কোনো বহিঃশক্তির চাপ ব্যতিরেকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় নিজস্ব প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করাই হলো ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ বা স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি। স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ভারত এই নীতিকে তাদের কূটনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। তবে বর্তমানের দ্রুত পরিবর্তনশীল ও মেরুকরণ হওয়া বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে দিল্লির এই ভারসাম্য রক্ষার নীতি হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যা একসময় ভারতের জন্য সুরক্ষাকবচ ছিল, তা এখন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের বোঝা হয়ে উঠছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব যখন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন—এই দুই শিবিরে বিভক্ত, তখন কোনো জোটে না গিয়ে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে ভারত জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন বা ‘ন্যাম’-এর অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর হাত ধরে শুরু হওয়া এই নীতির লক্ষ্য ছিল উভয় পক্ষের কাছ থেকে উন্নয়ন সহায়তা গ্রহণ করা। বর্তমান সময়ে একে ‘বহু-জোটবদ্ধতা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়, যেখানে ভারত একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক ও জ্বালানি সম্পর্ক রাখছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা এবং চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
তবে সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ভারতকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা দেশগুলো কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিলেও ভারত তা এড়িয়ে রাশিয়ার কাছ থেকে কম মূল্যে জ্বালানি তেল আমদানি অব্যাহত রেখেছে। এর ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দিল্লির বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে এবং ভারতকে মার্কিন শুল্ক ও নজরদারির মুখে পড়তে হচ্ছে।
অন্যদিকে, রাশিয়ার ওপর ভারতের প্রতিরক্ষা নির্ভরতা এখন বড় ঝুঁকির মুখে। যুদ্ধের কারণে রাশিয়া নিজেই নিজেদের সামরিক সরঞ্জামের জোগান দিতে হিমশিম খাচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতার ওপর। আবার পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা বাড়লেও উচ্চ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দিল্লির প্রবেশাধিকার এখনো সীমিত। পশ্চিমা দেশগুলো ভারতকে তাদের ‘অপরিহার্য অংশীদার’ মনে করলেও কৌশলগত স্বার্থের প্রশ্নে এখনো শর্তসাপেক্ষ সম্পর্কের গণ্ডিতে আটকে রেখেছে।
চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। সীমান্তে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা এবং সংঘাত সত্ত্বেও বেইজিংয়ের ওপর দিল্লির অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমছে না। ইলেকট্রনিকস, ওষুধ শিল্প এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির কাঁচামালের জন্য ভারত এখনো ব্যাপকভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ইতোমধ্যে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা ভারতের অর্থনীতির জন্য এক বড় দুশ্চিন্তার কারণ।
কূটনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ভারতের এই ‘সব দিকে তাল মিলিয়ে চলা’র নীতি অনেক ক্ষেত্রে কোনো পক্ষকেই সন্তুষ্ট করতে পারছে না। প্রধান বৈশ্বিক সংকটগুলোতে ভারতের অস্পষ্ট অবস্থান পশ্চিমা মিত্রদের কাছে সমালোচিত হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে ভারতের জোরালো উপস্থিতি থাকলেও তা থেকে আশানুরূপ অর্থনৈতিক বা কৌশলগত সুবিধা আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন নিজেই কোনো সমস্যা নয়, বরং অগ্রাধিকার নির্ধারণে ভারতের ব্যর্থতাই এখন মূল সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অস্পষ্ট নীতি ভারতের জন্য আর ঢাল হিসেবে কাজ করছে না। বরং এটি ভারতের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে সংকুচিত করছে। ভারতকে এখন তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার স্থানীয়করণ, একক কোনো দেশের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং বাণিজ্যিক বৈচিত্র্য আনার দিকে কঠোর নজর দিতে হবে।
যদি ভারত তার এই দীর্ঘদিনের পুরনো নীতিকে বর্তমান সময়ের উপযোগী করে সংস্কার করতে না পারে, তবে এই ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ দেশটির জন্য একটি বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদী দায় বা ‘গলার ফাঁস’ হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। সার্বভৌমত্ব রক্ষার এই প্রাচীন কৌশলটি এখন ভারতের জন্য নতুন কোনো সংকটের জন্ম দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
রিপোর্টারের নাম 
























