ঢাকা ০৭:০২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

বাংলা বাজারের হালখাতা: নতুন শুরুর দিনে হিসাবের খাতায় বকেয়ার ভার ও মিষ্টিমুখের রেওয়াজ

কড়ই গাছের ফাঁক গলে রোদ এসে পড়েছে মাটির রাস্তার ওপর। এই রাস্তা ধরে একটু এগোলেই স্কুল মাঠের দক্ষিণ পাশে কয়েকটি দোকান নিয়ে গড়ে উঠেছে ছোট একটি বাজার, যার নাম ‘বাংলা বাজার’। নামের পেছনে একটি গল্প আছে। পূর্বদিকের মানুষরা কাজ করতে বিদেশে যায় অনেকে, এক গ্রাম থেকেই দশ-বারোজন যায় ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যের একই দেশে, তারপর ওই গ্রামের বাজারের নাম হয়ে যায় সেই দেশের নামে। এই গ্রামের কেউ বিদেশ থাকে না, তাই স্কুল মাঠের কোণে নতুন করে কিছু দোকান যখন বসল, মুরব্বিরা আক্ষেপ করেই জায়গাটার নাম দিলেন ‘বাংলাদেশ বাজার’। তবে ‘দেশ’ বেশিদিন টিকল না। লোকমুখে ঘুরতে ঘুরতে তুলনামূলক সহজ উচ্চারণ হিসেবে ‘বাংলা বাজার’ নামেই সবাই ডাকে এখন।

এ বাজারের সব থেকে চালু দোকানটি ইউনূস মিয়ার। নতুন বছরের আজ প্রথম দিন। সকাল সকাল দোকান খুলে বসেছে সে, গতকাল রাত জেগে সাজানো হয়েছে দোকান। একটু পরই গরম জিলাপি আর বাতাসা এসে পৌঁছাবে। লাল কাপড়ে মোড়ানো নতুন খাতাগুলো সামনে নিয়ে বসে ইউনূস মিয়া। রঙচটা পুরনো খাতগুলোও পাশে রাখে। একটু বেলা বাড়লেই তার খদ্দেররা আসা শুরু করবে। পুরনো হিসাব চুকিয়ে নতুন খাতায় হিসাব খুলবে। গত বছর বকেয়া একটু বেশিই জমেছে। শহরে গোলমাল লাগে আর বকেয়া বাড়ে ইউনূসের দোকানে। তবে তার বিশ্বস্ত কাস্টমার যারা আছেন, তারা কোনো সময় টাকা মেরে দেয়নি—এটাই স্বস্তি।

হালখাতার দিনে এ বাজারের আলাদা এক রেওয়াজ আছে। সকালে দোকান খোলার আগে ইউনূস মিয়া খাতার ওপর হালকা করে আতর ছিটিয়ে দেয়; গন্ধটা যেন নতুন শুরুর মতো লাগে। তারপর লাল কাপড় সরিয়ে প্রথম পাতায় লেখে ‘বিসমিল্লাহ’। দোকানের সামনে ছোট্ট করে একটা জায়গা পরিষ্কার করে ইউনূস মিয়া। খদ্দেররা এলে প্রথমেই একটু মিষ্টিমুখ করাবে সে। অনেকে পুরো বকেয়া টাকাটা আজ দিতে না পারলেও আজকের দিনে অন্তত কিছুটা শোধ করবে বলেই তার বিশ্বাস। বাতাসা আর জিলাপি নিয়ে আসে দোকানের একমাত্র কর্মচারী শফিকুল।

ইউনূসের দোকানে প্রথম খদ্দের আসে উত্তরপাড়ার সরকার বাড়ির জমিরুদ্দিন সরকার। ইউনূস মিয়া দোকান থেকে বের হয়ে তাকে স্বাগত জানায়, শতবর্ষী জমিরুদ্দিন সরকার লাঠি ভর দিয়ে ঠক ঠক করে এগিয়ে আসে। ইউনূস মিয়া তাকে দোকানের সামনের বেঞ্চিতে বসতে সাহায্য করে। সরকার বাড়ির ছেলেরা ঢাকায় থাকে, বড় চাকরি করে। হিসাবের খাতাটা খোলে ইউনূস মিয়া, বেশ ভালো টাকাই বকেয়া জমেছে বুড়ো জমিরুদ্দিনের নামের পাশে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সামরিক পদক্ষেপ নিলে যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যা বাড়বে: ইরানের প্রেসিডেন্ট

