বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও দলীয় কার্যক্রমের ওপর জারি থাকা নিষেধাজ্ঞার খড়্গ সরছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ’টি গত বুধবার (৮ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিল হিসেবে পাস হয়েছে। এর মাধ্যমে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের যাবতীয় প্রকাশনা, জনসভা, মিছিল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণার ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকল। তবে আইনজ্ঞরা মনে করছেন, এই আইনি লড়াইয়ের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে পারে কেবল উচ্চ আদালতের মাধ্যমে।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং এর শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির সকল কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছিল ২০২৫ সালের ১১ মে একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে। সংসদ কার্যকর হওয়ার পর সেই অধ্যাদেশের বিষয়বস্তু অপরিবর্তিত রেখে নতুন বিলে সংসদ সদস্যরা অনুমোদন দিয়েছেন। এই আইন অনুযায়ী, সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত কোনো সত্তাকে সরকার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করতে পারবে এবং ওই সত্তার সমর্থনে কোনো সভা-সমাবেশ বা সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধের এই আইনি লড়াই এখন রাজপথ ছেড়ে আদালতের এজলাসে গড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মামুন মাহবুব জানান, দল হিসেবে নয় বরং আওয়ামী লীগের ‘কার্যক্রম’ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে দলটির সামনে আইনি পথ হলো উচ্চ আদালতে রিট করা। তিনি আরও মনে করেন, যেহেতু দেশের একটি বড় অংশ এই দলটির সমর্থক, তাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বার্থে সরকার এই সিদ্ধান্ত রিভিউ বা পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
অন্যদিকে মানবাধিকারকর্মী ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ এই নিষেধাজ্ঞার সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিককে সংগঠন করার মৌলিক অধিকার দেওয়া হয়েছে। আইন করে এভাবে কোনো প্রাচীন রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ রাখা সংবিধান পরিপন্থী হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন যে, একমাত্র রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক কাজের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কোনো সংগঠনকে এভাবে নিষিদ্ধ করা যায় না এবং আদালত মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নে এই আইনটি বাতিলের ক্ষমতা রাখে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার বিশেষ প্রেক্ষাপটে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত এখন সংসদীয় আইনে রূপ নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। একদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া, অন্যদিকে সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন পুরোপুরি আদালতের রায়ের ওপর নির্ভর করছে। উচ্চ আদালত যদি এই আইনকে মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী মনে করেন, তবেই কেবল আওয়ামী লীগ পুনরায় প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফেরার সুযোগ পেতে পারে।
রিপোর্টারের নাম 
























