ঢাকা ০৬:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

রমজান ও নির্বাচন ঘিরে পণ্য মজুতের নতুন কৌশল: নজরদারিতে ‘ভাসমান গুদাম’

আসন্ন পবিত্র রমজান মাস এবং একই সময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা তৈরির এক নতুন কৌশল নিয়েছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। সাধারণত রমজানে চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় সুযোগসন্ধানী আমদানিকারকরা স্থলভাগের গুদামের পরিবর্তে এবার নদীপথে লাইটার জাহাজ ব্যবহার করে পণ্য মজুত করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নারায়ণগঞ্জ, যশোর ও নোয়াপাড়া এলাকার নদীগুলোতে পণ্য খালাস না করে জাহাজগুলোকে কার্যত ‘ভাসমান গুদাম’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকারের গোয়েন্দা ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, কিছু আমদানিকারক আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পণ্য আনলেও তা বন্দরে খালাস না করে দীর্ঘ সময় জাহাজে আটকে রাখছেন। এতে বহিঃনোঙরে বাণিজ্যিক জাহাজের জট সৃষ্টি হচ্ছে এবং বাজারে সরবরাহ কম থাকায় ছোলা, চিনি ও ভোজ্যতেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। রাজধানীর কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীদের মতে, পাইকারি বাজারে পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত থাকার কথা থাকলেও আমদানিকারকদের এই ‘ধীরে চলো’ নীতির কারণে খুচরা পর্যায়ে ক্রেতারা চড়া দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

এই সংকট নিরসনে নৌপরিবহন অধিদফতর অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। অধিদফতরের মহাপরিচালক কমডোর মোহাম্মদ শফিউল বারী জানিয়েছেন, একটি উচ্চপর্যায়ের ছয় সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এই টিমে নৌপরিবহন অধিদফতর ছাড়াও বাংলাদেশ কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ এবং অভ্যন্তরীণ নৌযান পরিদর্শন দফতরের প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। এই টাস্কফোর্স গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করবে। যদি কোনো লাইটার জাহাজে অনুমোদিত সময়ের চেয়ে বেশি দিন পণ্য আটকে রাখার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক ও জাহাজ মালিকের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আইনগত দিক থেকে এই মজুতদারী অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। ‘খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, মজুত, স্থানান্তর, পরিবহন, সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণন (ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধ) আইন, ২০২৩’ অনুযায়ী, সরকারি নির্ধারিত সীমার বেশি পণ্য মজুত করলে অপরাধীর ২ থেকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। সরকার এই আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে বাজারে পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে চায়। তবে লাইটার জাহাজ মালিক সমিতির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, অনেক বড় কোম্পানি তাদের নিজস্ব জাহাজে পণ্য রাখে এবং খালাসে সামান্য বিলম্ব হতে পারে, যাকে উদ্দেশ্যমূলক মজুতদারী বলা ঠিক হবে না।

বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচন ও রমজান কাছাকাছি হওয়ায় অসাধু চক্র এই সময়টিকে মুনাফা লুটে নেওয়ার মোক্ষম সুযোগ হিসেবে দেখছে। যদি এখনই ভাসমান এই গুদামগুলো থেকে পণ্য খালাস করে বাজারে সরবরাহ বাড়ানো না হয়, তবে সাধারণ ভোক্তাদের ভোগান্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। বিশেষ করে ছোলার দাম এখনই বাড়তে শুরু করায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের সময়োপযোগী এই টাস্কফোর্স অভিযান সফল হলে বাজারের অস্থিরতা প্রশমিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুঝুঁকি ও লিবিয়ার ‘গেম ঘরে’ বন্দি বাংলাদেশিরা

রমজান ও নির্বাচন ঘিরে পণ্য মজুতের নতুন কৌশল: নজরদারিতে ‘ভাসমান গুদাম’

আপডেট সময় : ০২:১০:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬

আসন্ন পবিত্র রমজান মাস এবং একই সময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা তৈরির এক নতুন কৌশল নিয়েছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। সাধারণত রমজানে চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় সুযোগসন্ধানী আমদানিকারকরা স্থলভাগের গুদামের পরিবর্তে এবার নদীপথে লাইটার জাহাজ ব্যবহার করে পণ্য মজুত করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নারায়ণগঞ্জ, যশোর ও নোয়াপাড়া এলাকার নদীগুলোতে পণ্য খালাস না করে জাহাজগুলোকে কার্যত ‘ভাসমান গুদাম’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকারের গোয়েন্দা ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, কিছু আমদানিকারক আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পণ্য আনলেও তা বন্দরে খালাস না করে দীর্ঘ সময় জাহাজে আটকে রাখছেন। এতে বহিঃনোঙরে বাণিজ্যিক জাহাজের জট সৃষ্টি হচ্ছে এবং বাজারে সরবরাহ কম থাকায় ছোলা, চিনি ও ভোজ্যতেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। রাজধানীর কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীদের মতে, পাইকারি বাজারে পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত থাকার কথা থাকলেও আমদানিকারকদের এই ‘ধীরে চলো’ নীতির কারণে খুচরা পর্যায়ে ক্রেতারা চড়া দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

এই সংকট নিরসনে নৌপরিবহন অধিদফতর অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। অধিদফতরের মহাপরিচালক কমডোর মোহাম্মদ শফিউল বারী জানিয়েছেন, একটি উচ্চপর্যায়ের ছয় সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এই টিমে নৌপরিবহন অধিদফতর ছাড়াও বাংলাদেশ কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ এবং অভ্যন্তরীণ নৌযান পরিদর্শন দফতরের প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। এই টাস্কফোর্স গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করবে। যদি কোনো লাইটার জাহাজে অনুমোদিত সময়ের চেয়ে বেশি দিন পণ্য আটকে রাখার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক ও জাহাজ মালিকের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আইনগত দিক থেকে এই মজুতদারী অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। ‘খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, মজুত, স্থানান্তর, পরিবহন, সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণন (ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধ) আইন, ২০২৩’ অনুযায়ী, সরকারি নির্ধারিত সীমার বেশি পণ্য মজুত করলে অপরাধীর ২ থেকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। সরকার এই আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে বাজারে পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে চায়। তবে লাইটার জাহাজ মালিক সমিতির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, অনেক বড় কোম্পানি তাদের নিজস্ব জাহাজে পণ্য রাখে এবং খালাসে সামান্য বিলম্ব হতে পারে, যাকে উদ্দেশ্যমূলক মজুতদারী বলা ঠিক হবে না।

বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচন ও রমজান কাছাকাছি হওয়ায় অসাধু চক্র এই সময়টিকে মুনাফা লুটে নেওয়ার মোক্ষম সুযোগ হিসেবে দেখছে। যদি এখনই ভাসমান এই গুদামগুলো থেকে পণ্য খালাস করে বাজারে সরবরাহ বাড়ানো না হয়, তবে সাধারণ ভোক্তাদের ভোগান্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। বিশেষ করে ছোলার দাম এখনই বাড়তে শুরু করায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের সময়োপযোগী এই টাস্কফোর্স অভিযান সফল হলে বাজারের অস্থিরতা প্রশমিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।