বাংলা বাজারের হালখাতা: নতুন শুরুর দিনে হিসাবের খাতায় বকেয়ার ভার ও মিষ্টিমুখের রেওয়াজ

আপডেট সময় : ০৩:৫১:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

কড়ই গাছের ফাঁক গলে রোদ এসে পড়েছে মাটির রাস্তার ওপর। এই রাস্তা ধরে একটু এগোলেই স্কুল মাঠের দক্ষিণ পাশে কয়েকটি দোকান নিয়ে গড়ে উঠেছে ছোট একটি বাজার, যার নাম ‘বাংলা বাজার’। নামের পেছনে একটি গল্প আছে। পূর্বদিকের মানুষরা কাজ করতে বিদেশে যায় অনেকে, এক গ্রাম থেকেই দশ-বারোজন যায় ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যের একই দেশে, তারপর ওই গ্রামের বাজারের নাম হয়ে যায় সেই দেশের নামে। এই গ্রামের কেউ বিদেশ থাকে না, তাই স্কুল মাঠের কোণে নতুন করে কিছু দোকান যখন বসল, মুরব্বিরা আক্ষেপ করেই জায়গাটার নাম দিলেন ‘বাংলাদেশ বাজার’। তবে ‘দেশ’ বেশিদিন টিকল না। লোকমুখে ঘুরতে ঘুরতে তুলনামূলক সহজ উচ্চারণ হিসেবে ‘বাংলা বাজার’ নামেই সবাই ডাকে এখন।

এ বাজারের সব থেকে চালু দোকানটি ইউনূস মিয়ার। নতুন বছরের আজ প্রথম দিন। সকাল সকাল দোকান খুলে বসেছে সে, গতকাল রাত জেগে সাজানো হয়েছে দোকান। একটু পরই গরম জিলাপি আর বাতাসা এসে পৌঁছাবে। লাল কাপড়ে মোড়ানো নতুন খাতাগুলো সামনে নিয়ে বসে ইউনূস মিয়া। রঙচটা পুরনো খাতগুলোও পাশে রাখে। একটু বেলা বাড়লেই তার খদ্দেররা আসা শুরু করবে। পুরনো হিসাব চুকিয়ে নতুন খাতায় হিসাব খুলবে। গত বছর বকেয়া একটু বেশিই জমেছে। শহরে গোলমাল লাগে আর বকেয়া বাড়ে ইউনূসের দোকানে। তবে তার বিশ্বস্ত কাস্টমার যারা আছেন, তারা কোনো সময় টাকা মেরে দেয়নি—এটাই স্বস্তি।

হালখাতার দিনে এ বাজারের আলাদা এক রেওয়াজ আছে। সকালে দোকান খোলার আগে ইউনূস মিয়া খাতার ওপর হালকা করে আতর ছিটিয়ে দেয়; গন্ধটা যেন নতুন শুরুর মতো লাগে। তারপর লাল কাপড় সরিয়ে প্রথম পাতায় লেখে ‘বিসমিল্লাহ’। দোকানের সামনে ছোট্ট করে একটা জায়গা পরিষ্কার করে ইউনূস মিয়া। খদ্দেররা এলে প্রথমেই একটু মিষ্টিমুখ করাবে সে। অনেকে পুরো বকেয়া টাকাটা আজ দিতে না পারলেও আজকের দিনে অন্তত কিছুটা শোধ করবে বলেই তার বিশ্বাস। বাতাসা আর জিলাপি নিয়ে আসে দোকানের একমাত্র কর্মচারী শফিকুল।

ইউনূসের দোকানে প্রথম খদ্দের আসে উত্তরপাড়ার সরকার বাড়ির জমিরুদ্দিন সরকার। ইউনূস মিয়া দোকান থেকে বের হয়ে তাকে স্বাগত জানায়, শতবর্ষী জমিরুদ্দিন সরকার লাঠি ভর দিয়ে ঠক ঠক করে এগিয়ে আসে। ইউনূস মিয়া তাকে দোকানের সামনের বেঞ্চিতে বসতে সাহায্য করে। সরকার বাড়ির ছেলেরা ঢাকায় থাকে, বড় চাকরি করে। হিসাবের খাতাটা খোলে ইউনূস মিয়া, বেশ ভালো টাকাই বকেয়া জমেছে বুড়ো জমিরুদ্দিনের নামের পাশে।