মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় সাক্ষ্য দিতে এসে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান বীর প্রতীক নিজের গুম হওয়ার এক শ্বাসরুদ্ধকর আখ্যান তুলে ধরেছেন। ২০১৮ সালের ৮ আগস্ট এক রহস্যময় পরিস্থিতিতে তিনি অপহৃত হন এবং দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর পর ২০২০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পান। এই সময়কালে তিনি কোথায় ছিলেন, কীভাবে তাকে নির্যাতন করা হতো এবং কেন তাকে গুম করা হয়েছিল, সেই লোমহর্ষক ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেছেন।
হাসিনুর রহমানের ভাষ্যমতে, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় তার বন্ধু লেফটেন্যান্ট কর্নেল যায়িদ আব্দুল্লাহ তাকে বাইরে ঘুরতে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। প্রায় দুই ঘণ্টা ঘোরার পর তারা মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার মেজর মহসিনের বাসায় যান। রাত প্রায় ১০টার দিকে সেখান থেকে বের হওয়ার সময় তারা রাস্তায় অস্বাভাবিক সংখ্যক ৮-১০ জন লোকের উপস্থিতি লক্ষ্য করেন। এই অচেনা ব্যক্তিদের দিকে তারা এগোতে থাকলে হাসিনুর রহমান বুঝতে পারেন যে তার বন্ধু যায়িদ আব্দুল্লাহ সেখানে নেই। এই পরিস্থিতিতে তিনি তার শ্যালিকার বাসার কেয়ারটেকার সেকান্দারকে ডেকে আনেন। নিজের লাইসেন্স করা অস্ত্র দেখিয়ে আগন্তুকদের হাত উঁচু করতে এবং এক জায়গায় জড়ো হতে নির্দেশ দেন তিনি।
ঠিক তখনই চারটি মাইক্রোবাসে করে আরও লোক এসে হাজির হয়। হাসিনুর রহমানের শ্যালিকার বাসার অপর কেয়ারটেকার মুক্তারকে ‘শক বাটন’ দিয়ে আঘাত করে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়া হয়। এরপর কয়েকজন ব্যক্তি হাসিনুর রহমানের কোমরে আঘাত করে এবং পাঁচ-সাতজন মিলে তাকে জাপটে ধরে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) জোরপূর্বক অপহরণ ও গুম করে নির্যাতনের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় হাসিনুর রহমান দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিচ্ছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১২ জন সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এই মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ তার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়।
দীর্ঘ ১ বছর ৬ মাস ১৪ দিন গুম থাকার পর মুক্তি পাওয়া হাসিনুর রহমান জানান, তাকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় জানতে চাওয়া হতো কেন তিনি সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে লেখালেখি করেন এবং কেন তিনি ২০১৪ সালের নির্বাচন, আওয়ামী লীগ ও ভারতের বিরুদ্ধে নেতিবাচক মন্তব্য করেন। এই প্রসঙ্গে তাকে মেরে লাশ গুম করে দেওয়ারও হুমকি দেওয়া হতো বলে তিনি ট্রাইব্যুনালে জানান।
তার গুমের পেছনে তার বন্ধু লেফটেন্যান্ট কর্নেল যায়িদ আব্দুল্লাহ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজহার এবং ডিজিএফআই ও র্যাবের কর্মকর্তারা জড়িত ছিলেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জবানবন্দিতে হাসিনুর রহমান আরও বলেন, তাকে মাইক্রোবাসে তোলার পর হ্যান্ডকাফ পরানো হয়, চোখে পট্টি বেঁধে দেওয়া হয় এবং মাথায় টুপি পরিয়ে তার ওপর কালো কাপড় পেঁচিয়ে ফিতা দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়। প্রায় ২০-২৫ মিনিট গাড়ি চলার পর তা থামে এবং গেট খোলার শব্দ শোনা যায়। এরপর তাকে অকথ্য মারধর করে অন্য পক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়, যার ফলে তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়েন। তারা তাকে একটি রুমে নিয়ে যায় এবং হ্যান্ডকাফসহ চোখের বাঁধন খুলে দেয়। সেই রুমে তিনি মুখোশ পরা অবস্থায় বেশ কিছু ব্যক্তিকে দেখতে পান। তারা তাকে রুমে রেখে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে চলে যায়।
রিপোর্টারের নাম 

























