ঢাকা ০৬:৫৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আ. লীগ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে সমালোচনার জেরে গুম-নির্যাতন: বীরপ্রতীক হাসিনুর রহমানের জবানবন্দি

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) হাসিনুর রহমান। রোববার দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি অভিযোগ করেছেন, আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে তাকে দুই দফা গুম করে ডিজিএফআইয়ের ‘আয়নাঘরে’ নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। তাকে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে নেতিবাচক লেখালেখি এবং ২০১৪ সালের নির্বাচন ও তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণেই তাকে গুম করা হয়েছে।

জবানবন্দিতে হাসিনুর রহমান বলেন, ২০১১ সালের ৯ জুলাই তাকে প্রথমবার গুম করা হয়। তখন তিনি ময়মনসিংহ সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন। ঢাকা থেকে কর্নেল হামিদ তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে অফিসার্স মেসে আনেন। এরপর ডিজিএফআইয়ের ইন্টারোগেশন সেলে চোখ ও হাত বেঁধে ৪৩ দিন ফেলে রাখা হয়। এ সময়ে তার পরিবারকে কিছু জানানো হয়নি। তার বিরুদ্ধে হরকাতুল জিহাদ (হুজি) সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের মিথ্যা অভিযোগ এনে কোর্টমার্শাল করে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে সেনাপ্রধান পরিবর্তনের পর ইকবাল করিম ভূঁইয়ার নির্দেশে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।

তিনি আরও জানান, ২০১৮ সালের ৮ আগস্ট তাকে দ্বিতীয়বারের মতো গুম করে ‘আয়নাঘরে’ রাখা হয়। ১০ বাই ৮ ফুটের স্যাঁতসেঁতে ও রক্তাক্ত একটি কক্ষে উচ্চ ভোল্টেজের আলো জ্বালিয়ে রাখা হতো, যেখানে প্রচণ্ড গরমে তিনি হাঁসফাঁস করতেন। কক্ষটিতে একটি চৌকির ওপর নোংরা ও রক্তাক্ত চাদর বিছানো ছিল এবং দেয়ালে রক্ত দিয়ে ফোন নম্বর লেখা ছিল। সেখানে একজন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং তার ফেসবুক আইডি ও সেনাপ্রধান আজিজের বিরুদ্ধে লেখালেখি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

হাসিনুর রহমান অভিযোগ করেন, ওই কর্মকর্তা তাকে মেরে ফেলাসহ লাশ গুমের হুমকি দেন। তাকে জানানো হয়, শেখ হাসিনার নির্দেশে তাকে গুম করা হয়েছে এবং কথা না শুনলে ‘গায়েব’ করে ফেলা হবে। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তাকে মারধর ও ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয়। নির্যাতনের ফলে তিনি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন এবং কয়েকদিন অস্বাভাবিক আচরণ করেন।

তার আটকের কারণ জানতে চেয়ে তিনি অনশন শুরু করেন। অনশনের সপ্তম দিনে তার অবস্থার অবনতি হলে আবার তাকে হাত, পা ও চোখ বেঁধে ওই কর্মকর্তার সামনে নেওয়া হয়। তখন তাকে জানানো হয়, তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত কোনো অভিযোগ নেই, তবে নির্বাচনের আগে তাকে ছাড়া হবে না। তার অনেক ফলোয়ার এবং অনেক অফিসার তার অনুগত হওয়ায় তাকে সরকারের জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। সেখান থেকে তাকে আবার কক্ষে ফিরিয়ে আনার পথেও নির্যাতন করা হয়।

বন্দিদশায় অমানবিক পরিবেশে নোংরা কাপড় দিয়ে চোখ বাঁধার কারণে তার দু’চোখে ইনফেকশন হয়ে যায়। মানসিক চাপ ও শারীরিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে একপর্যায়ে তার হার্ট অ্যাটাক হয়। বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত একজন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে সাধারণ সৈনিক দ্বারা এমন অমানবিক ও লজ্জাজনক আচরণ তিনি মেনে নিতে পারেননি বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন। তার স্ত্রী ক্যান্সারে আক্রান্ত এবং তিন কন্যা সন্তান থাকায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।

