প্রাচীনকাল থেকেই বাংলা এক অনন্য গণতান্ত্রিক চেতনার ধারক। ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে রাজা গোপালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এই ভূখণ্ডে যে জননির্বাচিত শাসনের ঐতিহ্য শুরু হয়েছিল, তা পৃথিবীর অনেক পশ্চিমা দেশের এমন ধারণার উন্মেষের বহু শতাব্দী পূর্বের ঘটনা। মাৎস্যন্যায়-এর মতো শতবর্ষব্যাপী অরাজকতা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় জনগণ নিজেরাই তাদের শাসক বেছে নিয়েছিল, যা বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করে। এই ঐতিহ্য কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং এটি বাংলার জনগণের স্বকীয়তা ও নির্বাচিত নেতৃত্বের প্রতি তাদের গভীর আস্থার প্রতীক।
রাজা গোপালের আবির্ভাবের পূর্বে প্রায় এক শতাব্দী ধরে বাংলায় বিরাজ করছিল ‘মাৎস্যন্যায়’ নামক এক চরম অরাজক পরিস্থিতি। এ সময় আর্য ইয়াফেস-বংশীয় শশাঙ্ক দেব গৌড় দখল করে নিজেকে ‘রাজা’ ঘোষণা করেন এবং বর্তমান বাংলাদেশের বিশাল অংশজুড়ে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। তিনি আর্যাবর্ত থেকে ব্রাহ্মণদের আমদানি করে স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ও পণ্ডিতদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালান, বৌদ্ধ মঠগুলো ধ্বংস করেন এবং বর্ণবাদী প্রথার প্রচলন করেন। এই নিপীড়ন ও অরাজকতার ফলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে বাংলার জনগণ এক অসাধারণ পদক্ষেপ নেয়। তারা প্রচলিত শ্রেণি-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে নিজেদের মধ্য থেকে ‘গোপাল’ নামে পরিচিত একজন রাখালকে তার প্রজ্ঞা ও চরিত্রের গুণেই শাসক হিসেবে নির্বাচিত করে। প্রচলিত অর্থে ‘গোপাল’কে গরুর রাখাল মনে করা হলেও, ঐতিহাসিক ও ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এর গভীরতর তাৎপর্য উঠে আসে। প্রাচীন সেমিটিক ভাষামূলে ‘গো’ শব্দের অর্থ ‘জাতি’ বা ‘গোত্র’ এবং ‘পাল’ শব্দের অর্থ ‘রক্ষক’ বা ‘পালনকর্তা’। অর্থাৎ, ‘গোপাল’ মানে ‘জাতি ও গোত্র-রক্ষক’। জনগণ তাকে তাদের ‘জাতি ও গোত্র-রক্ষক’ হিসেবেই বেছে নিয়েছিল, যা বাংলার জননেতৃত্বের প্রতি তাদের অগাধ আস্থারই প্রতিফলন। অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে গোপালের এই নির্বাচন বিশ্বব্যাপী জননির্বাচিত শাসনব্যবস্থার ধারণার উন্মেষের বহু পূর্বেই বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
এই জননির্বাচিত শাসনব্যবস্থার ধারণার পেছনে সেমিটিক অনার্য ঐতিহ্যের একটি গভীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। রাজা গোপালের নির্বাচনের প্রায় এক শতাব্দী পূর্বে আরব্য উপদ্বীপে মদিনায় ‘খেলাফত’ নামক শাসনব্যবস্থার সূচনা হয়েছিল, যেখানে হজরত আবু বকর (রা.) জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হয়ে শাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ঐতিহাসিকদের মতে, হজরত আবু বকরের (রা.) নামটিও তার নেতৃত্বশীল ও অগ্রণী ভূমিকার ইঙ্গিত দেয়, যেখানে ‘বকর’ অর্থ ‘ভোর’ বা ‘সূচনা’ এবং ‘আবু’ অর্থ ‘অধিপতি’ বা ‘অগ্রণী’। মদিনার এই নির্বাচিত শাসনব্যবস্থার খবর বাংলায় পৌঁছানো এবং তৎকালীন বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ অনার্য সেমিটিক দ্রাবিড় বাঙালিদের ওপর আর্য ব্রাহ্মণদের নিপীড়নের প্রেক্ষাপটে এই ধারণা তাদের আকৃষ্ট করে থাকতে পারে। এভাবেই, ইসলাম গ্রহণের বহু পূর্বেই বাংলার গোত্রপ্রধানরা আরবদের মদিনায় সূচিত ব্যবস্থার অনুরূপ একটি জননির্বাচিত শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রায় পাঁচশ বছর পর, আর্য ভারতীয় আধিপত্যবাদী ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বাংলার জনগণ আবারও জননন্দিত সমতাভিত্তিক ‘সুলতানি’ শাসনব্যবস্থা গ্রহণ করে। ১৩৪২ খ্রিস্টাব্দে সোনারগাঁর সুলতান হাজি শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের নেতৃত্বে বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতানি শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, যা একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে ‘বাংলাদেশ’-এর ভিত্তি স্থাপন করে। ‘খেলাফত’ অর্থ ‘প্রতিনিধিত্ব’, ‘সুলতান’ অর্থ ‘মঙ্গলকর্মের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি’ এবং ‘নবাব’ অর্থ ‘দায়িত্বপ্রাপ্তের প্রতিনিধি’—এই শব্দগুলো বাংলার ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গভীরভাবে মিশে আছে। বিদেশি ঔপনিবেশিক ব্যবসায়ী ও তাদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ পাদে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব, হজরত হাজি নূরুদ্দিন মজনু শাহের শাহাদাত বরণের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য সাময়িকভাবে অস্তমিত হয়।
তবে, বাংলার এই স্বাধীনতার সূর্য বহু বীরের রক্ত, ঘাম এবং অসংখ্য মনীষীর সাধনার বিনিময়ে আবারও উদিত হয়েছে। জননির্বাচিত শাসনের যে সুদীর্ঘ ঐতিহ্য রাজা গোপালের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল, তা বাংলার রাজনৈতিক চেতনার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ এই ঐতিহ্যবাহী শাসনব্যবস্থার পুনরাভিষেকের সময় এসেছে, যেখানে জনগণের কণ্ঠস্বরই হবে মূল ভিত্তি এবং নির্বাচিত নেতৃত্বই হবে জাতির ভবিষ্যৎ পথপ্রদর্শক।
রিপোর্টারের নাম 
























