একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে, বাগেরহাটের চার আসনে প্রার্থীদের ব্যস্ততা ততই বাড়ছে। নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা এখন তুঙ্গে। এই চার আসনে মোট ২১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে প্রধান দুই রাজনৈতিক জোটের প্রার্থীদের মধ্যে। আসনগুলোতে ভোটারদের প্রত্যাশা আর প্রার্থীদের চ্যালেঞ্জের চিত্র ভিন্ন ভিন্ন।
কৃষিকাজ, মৎস্য আহরণ, চিকিৎসা ব্যবস্থা, যোগাযোগ এবং নারী উন্নয়নসহ নানা সমস্যা জর্জরিত বাগেরহাটের সাধারণ মানুষ এবার এমন জনপ্রতিনিধি চান, যারা কেবল ভোটের সময়েই নয়, সারা বছর তাদের পাশে থাকবেন এবং বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ দেখাবেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, দস্যু আতঙ্ক, ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উন্নত চিকিৎসার অভাব এবং মোংলা নদীর উপর সেতু নির্মাণ না হওয়া—এসবই স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের আক্ষেপ। নারী সমাজকর্মী নিলুফা বলেন, “নারীরা এখনো স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার। আমরা এমন জনপ্রতিনিধি চাই, যারা নারীর অধিকারকে শুধু স্লোগানে নয়, বাস্তব নীতিমালা ও উদ্যোগের মাধ্যমে নিশ্চিত করবেন।”
ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ বাগেরহাট জেলা প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে অবনমিত হওয়ায় অনেকেই হতাশ। তারা চান এমন নেতৃত্ব, যারা জেলাটিকে একটি পরিকল্পিত নগরীতে রূপান্তরিত করতে পারবেন।
চারটি সংসদীয় আসনে মোট ২১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, এর মধ্যে ১৮ জন দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্ত এবং ৩ জন স্বতন্ত্র। বাগেরহাট-১ আসনে ৭ জন, বাগেরহাট-২ আসনে ৩ জন, বাগেরহাট-৩ আসনে ৪ জন এবং বাগেরহাট-৪ আসনে ৬ জন প্রার্থী লড়ছেন। বাগেরহাট-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এম.এ.এইচ সেলিম এবার বাগেরহাট-১, ২ ও ৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি বলেন, “বাগেরহাটবাসীর কাছে আমি একজন পরীক্ষিত প্রার্থী। আশা করি, আমার আগের কাজের মূল্যায়ন করেই জনগণ আমাকে নির্বাচিত করবেন।”
বাগেরহাট-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মশিউর রহমান খান সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল, যিনি মাতুয়া সম্প্রদায়ের নেতা, ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
বাগেরহাট-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ জাকির হোসেন অবকাঠামোগত উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন। একই আসনের জামায়াত প্রার্থী শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাদ জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং নৈতিক ও টেকসই উন্নয়নের কথা বলছেন।
বাগেরহাট-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী লায়ন ড. ফরিদুল ইসলাম স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পর্যটন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের উপর জোর দিয়েছেন। এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী মওলানা আব্দুল ওয়াদুদ মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজ নির্মূল করার অঙ্গীকার করেছেন।
বাগেরহাট-৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থী অধ্যক্ষ আব্দুল আলিম রাস্তাঘাট সংস্কার, পর্যটন নগরী গড়ে তোলা এবং একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা জানিয়েছেন। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী সোমনাথ দে অবহেলিত জনগোষ্ঠীর পাশে থেকে তাদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
তবে, এবারের নির্বাচনে মূল লড়াইটা কেবল প্রতিশ্রুতির নয়, বরং বিশ্বাসযোগ্যতা ও দায়বদ্ধতার। ভোটাররা এবার কেবল উন্নয়নের আশ্বাসে সন্তুষ্ট নন, তারা নিয়মিত জনপ্রতিনিধির উপস্থিতি, প্রতিশ্রুতির সময়ভিত্তিক বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় সমস্যার স্থায়ী সমাধান চান।
যদিও ২১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, মূল লড়াই হবে জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপির মধ্যে। তবে, প্রতিটি আসনেই বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় দলটির প্রার্থীদের বাড়তি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামী কিছুটা স্বস্তিতে আছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
মোট ১৩ লক্ষ ৬১ হাজার ১১১ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৫৪৭টি এবং মোট ভোটকক্ষ থাকবে ২ হাজার ৬৫৯টি।
রিপোর্টারের নাম 