তিনি জানান, তাকে যে কমপ্লেক্সে রাখা হয়েছিল সেখানে বড় দুটি অ্যাডজাস্ট ফ্যান লাগানো ছিল, যাতে ভেতরের কান্নার শব্দ ও চিৎকার বাইরে না যায়। সেখানে মোট ১০টি কক্ষ ছিল এবং প্রতিটি কক্ষ থেকেই চিৎকার ও কান্নার আওয়াজ শোনা যেত। প্রহরীদের পায়ের আওয়াজ শুনলে বন্দিরা আতঙ্কিত হয়ে পড়তেন। কখনো কখনো বন্দিদেরকে হত্যা করার জন্য র‍্যাবের নিকট হস্তান্তর করা হতো বলেও তিনি দাবি করেন। প্রহরীরা তাদের সবসময় আতঙ্কের মধ্যে রাখত এবং বলত, কথা না শুনলে ‘ক্রসফায়ার’ হয়ে যাবেন। প্রায় সময় পার্শ্ববর্তী কক্ষগুলো খালি হয়ে যেত এবং নতুন বন্দি আনা হতো। প্রহরীরা বলতো, যাদেরকে নেওয়া হয়েছে, তাদেরকে ‘ক্রসফায়ারের’ জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

২০১৮ সালের কোনো একদিন সকালে বাথরুমে গেলে তিনি ব্রিগেডিয়ার আজমিকে দেখতে পান। বিষয়টি জানাজানি হলে তাকে অন্য একটি কক্ষে স্থানান্তর করা হয়। পরে সিসি ক্যামেরা নষ্ট হলে মেরামত করার সময় তাকে ব্রিগেডিয়ার আজমির কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। ওই কমপ্লেক্সের নিচতলার উচ্চতা ও গঠন দেখে তিনি বুঝতে পারেন, এটি তার পরিচিত এলাকা এবং এটি সেনানিবাসের ভেতরে অবস্থিত। তিনি ১৯৯০ সালে ঢাকা আর্মি এমপি ইউনিটের অপারেশন অফিসার হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন এবং সেনানিবাসের সকল এলাকা তার পরিচিত ছিল।

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারির একদিন ভোর ৪টার দিকে বাথরুমে গেলে তিনি একটি হোল দিয়ে কালো পোশাকধারী র‍্যাবের একজন সদস্যকে দেখতে পান। তার ধারণা, ওই র‍্যাব সদস্য হয়তো নতুন কাউকে আনতে অথবা ‘আয়নাঘর’ থেকে কাউকে ‘ক্রসফায়ারের’ জন্য নিয়ে যেতে এসেছিলেন।

জবানবন্দি অসম্পূর্ণ থাকায় আদালত বাকি অংশের জন্য পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

উজিরপুরে অগ্নিকাণ্ডে ৫ পরিবারের স্বপ্ন ভস্ম, লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি

আ. লীগ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে সমালোচনার জেরে গুম-নির্যাতন: বীরপ্রতীক হাসিনুর রহমানের জবানবন্দি

আপডেট সময় : ১০:২৫:১৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) হাসিনুর রহমান। রোববার দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি অভিযোগ করেছেন, আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে তাকে দুই দফা গুম করে ডিজিএফআইয়ের ‘আয়নাঘরে’ নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। তাকে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে নেতিবাচক লেখালেখি এবং ২০১৪ সালের নির্বাচন ও তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণেই তাকে গুম করা হয়েছে।

জবানবন্দিতে হাসিনুর রহমান বলেন, ২০১১ সালের ৯ জুলাই তাকে প্রথমবার গুম করা হয়। তখন তিনি ময়মনসিংহ সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন। ঢাকা থেকে কর্নেল হামিদ তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে অফিসার্স মেসে আনেন। এরপর ডিজিএফআইয়ের ইন্টারোগেশন সেলে চোখ ও হাত বেঁধে ৪৩ দিন ফেলে রাখা হয়। এ সময়ে তার পরিবারকে কিছু জানানো হয়নি। তার বিরুদ্ধে হরকাতুল জিহাদ (হুজি) সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের মিথ্যা অভিযোগ এনে কোর্টমার্শাল করে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে সেনাপ্রধান পরিবর্তনের পর ইকবাল করিম ভূঁইয়ার নির্দেশে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।

তিনি আরও জানান, ২০১৮ সালের ৮ আগস্ট তাকে দ্বিতীয়বারের মতো গুম করে ‘আয়নাঘরে’ রাখা হয়। ১০ বাই ৮ ফুটের স্যাঁতসেঁতে ও রক্তাক্ত একটি কক্ষে উচ্চ ভোল্টেজের আলো জ্বালিয়ে রাখা হতো, যেখানে প্রচণ্ড গরমে তিনি হাঁসফাঁস করতেন। কক্ষটিতে একটি চৌকির ওপর নোংরা ও রক্তাক্ত চাদর বিছানো ছিল এবং দেয়ালে রক্ত দিয়ে ফোন নম্বর লেখা ছিল। সেখানে একজন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং তার ফেসবুক আইডি ও সেনাপ্রধান আজিজের বিরুদ্ধে লেখালেখি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

