এবং গত বছরের তুলনায় বেশি মুকুল আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষভাগ এবং মার্চ মাসের প্রথমভাগের মধ্যে সব গাছে পরিপূর্ণ মুকুল আসবে। তিনি বলেন, “কুয়াশায় বড় ধরনের ক্ষতি না হলে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে।” কৃষকদের বাগান পরিচর্যা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ ছিটানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং তারা সে অনুযায়ী কাজ করছেন।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন জানান, মাঠ পর্যায়ে আমের ভালো উৎপাদনের লক্ষ্যে চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সহকারী ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিরলসভাবে মাঠে কাজ করছেন। তিনি আরও জানান, গত বছর রাজশাহীতে হেক্টরপ্রতি আমের উৎপাদন হয়েছিল ১২ দশমিক ৭৫ টন এবং চলতি বছর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১২ দশমিক ৮ টন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) রাজশাহী অঞ্চলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর জমিতে আম চাষ করা হয়েছিল এবং উৎপাদন হয়েছিল দুই লাখ ৪৯ হাজার ৯৫২ টন আম। ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর জমিতে চাষের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে এবং এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা দুই লাখ ৪৬ হাজার টন ধরা হয়েছে।
নওগাঁয় আম চাষের প্রসার:
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী অঞ্চলের নওগাঁ জেলায় আম চাষের জমি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ১০ বছরে নওগাঁয় আমবাগানের জমি প্রায় দেড়গুণ বেড়েছে, যা চাঁপাইনবাবগঞ্জকেও ছাড়িয়ে গেছে। চাষ পদ্ধতিতেও এসেছে পরিবর্তন; কৃষকরা এখন দীর্ঘমেয়াদী শতবর্ষের বাগান তৈরির পরিবর্তে মাত্র ১০ বছরের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে বাগান করছেন। এছাড়া, আম্রপালি এবং বারি আম-৩ ও ৪ জাতের আমের চাষ প্রতি বছর জেলাগুলোতে বেড়েই চলেছে।
রিপোর্টারের নাম 





















