নির্বাচনে নারীর ভোট যতটা কাঙ্ক্ষিত, রাজনীতির নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে তাদের উপস্থিতি ঠিক ততটাই অস্বস্তিকর করে রাখা হয়েছে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী তালিকার দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই বৈপরীত্য। মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী হলেও অধিকাংশ রাজনৈতিক দলে নারী প্রার্থী নেই। রাজপথের আন্দোলনে যে নারীরা ঢাল হয়ে দাঁড়ায়, নির্বাচনের টিকিট বণ্টনের সময় তারাই সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত হয়ে পড়ে।
নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩১টিরই কোনো নারী প্রার্থী নেই। বাকি দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে নারী প্রার্থীর সংখ্যা মাত্র ৭৬ জন। ২৯৮টি আসনে ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থীর ভিড়ে এই সংখ্যা নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বাস্তব চিত্র স্পষ্ট করে দেয়। মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটির বেশি হলেও নারী-পুরুষ ভোটারের ব্যবধান খুবই সামান্য। তবু দলীয় নারী প্রার্থীর হার মাত্র ৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ, যেখানে স্বতন্ত্র নারী প্রার্থীর হার ১০ শতাংশ।
দীর্ঘদিন রাজনীতির মাঠে সক্রিয় থেকেও অনেকের অভিজ্ঞতা হলো—ইসলামপন্থি দলগুলোর মিছিল-মিটিংয়ে নারীর উপস্থিতি কার্যত অনুপস্থিত। এসব দলের নেতাকর্মীদের বক্তব্যেও নারীর রাজনীতি-বিমুখ মানসিকতার প্রতিফলন দেখা যায়। এবারের নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জামায়াতে ইসলামী, খেলাফত মজলিসসহ একাধিক ইসলামপন্থি দল শত শত আসনে প্রার্থী দিলেও একজন নারী প্রার্থীও দেয়নি। তবে এই সংকট শুধু এসব দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সক্রিয় বড় দল বিএনপির নারী প্রার্থীও মাত্র ১০ জন।
অন্য দলগুলোর চিত্রও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। জাতীয় পার্টি, জেএসডি, বাসদ, বাসদ-মার্ক্সবাদী, গণসংহতি, এনসিপিসহ কয়েকটি দলে অল্পসংখ্যক নারী প্রার্থী থাকলেও সামগ্রিকভাবে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন অত্যন্ত দুর্বল। মাত্র ৭৬ জন নারী প্রার্থী নারীর মর্যাদা, সমতা ও ক্ষমতায়নের বাস্তব অবস্থানকে নির্মমভাবে সামনে এনে দিয়েছে। এ নিয়ে মানবাধিকার কর্মী, নারীবাদী ও সচেতন মহল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, যদিও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সেই দায়বোধ খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের ইতিহাস গৌরবোজ্জ্বল। ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি অধ্যায়েই নারীরা নেতৃত্ব দিয়েছেন, সংগঠন গড়েছেন, সংগ্রামে সামনে থেকেছেন। অথচ নির্বাচনী রাজনীতিতে এসে সেই নারীরাই বারবার ব্রাত্য হয়ে পড়ছেন।
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি সমান অধিকার, সমান অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব। সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে নেতৃত্বের বাইরে রেখে গঠিত রাজনৈতিক কাঠামো কখনোই পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক হতে পারে না। সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বাড়লেও তা সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পারেনি, বরং দলীয় অনুগ্রহের রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। এমন বাস্তবতায় ২০৩০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক দলে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্বের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবসম্মত—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
রিপোর্টারের নাম 