হাসিনুর রহমান অভিযোগ করেন, ওই কর্মকর্তা তাকে মেরে ফেলাসহ লাশ গুমের হুমকি দেন। তাকে জানানো হয়, শেখ হাসিনার নির্দেশে তাকে গুম করা হয়েছে এবং কথা না শুনলে ‘গায়েব’ করে ফেলা হবে। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তাকে মারধর ও ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয়। নির্যাতনের ফলে তিনি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন এবং কয়েকদিন অস্বাভাবিক আচরণ করেন।

তার আটকের কারণ জানতে চেয়ে তিনি অনশন শুরু করেন। অনশনের সপ্তম দিনে তার অবস্থার অবনতি হলে আবার তাকে হাত, পা ও চোখ বেঁধে ওই কর্মকর্তার সামনে নেওয়া হয়। তখন তাকে জানানো হয়, তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত কোনো অভিযোগ নেই, তবে নির্বাচনের আগে তাকে ছাড়া হবে না। তার অনেক ফলোয়ার এবং অনেক অফিসার তার অনুগত হওয়ায় তাকে সরকারের জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। সেখান থেকে তাকে আবার কক্ষে ফিরিয়ে আনার পথেও নির্যাতন করা হয়।

বন্দিদশায় অমানবিক পরিবেশে নোংরা কাপড় দিয়ে চোখ বাঁধার কারণে তার দু’চোখে ইনফেকশন হয়ে যায়। মানসিক চাপ ও শারীরিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে একপর্যায়ে তার হার্ট অ্যাটাক হয়। বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত একজন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে সাধারণ সৈনিক দ্বারা এমন অমানবিক ও লজ্জাজনক আচরণ তিনি মেনে নিতে পারেননি বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন। তার স্ত্রী ক্যান্সারে আক্রান্ত এবং তিন কন্যা সন্তান থাকায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।

তিনি জানান, তাকে যে কমপ্লেক্সে রাখা হয়েছিল সেখানে বড় দুটি অ্যাডজাস্ট ফ্যান লাগানো ছিল, যাতে ভেতরের কান্নার শব্দ ও চিৎকার বাইরে না যায়। সেখানে মোট ১০টি কক্ষ ছিল এবং প্রতিটি কক্ষ থেকেই চিৎকার ও কান্নার আওয়াজ শোনা যেত। প্রহরীদের পায়ের আওয়াজ শুনলে বন্দিরা আতঙ্কিত হয়ে পড়তেন। কখনো কখনো বন্দিদেরকে হত্যা করার জন্য র‍্যাবের নিকট হস্তান্তর করা হতো বলেও তিনি দাবি করেন। প্রহরীরা তাদের সবসময় আতঙ্কের মধ্যে রাখত এবং বলত, কথা না শুনলে ‘ক্রসফায়ার’ হয়ে যাবেন। প্রায় সময় পার্শ্ববর্তী কক্ষগুলো খালি হয়ে যেত এবং নতুন বন্দি আনা হতো। প্রহরীরা বলতো, যাদেরকে নেওয়া হয়েছে, তাদেরকে ‘ক্রসফায়ারের’ জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

২০১৮ সালের কোনো একদিন সকালে বাথরুমে গেলে তিনি ব্রিগেডিয়ার আজমিকে দেখতে পান। বিষয়টি জানাজানি হলে তাকে অন্য একটি কক্ষে স্থানান্তর করা হয়। পরে সিসি ক্যামেরা নষ্ট হলে মেরামত করার সময় তাকে ব্রিগেডিয়ার আজমির কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। ওই কমপ্লেক্সের নিচতলার উচ্চতা ও গঠন দেখে তিনি বুঝতে পারেন, এটি তার পরিচিত এলাকা এবং এটি সেনানিবাসের ভেতরে অবস্থিত। তিনি ১৯৯০ সালে ঢাকা আর্মি এমপি ইউনিটের অপারেশন অফিসার হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন এবং সেনানিবাসের সকল এলাকা তার পরিচিত ছিল।

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারির একদিন ভোর ৪টার দিকে বাথরুমে গেলে তিনি একটি হোল দিয়ে কালো পোশাকধারী র‍্যাবের একজন সদস্যকে দেখতে পান। তার ধারণা, ওই র‍্যাব সদস্য হয়তো নতুন কাউকে আনতে অথবা ‘আয়নাঘর’ থেকে কাউকে ‘ক্রসফায়ারের’ জন্য নিয়ে যেতে এসেছিলেন।

জবানবন্দি অসম্পূর্ণ থাকায় আদালত বাকি অংশের জন্য পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন।