বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বর্তমান সময়টি এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জনমনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—দেশ কি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণের পথে হাঁটবে, নাকি দীর্ঘদিনের স্বৈতান্ত্রিক ও দমনমূলক নীতির বৃত্তেই বন্দি থাকবে? বিগত কয়েক দশকে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড এবং শাসনপদ্ধতি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান তৈরি করেছে। এই বাস্তবতায় একটি আদর্শ ও নীতিভিত্তিক রাজনৈতিক দলের প্রয়োজনীয়তা এখন সময়ের দাবি।
বিগত দীর্ঘ শাসনামলে উন্নয়নের কিছু দৃশ্যমান চিত্র ফুটে উঠলেও দুর্নীতি, পরিবারতন্ত্র, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং প্রশাসনিক দলীয়করণের মতো নেতিবাচক বিষয়গুলো রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে দুর্বল করেছে। বিশেষ করে নির্বাচন ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং বিরোধী মত দমনের সংস্কৃতি নাগরিক স্বাধীনতাকে সংকুচিত করেছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতির পরিসংখ্যানের আড়ালে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, বেকারত্ব এবং ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা জনমনে গভীর অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে, প্রধান বিরোধী দলগুলোও দীর্ঘদিনের দমন-পীড়ন এবং অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব সংকটের কারণে কার্যকর রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের মেলে ধরতে হিমশিম খাচ্ছে। যদিও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে তাদের অবস্থান কিছুটা নৈতিক সমর্থন পাচ্ছে, কিন্তু অতীতের দুর্নীতির ছায়া ও পরিবারতান্ত্রিক কাঠামো তাদের ভাবমূর্তিকে এখনো পুরোপুরি উজ্জ্বল করতে দেয়নি।
এই প্রেক্ষাপটে দেশের ভোটাররা এখন এমন এক রাজনৈতিক শক্তির সন্ধান করছে, যারা কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে নয়, বরং রাষ্ট্রকে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও স্বচ্ছ ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সচেষ্ট হবে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু সুশৃঙ্খল সংগঠনের উত্থান এবং তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে নতুন ধারার রাজনীতির চর্চা ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের নৈতিক দ্বিধা ও নতুন আশার সঞ্চার করেছে। মানুষ এখন আর ব্যক্তিপূজা বা নেতাভিত্তিক রাজনীতিতে সন্তুষ্ট নয়; তারা চায় এমন এক দল, যেখানে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা থাকবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তৃণমূলের কর্মীদের মতামতের প্রতিফলন ঘটবে।
একটি আদর্শ রাজনৈতিক দলের প্রধান বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিচারবহির্ভূত সংস্কৃতির অবসান ঘটানো। রাষ্ট্রের ক্ষমতা যেন কোনোভাবেই নাগরিক অধিকার হরণের হাতিয়ার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিরক্ষা নীতির ক্ষেত্রে কেবল সামরিক সরঞ্জামের আধুনিকায়ন নয়, বরং মানবিক নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ শান্তি নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একটি মজবুত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি দেশের প্রতিটি নাগরিকের নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাজনৈতিক দলের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার হওয়া উচিত।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের আমূল পরিবর্তন একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠনের জন্য অপরিহার্য। বর্তমানের মুখস্থনির্ভর ও বাজারমুখী শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে এমন এক নীতি গ্রহণ করতে হবে, যা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল, নৈতিক এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে। একইভাবে, স্বাস্থ্যসেবাকে কেবল বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে না দেখে একে প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার জন্য কৃষিতে জৈব পদ্ধতির প্রবর্তন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও সবুজায়নকে রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে রাখতে হবে। নদী দখলমুক্ত করা এবং পরিবেশ রক্ষায় কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা এখন বিলাসিতা নয়, বরং অস্তিত্বের লড়াই।
প্রযুক্তি খাতে কেবল আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা এবং তরুণ প্রজন্মকে গবেষণামুখী করে তোলা একটি দূরদর্শী রাজনৈতিক দলের কাজ। এছাড়া নারী, শিশু, বয়স্ক এবং সংখ্যালঘুদের সম-অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা কেবল বক্তৃতার বিষয় না হয়ে দলীয় ম্যান্ডেটের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া প্রয়োজন।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের মানুষ এমন এক রাজনৈতিক দল প্রত্যাশা করে যারা ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে একটি আধুনিক, বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র বিনির্মাণে কাজ করবে। ক্ষমতা যখন সেবার পরিবর্তে শোষণের হাতিয়ার হয়, তখন সমাজ ও রাষ্ট্র উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই আগামী দিনের রাজনীতি হওয়া উচিত নীতি ও আদর্শের মেলবন্ধন, যেখানে রাষ্ট্র হবে প্রকৃত অর্থেই জনগণের সেবক। এই লক্ষ্য অর্জনে রাজনৈতিক দলগুলোকে কেবল স্লোগানে নয়, বরং বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় স্বচ্ছতা ও সততার পরিচয় দিতে হবে।
রিপোর্টারের নাম 
























