আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিএনপি চেয়ারপার্সন তারেক রহমানের দায়িত্ব গ্রহণের সম্ভাবনা দেখছেন দেশের প্রায় ৪৮ শতাংশ মানুষ। এই তথ্য উঠে এসেছে বেসরকারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইনোভেশন কনসাল্টিংয়ের পরিচালিত ‘পিপলস ইলেকশন পালস সার্ভে (পিইপিএস) রাউন্ড-৩’ শীর্ষক এক জনমত জরিপে। জরিপে প্রায় ২৩ শতাংশ মানুষ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানকে ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চেয়েছেন।
শুক্রবার (তারিখ) রাজধানীর কারওয়ানবাজারে এক সংবাদ সম্মেলনে জরিপের এই ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এতে জরিপের প্রধান ফলাফল উপস্থাপন করেন ইনোভেশন কনসাল্টিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং জরিপের প্রধান মো. রুবাইয়াত সারওয়ার।
ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটারদের ভোটদানের আগ্রহ এবং নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে জনমত জানতে এই জরিপটি পরিচালিত হয়েছে। পূর্ববর্তী জরিপের সঙ্গে তুলনা করে ভোটারদের মতামতের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করার জন্য এই রাউন্ডটি বিশেষভাবে নকশা করা হয়েছে।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৯৩.৩ শতাংশ জানিয়েছেন যে তারা আসন্ন নির্বাচনে ভোট দেবেন। আগের রাউন্ডে যারা ভোট দেবেন বলে মত প্রকাশ করেছিলেন, তাদের মধ্যে ৯৬.১ শতাংশ এবারও ভোট দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন। যারা আগে ভোট দেবেন না বলেছিলেন, তাদের মধ্যে ৭৮.৫ শতাংশ এবার ভোট দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। এছাড়া, যারা আগে কোনো মতামত দেননি, তাদের ৮৯.৭ শতাংশ এবার ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন। তবে, জেন-জি প্রজন্মের মধ্যে ভোটদানের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম হলেও সামগ্রিকভাবে ভোটদানের হার এখনও বেশি।
প্রায় ৬০ শতাংশ উত্তরদাতা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে, ২২ শতাংশ এই বিষয়ে অবগত নন বলে জানিয়েছেন। জনসংখ্যাগত ও রাজনৈতিক বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে এই বিষয়ে সচেতনতা ও মতামতে পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে।
জরিপের ৭২.৩ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, সরকার একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে সক্ষম হবে, যা পূর্ববর্তী রাউন্ডের তুলনায় বেশি। স্থানীয় পর্যায়ে পুলিশ ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতার উপর আস্থা ৭৪.৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা নিয়ে ধারণারও উন্নতি হয়েছে; ৮২ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন তারা নিরাপদে ভোট দিতে পারবেন, যা পূর্বের রাউন্ডে ছিল ৭৮ শতাংশ। উত্তরদাতারা স্থানীয় ও জাতীয় পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য করেছেন। অনেকে তাদের এলাকায় রাজনৈতিক সংঘাত কম বলে উল্লেখ করলেও জাতীয় পর্যায়ে সংঘাত তুলনামূলকভাবে বেশি হচ্ছে বলে তাদের ধারণা।
আগামীকাল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে নিজেদের এলাকায় কোন দলের প্রার্থী জিততে পারেন—এই প্রশ্নে ৫২.৯ শতাংশ উত্তরদাতা বিএনপি প্রার্থীর বিজয়ের সম্ভাবনা দেখেছেন। তবে, ২৩.৮ শতাংশ এই বিষয়ে নিশ্চিত নন।
ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ৪৭.৬ শতাংশ উত্তরদাতা তারেক রহমানকে সমর্থন করেছেন। ২২.৫ শতাংশ মনে করেন শফিকুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। মাত্র ২.৭ শতাংশ অংশগ্রহণকারী নাহিদ ইসলামকে ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে, ২২.২ শতাংশ উত্তরদাতা ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী কে হবেন তা জানাতে পারেননি, যা নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দেয়।
৭৪.২ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন যে তারা কোন দলকে ভোট দেবেন, সে সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে নিয়েছেন। এই রাউন্ডে ভোট পছন্দে পূর্ববর্তী রাউন্ডের তুলনায় কিছু পরিবর্তন দেখা গেছে। সামগ্রিকভাবে বিএনপি তাদের মূল সমর্থক গোষ্ঠী ধরে রেখেছে এবং পূর্বের রাউন্ডে জামায়াত বা অন্য ছোট দলগুলোকে ভোট দেওয়ার কথা বলা কিছু ভোটারও এখন বিএনপির প্রতি সমর্থন দেখাচ্ছেন।
যদিও বিএনপি থেকে জামায়াত এবং জামায়াত থেকে বিএনপিতে কিছু ভোট স্থানান্তরিত হয়েছে, তবে সামগ্রিকভাবে জামায়াতের দিকে নিট পরিবর্তন বেশি দেখা যাচ্ছে, যা তাদের বর্তমান ভোট ভাগাড়ে প্রভাব ফেলেছে। বিএনপি উল্লেখযোগ্যভাবে আওয়ামী লীগের ভোটারদের কাছ থেকেও সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। কিছু জামায়াত সমর্থক তাদের ভোট পছন্দ এখনো প্রকাশ করেননি। তুলনামূলকভাবে জামায়াতের ভোট ব্যাংকে অস্থিরতা বিএনপির চেয়ে বেশি লক্ষ্য করা গেছে। এছাড়া, জামায়াত ও এনসিপির জোটের কারণে এনসিপির কিছু ভোট বিএনপির দিকে চলে গেছে বলেও ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
পূর্বের আওয়ামী লীগ ভোটারদের মধ্যে ৩২.৯ শতাংশ বিএনপিকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা প্রকাশ করেছেন, ১৩.২ শতাংশ জামায়াতকে ভোট দিতে পারেন বলে জানিয়েছেন, এবং ৪১.৩ শতাংশ এখনো সিদ্ধান্তহীন।
জরিপে আরও দেখা যায়, তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর মতো ঘটনাগুলো সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে বিএনপির দিকে ঝুঁকে পড়তে প্রভাবিত করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা উল্লেখ করেন যে, ভোটব্যাংকে এখনো অস্থিরতা বিদ্যমান এবং প্রচার কৌশলের ধরন অনুযায়ী বিএনপি ও জামায়াত জোটের মধ্যে ব্যবধান আরও কমে আসতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত আসন বণ্টনে প্রভাব ফেলতে পারে। সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ এম শাহান, ভয়েস ফর রিফর্মের যুগ্ম আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর, ব্রেইনের নির্বাহী পরিচালক শফিকুল রহমান, সদস্য জ্যোতি রহমান এবং ইনোভেশন কনসাল্টিংয়ের পোর্টফোলিও ডিরেক্টর তাসমিয়া রহমান বক্তব্য রাখেন।
রিপোর্টারের নাম 























