বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। তবে প্রকৃতির এই অপার বিস্ময় এখন প্লাস্টিক দূষণ ও নানাবিধ অব্যবস্থাপনার কারণে তার চিরচেনা সৌন্দর্য হারাতে বসেছে। সম্প্রতি পর্যটকদের সচেতন করতে সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে স্থাপন করা হয়েছে একটি বিশাল ‘প্লাস্টিক দানব’ ভাস্কর্য। প্লাস্টিক বর্জ্যের ভয়াবহতা ফুটিয়ে তোলা এই দানবটি পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও এর নেপথ্যে থাকা পরিবেশগত সংকটটি অত্যন্ত গভীর ও উদ্বেগের।
সরেজমিনে দেখা যায়, সৈকতের বালুকা বেলা থেকে শুরু করে সমুদ্রের নীল জলরাশি—সবখানেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন, খাবারের প্যাকেট ও স্ট্র। জোয়ার-ভাটার টানে এসব বর্জ্য সমুদ্রে গিয়ে মিশছে, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষকদের মতে, এসব প্লাস্টিক দীর্ঘ সময় পর মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়, যা মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর মাধ্যমে মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য এক দীর্ঘমেয়াদী মরণঘাতী ঝুঁকি তৈরি করছে।
কক্সবাজারে পর্যটনের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্লাস্টিকের ব্যবহার। হোটেল, রেস্তোরাঁ ও স্থানীয় দোকানগুলোতে পরিবেশবান্ধব উপকরণের অভাব এবং যত্রতত্র আবর্জনা ফেলার প্রবণতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। যদিও দেশে পলিথিন ও ক্ষতিকর প্লাস্টিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে আইন রয়েছে, তবে পর্যটন নগরীতে এর প্রয়োগ অনেকটা শিথিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নিয়মিত নজরদারি ও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে এই ‘প্লাস্টিক দানব’ অচিরেই সৈকতের প্রাণভোমরাকে গ্রাস করে ফেলবে।
প্লাস্টিক দূষণের পাশাপাশি সৈকতের পরিবেশের জন্য নতুন আপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে বেওয়ারিশ কুকুরের অবাধ বিচরণ ও ঘোড়ার বিষ্ঠা। পর্যটকরা অভিযোগ করছেন, সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে কুকুরের দলবদ্ধ বিচরণ ও মলমূত্রের কারণে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে, যা ভ্রমণের আনন্দকে ম্লান করে দিচ্ছে। এছাড়া বালুতে পশুর বিষ্ঠার কারণে চর্মরোগ ও কৃমি সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে ভ্রমণে আসা পরিবারগুলো এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কক্সবাজারকে রক্ষা করতে হলে কেবল সচেতনতামূলক ভাস্কর্য স্থাপনই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ। স্থানীয় কমিউনিটিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সম্পৃক্ত করা, প্লাস্টিকের বিকল্প সহজলভ্য করা এবং সৈকতের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে তাদের সমুদ্রসৈকতকে প্লাস্টিকমুক্ত ঘোষণা করতে সক্ষম হয়েছে; সঠিক পরিকল্পনা ও সদিচ্ছা থাকলে কক্সবাজারকেও সেই মানে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব।
সমুদ্রের গর্জন আর নির্মল বাতাসের টানে মানুষ বারবার কক্সবাজারে ফিরে আসে। কিন্তু সেই গর্জনের সঙ্গে যদি প্লাস্টিকের খসখস আর দুর্গন্ধ মিশে থাকে, তবে তা পর্যটন শিল্পের জন্য আত্মঘাতী হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ ও সুন্দর সৈকত নিশ্চিত করতে প্লাস্টিক দানব ও অব্যবস্থাপনার এই চক্র থেকে কক্সবাজারকে মুক্ত করা অপরিহার্য।
রিপোর্টারের নাম 
























