চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে রাজনৈতিক সচেতনতার এক নতুন জোয়ার পরিলক্ষিত হচ্ছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দেশের নারী সমাজ। গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের আগে রাজপথের আন্দোলনে নারীদের সাহসী অংশগ্রহণ বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে। সন্তানদের হাত ধরে মিছিলে আসা কিংবা ভাইয়ের মরদেহ নিয়ে বোনের শোকাতুর পদযাত্রা—এসব দৃশ্যপটে লুকিয়ে ছিল এক গভীর রাজনৈতিক পরিবর্তনের বার্তা। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী ভোটাররাই হতে যাচ্ছেন জয়-পরাজয় নির্ধারণের প্রধান নিয়ামক।
নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন এবং নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন। অর্থাৎ মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই নারী। অতীতে নারী ভোটাররা পরিবারের পুরুষ সদস্যদের পছন্দে ভোট দিলেও এবার সেই চিত্র পাল্টে যাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসার এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হয়ে নারীরা এখন অনেক বেশি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম।
ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের নির্বাচনে নারী ভোটারদের একটি বড় অংশ জাতীয়তাবাদী ধারার রাজনীতির প্রতি অনুরাগী ছিল। বিশেষ করে বেগম খালেদা জিয়ার আমলে নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে নেওয়া পদক্ষেপগুলো তাকে নারী সমাজের কাছে আইকনে পরিণত করেছিল। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ইসলামপন্থি দলগুলোর প্রতি নারীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
এই পরিবর্তনের প্রথম আভাস পাওয়া গেছে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে। সেখানে দেখা গেছে, নারী হলের শিক্ষার্থীরা বিপুল ভোটে ইসলামপন্থি ছাত্র সংগঠনের প্রার্থীদের বিজয়ী করেছেন। ছাত্রীদের এই পছন্দের নেপথ্যে কাজ করেছে ক্যাম্পাসে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ইভটিজিং রোধ এবং প্রার্থীদের মার্জিত আচরণ। এছাড়া আধুনিক ও বৈচিত্র্যময় প্রচার কৌশলও তরুণ নারী ভোটারদের আকৃষ্ট করেছে। এই পরিবর্তনের রেশ জাতীয় নির্বাচনেও পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নির্বাচনি প্রচারণার মাঠেও ইসলামপন্থি দলগুলোর বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মীদের সক্রিয়তা চোখে পড়ার মতো। গত দেড় দশকে প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও নারীদের মধ্যে তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত হয়েছে। সম্প্রতি দলটির বিভিন্ন জনসভায় নারীদের ব্যাপক উপস্থিতি এবং নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের জন্য কর্মমুখী পরিকল্পনা উপস্থাপন জনমনে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। তবে অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির এই ইতিবাচক আবহের মধ্যেও নারী প্রার্থীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। এবার নির্বাচনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নারী প্রার্থীর হার মাত্র ৪ শতাংশ, যা প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম।
এদিকে, নির্বাচনি ডামাডোলের মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে হিজাব বা বোরকা পরিহিত নারী কর্মীদের হেনস্তা ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠছে। রাজধানীর একটি ঘটনায় এক নারী কর্মীকে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে আঘাত করার খবরও পাওয়া গেছে। এসব নেতিবাচক কর্মকাণ্ড নির্বাচনি পরিবেশকে কলুষিত করতে পারে। সচেতন মহলের মতে, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে নারীদের প্রতি এই বৈষম্য বা সহিংসতা সুস্থ রাজনীতির অন্তরায়। নারীবাদী সংগঠন ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের এ বিষয়ে নীরবতাও অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নারী ভোটারদের আস্থা অর্জন করা। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড বা চাঁদাবাজির অভিযোগ যেন নারী ভোটারদের মনে নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, সেদিকে দলগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে।
সব মিলিয়ে, আওয়ামী লীগবিহীন এই প্রথম অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার রাজনৈতিক লড়াইয়ে নারী ভোটাররা কোন দিকে ঝুঁকবেন, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামীর রাষ্ট্রক্ষমতার চাবিকাঠি। সহিংসতা এড়িয়ে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় থাকলে নারীদের এই নীরব ভোটবিপ্লব বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সূচনা করতে পারে।
রিপোর্টারের নাম 
























