হাজার হাজার বছর ধরে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার ধারণা মানব সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রাচীন গ্রিক নগররাষ্ট্র স্পার্টার সামরিক দক্ষতা কিংবা এথেন্সের জ্ঞানচর্চা, অথবা আর্যদের সপ্তসিন্ধু বিজয়ের প্রেক্ষাপট—সবকিছুতেই আত্মরক্ষা ও রাষ্ট্রীয় টিকে থাকার কৌশল গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে আধুনিক বিশ্বে ঔপনিবেশিকতা এবং নয়া-ঔপনিবেশিকতার প্রভাবে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক ধারণায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। একসময় এমন মনস্তাত্ত্বিক হীনম্মন্যতাবোধ তৈরি করা হয়েছিল যে, ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন নেই, যা আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তিগুলোর উত্থানে সহায়ক হয়েছে।
প্রতিরক্ষা বা নিরাপত্তা মানেই যুদ্ধ নয়, বরং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য এটি একটি অপরিহার্য ধারণা। একটি স্বাধীন ও আধিপত্যবাদবিরোধী পররাষ্ট্রনীতি এবং এর ফলস্বরূপ কার্যকর কূটনীতিই হলো জাতীয় সুরক্ষার মূল ভিত্তি। ব্রিটিশ কূটনীতিক হ্যারল্ড নিকলসন যেমন বলেছিলেন, ‘কূটনীতিই হলো প্রতিরক্ষার প্রথম ধাপ’। এ ক্ষেত্রে সংঘাত বা বিরোধ নিরসনে আলোচনাভিত্তিক সমাধান নিশ্চিত করতে প্রতিরোধমূলক কূটনীতির গুরুত্ব অপরিসীম।
প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই তার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জনঅংশীদারত্বমূলক জাতীয় প্রতিরক্ষা-নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার অধিকার রয়েছে। জার্মান বংশোদ্ভূত আমেরিকান তাত্ত্বিক হ্যান্স জে. মরগেনথাউ তার ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত ‘পলিটিক্স অ্যামাং নেশনস’ গ্রন্থে জাতীয় স্বার্থকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষা, জনগণ, ভূখণ্ড ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার সুরক্ষা হলো জাতীয় স্বার্থ। বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে আবেগ বা নৈতিকতার চেয়ে বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকে ‘প্রতিরক্ষা কূটনীতি’ (Defence Diplomacy) একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। এর অর্থ হলো, সামরিক শক্তিকে পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবায়নে ব্যবহার করা। সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, যৌথ মহড়া, সামরিক প্রতিনিধিদল বিনিময় এবং দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া ও রক্ষা করাই এর উদ্দেশ্য। এটি এমন এক গঠনমূলক প্রক্রিয়া, যেখানে জাতীয় প্রতিরক্ষা ও সামরিক বিষয়গুলো বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং নিজ স্বার্থে পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
তবে, আধুনিককালে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ধারণাকে ভুল ব্যাখ্যা করে ‘ভুয়া বা জাল বয়ান’ (Fake Narrative) তৈরি করা একটি নতুন সংযোজন। এটি বৈরী বা বন্ধু নয় এমন আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর কৌশল। উদ্দেশ্যমূলক মিথ্যাচার, ভুল যুক্তি এবং বিকৃত তথ্য প্রচার করে একটি নির্দিষ্ট সরকার, রাজনৈতিক গোষ্ঠী বা দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবিশ্বাস, সংশয় ও হীনম্মন্যতা তৈরি করা হয়। হিটলারের তথ্যমন্ত্রী যোসেফ গোয়েবলসের ‘মিথ্যার বারবার পুনরাবৃত্তি তাকে সত্যে পরিণত করে’—এই তত্ত্বের আধুনিক সংস্করণ এটি। এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ‘সম্মতি উৎপাদন’ (Manufacturing Consent) করা হয়, যেখানে সত্য মিথ্যায় পরিণত হয় এবং মিথ্যাকে সত্য বলে বিশ্বাস করানো হয়। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো প্রায়শই তেলসম্পদ অথবা কৌশলগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে ইসলামকে মৌলবাদ বা সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত করে এমন জাল বয়ান তৈরি করে।
ঔপনিবেশিকতা, বিশ্বযুদ্ধ এবং স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। জাতিসংঘ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এখন আর পুরোপুরি কার্যকর নয়। বিশ্ব এখন শক্তির ক্ষমতা প্রদর্শনের দিকে ঝুঁকছে। ক্ষমতার ভারসাম্যের (Balance of Power) চিরায়ত তত্ত্বের পরিবর্তে স্টিফেন ওয়াল্টের ‘হুমকির ভারসাম্য’ (Balance of Threat) তত্ত্ব এখন বেশি প্রাসঙ্গিক। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, রাষ্ট্রগুলো কেবলমাত্র ক্ষমতার ভিত্তিতে নয়, বরং কোন রাষ্ট্রকে সবচেয়ে বড় হুমকি বা ভীতির কারণ মনে করে, তার বিরুদ্ধে জোট গঠন করে। ক্ষমতা, ভৌগোলিক নৈকট্য, আক্রমণাত্মক সক্ষমতা ও অভিপ্রায় বিবেচনা করে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়।
বর্তমানে ক্ষুদ্র বা মাঝারি শক্তির রাষ্ট্রগুলো যে দ্বিপক্ষীয় বা ত্রিপক্ষীয় জোট গঠন করছে, তা মূলত হুমকির ভারসাম্য রক্ষা এবং প্রতিরক্ষা কূটনীতির মাধ্যমেই হচ্ছে। সৌদি আরব ও পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে তুরস্কের যোগ দিতে চাওয়ার সাম্প্রতিক উদাহরণ এর প্রমাণ। পরিবর্তিত এই বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশকেও সতর্ক থাকতে হবে এবং নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রতিরক্ষা কূটনীতি ও হুমকির ভারসাম্য রক্ষার কৌশলকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
রিপোর্টারের নাম 
























