ঢাকা ০৬:২৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

দেউলিয়ার পথে পিডিবি, আদানি চুক্তি বাতিলের সুপারিশ

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর অধীনে সম্পাদিত চুক্তিগুলো দেশের জাতীয় স্বার্থে নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে অন্যায্য সুবিধা দেওয়ার জন্য করা হয়েছিল। এর ফলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এখন দেউলিয়ার পথে এবং দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ খাত এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি। রোববার (২৫ জানুয়ারি) এই বিশেষ আইনের অধীনে সম্পাদিত চুক্তিসমূহ পর্যালোচনায় গঠিত জাতীয় কমিটির এক সংবাদ সম্মেলনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, ২০১৫ সালে পিডিবির বার্ষিক লোকসান ছিল ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালে এসে ১০ গুণ বেড়ে ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বর্তমানে পিডিবির প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনতে খরচ হচ্ছে ১২ টাকা ৩৫ পয়সা, অথচ তারা তা বিক্রি করছে মাত্র ৬ টাকা ৬৩ পয়সায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিডিবিকে টিকিয়ে রাখতে হলে বিদ্যুতের পাইকারি দাম অন্তত ৮৬ শতাংশ বাড়ানো প্রয়োজন, যা সাধারণ গ্রাহকের ওপর অসহনীয় চাপ তৈরি করবে।

‘রাষ্ট্র দখল’ ও অসম চুক্তির নেপথ্যে: কমিটির সদস্য ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “বিশেষ আইনের আড়ালে হওয়া চুক্তিগুলোর কারণে সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পে ৮০ শতাংশ, তেলে ৫০ শতাংশ এবং গ্যাসে ৪৫ শতাংশ বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে। এটি প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্র দখলের একটি রূপ, যেখানে লেনদেন-ভিত্তিক সম্পর্কের মাধ্যমে নীতিনির্ধারণ ও চুক্তিগুলো সীমিত সংখ্যক স্বার্থান্বেষীর পক্ষে সাজানো হয়েছে।”

তিনি ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে চুক্তির সমালোচনা করে বলেন, “আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র ভারতের ঝাড়খণ্ডে, কিন্তু চুক্তির সব ঝুঁকির দায় বাংলাদেশের ওপর চাপানো হয়েছে। এছাড়া গ্যাস সংকট থাকা সত্ত্বেও সামিট গ্রুপকে একই জায়গায় একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত অযৌক্তিক।”

জাতীয় কমিটির সুপারিশসমূহ: বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত এই ৫ সদস্যের কমিটি তাদের প্রতিবেদনে বেশ কিছু কঠোর সুপারিশ করেছে:

  • আদানি চুক্তি বাতিল: আদানির সঙ্গে করা চুক্তিকে বাংলাদেশের জন্য ‘সবচেয়ে খারাপ’ চুক্তি হিসেবে অভিহিত করে তা বাতিলের জন্য সিঙ্গাপুরের আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে (Arbitration Tribunal) যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
  • অন্যান্য চুক্তি পুনঃপর্যালোচনা: বিশেষ আইনের আওতায় হওয়া অন্যান্য বড় চুক্তির মাধ্যমে যে ‘আর্থিক রক্তক্ষরণ’ হচ্ছে, তা বন্ধে পুনরায় পর্যালোচনার উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।
  • আইনগত ব্যবস্থা: দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ৭-৮ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রতিবেদনটি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়েছে।

কমিটি মনে করে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ফুরিয়ে আসায় বর্তমান প্রশাসনের পক্ষে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়তো সম্ভব হবে না, তবে নির্বাচিত পরবর্তী সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় এই বিপুল লোকসানের বোঝা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘস্থায়ী সংকটে নিমজ্জিত করবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুঝুঁকি ও লিবিয়ার ‘গেম ঘরে’ বন্দি বাংলাদেশিরা

দেউলিয়ার পথে পিডিবি, আদানি চুক্তি বাতিলের সুপারিশ

আপডেট সময় : ০১:৩৮:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর অধীনে সম্পাদিত চুক্তিগুলো দেশের জাতীয় স্বার্থে নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে অন্যায্য সুবিধা দেওয়ার জন্য করা হয়েছিল। এর ফলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এখন দেউলিয়ার পথে এবং দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ খাত এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি। রোববার (২৫ জানুয়ারি) এই বিশেষ আইনের অধীনে সম্পাদিত চুক্তিসমূহ পর্যালোচনায় গঠিত জাতীয় কমিটির এক সংবাদ সম্মেলনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, ২০১৫ সালে পিডিবির বার্ষিক লোকসান ছিল ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালে এসে ১০ গুণ বেড়ে ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বর্তমানে পিডিবির প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনতে খরচ হচ্ছে ১২ টাকা ৩৫ পয়সা, অথচ তারা তা বিক্রি করছে মাত্র ৬ টাকা ৬৩ পয়সায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিডিবিকে টিকিয়ে রাখতে হলে বিদ্যুতের পাইকারি দাম অন্তত ৮৬ শতাংশ বাড়ানো প্রয়োজন, যা সাধারণ গ্রাহকের ওপর অসহনীয় চাপ তৈরি করবে।

‘রাষ্ট্র দখল’ ও অসম চুক্তির নেপথ্যে: কমিটির সদস্য ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “বিশেষ আইনের আড়ালে হওয়া চুক্তিগুলোর কারণে সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পে ৮০ শতাংশ, তেলে ৫০ শতাংশ এবং গ্যাসে ৪৫ শতাংশ বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে। এটি প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্র দখলের একটি রূপ, যেখানে লেনদেন-ভিত্তিক সম্পর্কের মাধ্যমে নীতিনির্ধারণ ও চুক্তিগুলো সীমিত সংখ্যক স্বার্থান্বেষীর পক্ষে সাজানো হয়েছে।”

তিনি ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে চুক্তির সমালোচনা করে বলেন, “আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র ভারতের ঝাড়খণ্ডে, কিন্তু চুক্তির সব ঝুঁকির দায় বাংলাদেশের ওপর চাপানো হয়েছে। এছাড়া গ্যাস সংকট থাকা সত্ত্বেও সামিট গ্রুপকে একই জায়গায় একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত অযৌক্তিক।”

জাতীয় কমিটির সুপারিশসমূহ: বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত এই ৫ সদস্যের কমিটি তাদের প্রতিবেদনে বেশ কিছু কঠোর সুপারিশ করেছে:

  • আদানি চুক্তি বাতিল: আদানির সঙ্গে করা চুক্তিকে বাংলাদেশের জন্য ‘সবচেয়ে খারাপ’ চুক্তি হিসেবে অভিহিত করে তা বাতিলের জন্য সিঙ্গাপুরের আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে (Arbitration Tribunal) যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
  • অন্যান্য চুক্তি পুনঃপর্যালোচনা: বিশেষ আইনের আওতায় হওয়া অন্যান্য বড় চুক্তির মাধ্যমে যে ‘আর্থিক রক্তক্ষরণ’ হচ্ছে, তা বন্ধে পুনরায় পর্যালোচনার উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।
  • আইনগত ব্যবস্থা: দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ৭-৮ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রতিবেদনটি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়েছে।

কমিটি মনে করে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ফুরিয়ে আসায় বর্তমান প্রশাসনের পক্ষে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়তো সম্ভব হবে না, তবে নির্বাচিত পরবর্তী সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় এই বিপুল লোকসানের বোঝা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘস্থায়ী সংকটে নিমজ্জিত করবে।