সদ্যসমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাপনায় নজিরবিহীন অসংগতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিরুদ্ধে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার প্রয়োগের নামে রাষ্ট্রের প্রায় ২০ কোটি টাকা অপচয় হয়েছে।
এছাড়া প্রতিটি ব্যালটের বিপরীতে বরাদ্দের হিসাবে ইসি ও ডাক বিভাগের মধ্যে বড় ধরনের গরমিল পাওয়া গেছে, যা নিয়ে সংস্থা দুটির মধ্যে চলছে কাদা ছোড়াছুড়ি।
ডাক বিভাগ ও ইসির নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য পাঠানো প্রতিটি পোস্টাল ব্যালটের জন্য বরাদ্দ ছিল ৭০০ টাকা। কিন্তু ডাক বিভাগ পেয়েছে মাত্র ৫৬৫ টাকা (মূল খরচ ৫০০ এবং পার্সেল খরচ ৬৫ টাকা)। অবশিষ্ট ১৩৫ টাকার ঘাপলা নিয়ে ইসি ও ডাক বিভাগের মধ্যে চলছে রশি টানাটানি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক বিভাগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কেউ মুখ খুলতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডাক বিভাগের এক কর্মকর্তা আমার দেশকে জানান, বরাদ্দের এ ঘাটতি নিয়ে কথা বলতে গেলে ইসির নীতিনির্ধারকরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান। বিতর্কে না জড়াতে আমাদের কর্তৃপক্ষ এখন নীরব রয়েছে। যদিও ইসি আনুষ্ঠানিকভাবে যেকোনো অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ওসিভি (আউট কান্ট্রি ভোটিং সিস্টেম) ব্যবস্থার তথ্যমতে, নিবন্ধনের জন্য আবেদন অনুমোদিত হয় সাত লাখ ৬৭ হাজার ২৩৩টি, যার মধ্যে ভোটদানের জন্য ব্যালট পাঠানো হয় সাত লাখ ৬৭ হাজার ১৮৮টি। সময়ের অভাবে ৪৫টি ব্যালট পাঠাতে পারেনি ইসি। পাঠানো ব্যালটের মধ্যে ভোট দিয়ে ফেরত আসে পাঁচ লাখ ৩৮ হাজার ৩৬৫টি।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে ব্যাপক তোড়জোড় থাকলেও শেষ পর্যন্ত এক লাখ ৩২ হাজার ৮২৭টি ব্যালট ‘আনডেলিভার্ড’ হয়ে ফেরত আসে। এছাড়া ২৬ হাজার ২৩২ ব্যালট ত্রুটির কারণে বাতিল হয়। মূলত পাঁচটি দেশ (যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, কুয়েত, মালয়েশিয়া ও ইতালি) থেকে সবচেয়ে বেশি ব্যালট ফেরত আসে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অব্যবস্থাপনার দোহাই দিলেও ইসির সময়োচিত সিদ্ধান্তের অভাবেই এ গচ্চা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইসিভি (ইন কান্ট্রি ভোটিং) ব্যবস্থার তথ্যমতে, নিবন্ধনের পর সাত লাখ ৬০ হাজার ৮৯৮টি ব্যালট পাঠানো হয়। ভোট দিয়ে ফেরত পাঠানো হয় ছয় লাখ ৭৬ হাজার ৯৫২টি।
সূত্র আরো জানায়, বিদেশের পাশাপাশি দেশের ভেতরেও জিপিএস ট্র্যাকিংয়ে খুঁজে না পেয়ে প্রায় ১৩ হাজার ব্যালট ফেরত আসে। এছাড়া সঠিক পদ্ধতির অভাবে বাতিল হয় প্রায় ৬৬ হাজার ব্যালট। সব মিলিয়ে দেশ-বিদেশর দুই লাখ ৩৭ হাজার ৮০৭ ব্যালট কোনো কাজে আসেনি।
ইসি সূত্র জানায়, এ খাতে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা, যার মধ্যে অন্তত ২০ কোটি টাকা পুরোপুরি অপচয় হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নির্বাচন কমিশনার আমার দেশকে বলেন, পোস্টাল ব্যালটের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে। অনন্তকাল বিশাল এ খরচ টেনে নেওয়া সম্ভব নয়। আমরা আগামীতে বিকল্প ব্যবস্থা (ডিজিটাল বা অ্যাপভিত্তিক) চালুর প্রস্তাব রেখে যাচ্ছি।
তবে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার আমার দেশকে বলেন, অপচয়ের এ ধারা বজায় থাকলে পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতিটি এক সময় বিলুপ্ত ইভিএমের মতো বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। সমন্বয় ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ সফল হওয়া অসম্ভব।
ভোটের ব্যবধান : চট্টগ্রাম বনাম সুনামগঞ্জ
পোস্টাল ব্যালটে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়ে চট্টগ্রাম-১৫ আসনে। এ আসনে ভোট পড়ে ১০ হাজার ৯৪৬টি। সবচেয়ে কম ভোট পড়ে সুনামগঞ্জে-২ আসনে। এ আসনে ভোট পড়ে এক হাজার ৪৫টি। এছাড়া ফেনী-৩ আসনে ১০ হাজার ৮৭৫টি, ফেনী-২ আসনে আট হাজার ৪১৯টি এবং ফেনী-১ আসনে সাত হাজার ৮৬২টি। একই ভাবে কুমিল্লা-১০ আসনে ৯ হাজার ৬৩২টি, কুমিল্লা-১১ আসনে আট হাজার ৬৩৯টি, কুমিল্লা-৫-এ আট হাজার ৪৪১টি এবং কুমিল্লা-৯ আসনে সাত হাজার ৭৪৯টি। এছাড়া চট্টগ্রাম-১১ আসনে চার হাজার ২০৩টি, চট্টগ্রাম-১৬-এ চার হাজার ৬০৮টি এবং চট্টগ্রাম-৫ আসনে ভোট পড়ে চার হাজার ১২২টি।
নোয়াখালী এলাকায় দেখা গেছে, নোয়াখালী-১ আসনে ভোট পড়ে ৯ হাজার ৮২টি, নোয়াখালী-৩ আসনে আট হাজার ৪৪৩টি, নোয়াখালী-৫-এ আট হাজার ১৮২টি এবং নোয়াখালী-৬ আসনে দুই হাজার ৬১৪টি। সিলেট-১ আসনে সাত হাজার ৬৮৮টি, সিলেট-৬ আসনে পাঁচ হাজার ৩৬৯টি এবং সিলেট-৫ আসনে চার হাজার ৮১৯টি ভোট পড়ে। অন্যদিকে ঢাকা-১০ আসনে ভোট পড়ে আট হাজার ৪৭টি এবং ঢাকা-৮ আসনে পড়ে পাঁচ হাজার ৬৯২টি।
রিপোর্টারের নাম 




















