## রমজানে মুনাফার লোভে লাগাম টানার আহ্বান, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার প্রধানমন্ত্রীর
ঢাকা: পবিত্র রমজান মাসে অধিক মুনাফা অর্জনের প্রবণতা পরিহার করে জনদুর্ভোগ লাঘবের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, রমজানকে কেবল ব্যবসায়িক লাভের মাস হিসেবে বিবেচনা না করে এর পবিত্রতা ও আত্মশুদ্ধির তাৎপর্য অনুধাবন করা উচিত। দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে ব্যবসায়ীদের প্রতি সতর্কতার আহ্বান জানান তিনি। মাফিয়া সিন্ডিকেটের পতন ঘটিয়ে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়েই সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে বলেও তিনি জানান।
গতকাল রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তাঁর ভাষণে উঠে আসে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ এবং তা মোকাবেলায় সরকারের কর্মপরিকল্পনা। তিনি বলেন, দুর্নীতি, দুঃশাসন এবং দুর্বল শাসন কাঠামোর মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করা নতুন সরকার জনজীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দলীয় প্রভাব বা জোরজবরদস্তির পরিবর্তে আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দুর্নীতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে দেশের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, তাঁদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে বিএনপি সরকার পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই যাত্রাপথে দেশবাসীর সমর্থন অব্যাহত থাকবে। প্রায় ১৮ বছর পর দেশে ফিরে দেশ ও জনগণের জন্য একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে তিনি কাজ করছেন এবং জনগণের সামনে তাঁর সেই ‘প্ল্যান’-এর বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার ঘোষক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত দলকে (বিএনপি) জনগণ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে এবং এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সকল অঙ্গীকার পূরণ করা সরকারের দায়িত্ব।
ভাষণের শুরুতে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জ্ঞাপন এবং হাজারো শহীদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, তাঁদের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হবে। তাঁবেদারমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের ভোটে নির্বাচিত এই সরকার গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করবে। দলমত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য দেশকে একটি নিরাপদ ভূমিতে পরিণত করার স্বপ্ন ব্যক্ত করেন তিনি। একটি স্বনির্ভর, নিরাপদ, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনই বিএনপি সরকারের লক্ষ্য।
আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থান:
প্রধানমন্ত্রী দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণ হিসেবে পূর্ববর্তী আমলের দুর্নীতি, দুর্বল শাসন কাঠামো এবং ভঙ্গুর অর্থনীতিকে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, সারা দেশে জুয়া ও মাদকের বিস্তার আইনশৃঙ্খলা অবনতির অন্যতম কারণ। এই পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জনজীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের আহ্বান:
রমজানকে আত্মশুদ্ধির মাস হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই মাসে মানুষের ভোগান্তি বাড়ানো উচিত নয়। ব্যবসায়ীদের অধিক মুনাফা লাভের প্রবণতা পরিহার করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রমজানকে কেবল ব্যবসায়িক মুনাফার মাস হিসেবে দেখা উচিত নয়। দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে না যায়, সেদিকে ব্যবসায়ীদের বিশেষ নজর রাখার অনুরোধ জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দেন যে, সরকার ব্যবসায়ী ও ক্রেতা সাধারণ উভয়ের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে যে কোনো পরামর্শ বা অভিযোগ শুনতে সরকার প্রস্তুত।
রোজাদারদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সরবরাহ:
রমজান মাসে রোজাদারদের ইফতার, তারাবিহ ও সাহরির সময় নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি অপচয় রোধ করে কৃচ্ছ্রতা সাধনের ওপর জোর দেন এবং অফিস-আদালতে অপ্রয়োজনীয় গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহারের ব্যাপারে সচেতনতা অবলম্বনের আহ্বান জানান।
এমপিদের ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি ও প্লট সুবিধা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত:
দেশের সকল সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং জনসাধারণের প্রতি কৃচ্ছ্রতা সাধনের আহ্বান জানানোর আগে, মন্ত্রী এবং বিএনপির সংসদ সদস্যদের জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিএনপির সংসদীয় দলের প্রথম সভাতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, বিএনপি থেকে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য সরকারি সুবিধা নিয়ে ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি আমদানি করবেন না এবং প্লট সুবিধা গ্রহণ করবেন না। এই সিদ্ধান্তকে তিনি ‘ন্যায়পরায়ণতার’ আদর্শের প্রতিফলন বলে অভিহিত করেন।
যানজট নিরসনে রেলব্যবস্থার উন্নয়ন:
রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলোর যানজট নিরসনে সরকার কাজ করবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, হাট-মাঠ-ঘাটে, অফিস-আদালতে জনগণের ভোগান্তি লাঘব না হলে জনমনে স্বস্তি ফিরবে না। জনসংখ্যার চাপ কমাতে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি এবং এই লক্ষ্যে সারা দেশে রেল যোগাযোগব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রেল, নৌ, সড়ক এবং সেতু মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস ও সমন্বয় করে রেল যোগাযোগব্যবস্থা সহজ, সুলভ এবং নিরাপদ করা হবে। এতে শহর-নগরকেন্দ্রিক নির্ভরতা কমবে এবং পরিবেশেরও উন্নতি হবে।
জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরের অঙ্গীকার:
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারলে এই জনসংখ্যাই জনসম্পদে পরিণত হবে। তিনি তরুণ প্রজন্মকে মেধা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে যোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সকল সহযোগিতা প্রদানে সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। কর্মসংস্থান ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার নিয়েও বর্তমান সরকার যাত্রা শুরু করেছে।
সবার জন্য সমানাধিকার:
যারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন, দেননি বা কাউকেই ভোট দেননি—সকলের অধিকার সমান বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। ‘দলমত ধর্ম-দর্শন যার যার, রাষ্ট্র সবার’—এই নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে সরকার কাজ করবে বলে তিনি জানান। বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর সুস্থতা ও নিরাপত্তা কামনা করেন এবং সকল ইতিবাচক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করেন।
রিপোর্টারের নাম 









