একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কেবল গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই বৃদ্ধি করে না, বরং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ পথচলাকেও সুনির্দিষ্ট করে দেয়। ভোটের দিন নাগরিকরা যাতে কোনো প্রকার ভয়-ভীতি বা সংশয় ছাড়াই কেন্দ্রে গিয়ে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের প্রধানতম দায়িত্ব। বাংলাদেশের মতো জনবহুল এবং রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর একটি ভূখণ্ডে এই গুরুদায়িত্ব পালনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনীর ভূমিকা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। নির্বাচনি স্থিতিশীলতায় সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ও তাঁদের প্রশ্নাতীত পেশাদারিত্ব একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে কাজ করে—যা সহিংসতা প্রতিরোধ, সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক দূর এবং নির্বাচনি ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা পুনর্গঠনে বড় ভূমিকা রাখে।
১. সহিংসতা প্রতিরোধ ও প্রতিরোধমূলক শক্তি
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন মানেই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা যায়, প্রচার-প্রচারণা থেকে শুরু করে ভোটগ্রহণের দিন পর্যন্ত সংঘাতের আশঙ্কা প্রবল থাকে। এই প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীর মোতায়েন একটি শক্তিশালী ‘দৃশ্যমান প্রতিরোধমূলক’ (Visible Deterrent) ভূমিকা পালন করে। সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা বিশৃঙ্খলাকারীদের প্রতি একটি কঠোর বার্তা দেয় যে, রাষ্ট্র নির্বাচনি পরিবেশ রক্ষায় আপসহীন। কেবল শক্তি প্রদর্শন নয়, বরং তাঁদের অবস্থানই সম্ভাব্য অপরাধীদের সহিংসতা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করে।
২. বেসামরিক প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের সহায়ক শক্তি
সংবিধান ও আইন অনুযায়ী বিশেষ পরিস্থিতিতে বেসামরিক কর্তৃপক্ষকে সহায়তা প্রদানের (In Aid to Civil Power) দায়িত্ব সেনাবাহিনীর রয়েছে। নির্বাচনকালীন সময়ে এই সহায়তা সাধারণত একটি সুস্পষ্ট কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়। যেখানে মূল নেতৃত্ব থাকে নির্বাচন কমিশন ও বেসামরিক প্রশাসনের হাতে, সেখানে সেনাবাহিনী সহায়ক শক্তি হিসেবে সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে টহল প্রদান, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং বড় ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড প্রতিহত করতে সচেষ্ট থাকে। এই সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নির্বাচনি এলাকাগুলোতে একটি নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে কার্যকর বলে বারবার প্রমাণিত হয়েছে।
৩. ভোটারের মানসিক নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ বৃদ্ধি
ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিকদের অন্যতম বড় বাধা হলো ‘নিরাপত্তাহীনতার ভয়’। অনেক সময় ভোটাররা অনাস্থা বা সহিংসতার আশঙ্কায় কেন্দ্রে যেতে দ্বিধা বোধ করেন। যখন সাধারণ মানুষ দেখেন যে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পেশাদার ও সুশৃঙ্খল বাহিনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোতায়েন রয়েছে, তখন তাঁদের মধ্যে একটি মানসিক প্রশান্তি ও আস্থার জন্ম নেয়। এই আস্থার পরিবেশই ভোটারের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে দেয়, যা যেকোনো নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও বৈধতার জন্য অপরিহার্য।
৪. নিরপেক্ষতা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি
নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা অবশ্যই নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং আইনসম্মত হতে হবে। কোনো সুনির্দিষ্ট পক্ষের প্রতি পক্ষপাতিত্বের লেশমাত্র অভিযোগও পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। তাই সেনাবাহিনীর মোতায়েন হতে হয় নিখুঁত পেশাদারিত্বের সাথে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নির্বাচন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও উন্নয়ন সহযোগীদের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণে থাকে। সেনাবাহিনী যদি নিরপেক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করে, তবে তা আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকারের একটি ইতিবাচক বার্তা পাঠায়।
৫. রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতা ও সমন্বয়
নিরাপত্তা বাহিনী যতই সক্রিয় থাকুক না কেন, প্রকৃত শান্তি নির্ভর করে রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ ও দায়িত্বশীলতার ওপর। সংঘাতময় ভাষা বা উসকানিমূলক কর্মসূচি নির্বাচনি পরিবেশকে জটিল করে তোলে। রাজনৈতিক পক্ষগুলো যদি নিয়ম মেনে চলে এবং সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য বাহিনীকে তাঁদের পেশাদার দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করে, তবেই একটি আদর্শ নির্বাচনি পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। সেনাবাহিনী এখানে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং শান্তি নিশ্চিত করার একটি রাষ্ট্রীয় স্তম্ভ।
পরিশেষে বলা যায়, নির্বাচনি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা একটি সমষ্টিগত দায়বদ্ধতার বিষয়। নির্বাচন কমিশনের দৃঢ় নেতৃত্ব, প্রশাসনের সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সহনশীলতার সাথে সেনাবাহিনীর পেশাদার ভূমিকা যুক্ত হলে তবেই একটি অর্থবহ নির্বাচন সম্ভব। নির্বাচন কেবল প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়া নয়, এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন। সেই মুহূর্তটি যেন ভয়মুক্ত, সহিংসতাহীন এবং বিশ্বাসযোগ্য হয়—এটাই জাতির প্রত্যাশা। আর এই প্রত্যাশা পূরণে আইন ও সংবিধানের সীমারেখায় থেকে সেনাবাহিনীর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
রিপোর্টারের নাম 























