ঢাকা ১২:১৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ভেন্যু বিতর্ক: আত্মমর্যাদা নিয়ে আপস নয়, অভিজ্ঞ সংগঠকের মন্তব্যে প্রশ্ন

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:০৪:২০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ভেন্যু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্কে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে প্রবীণ সংগঠক সৈয়দ আশরাফুল হকের সাম্প্রতিক মন্তব্যে ক্রীড়াঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একসময় তুখোড় সংগঠক হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তিত্বের মন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে, যেখানে দেশের আত্মসম্মান ও খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার বিষয়টি মুখ্য হয়ে উঠেছে। তার বক্তব্যকে বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন এবং দেশের ক্রীড়া নীতির পরিপন্থী হিসেবেও দেখছেন কেউ কেউ।

ভারতভিত্তিক একটি ক্রিকেট ওয়েবসাইটে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সৈয়দ আশরাফুল হক মন্তব্য করেন যে, যেকোনো আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন ক্রিকেট বোর্ডের উচিত ছিল আইসিসির নিরাপত্তা পরিকল্পনা খেলোয়াড়দের সামনে তুলে ধরা এবং তাদের সিদ্ধান্ত নিতে বলা। তিনি আরও যোগ করেন, একটি ‘প্রশ্নবিদ্ধ এজেন্ডা’ বাস্তবায়নের জন্য খেলোয়াড়দের বিশ্বকাপ খেলার আজন্ম স্বপ্ন থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। তার এমন মন্তব্যের পর দেশের ক্রিকেট মহলে বিস্ময় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, একটি বিশ্বকাপ না খেললে বাংলাদেশের ক্রিকেট কি সত্যিই ধ্বংস হয়ে যাবে? আর্থিক ক্ষতি বা র‍্যাংকিংয়ে সাময়িক অবনতি হলেও দেশের সম্মান ও নাগরিকদের নিরাপত্তা কি তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়?

উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়, দুবারের ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায়নি। একইভাবে, চারবারের বিশ্বকাপ ফুটবল চ্যাম্পিয়ন ইতালিও শেষ দুটি বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ হারায়। এতে তাদের ক্রিকেট বা ফুটবল ধ্বংস হয়ে যায়নি, বরং নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রেরণা পেয়েছে। সুতরাং, একটি টুর্নামেন্টে অংশ না নেওয়া মানেই ক্রিকেটের বিনাশ নয়।

খেলোয়াড়দের সিদ্ধান্ত নেওয়ার যে তত্ত্ব সৈয়দ আশরাফুল হক তুলে ধরেছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একজন ক্রিকেটার ২২ গজের বিশেষজ্ঞ হলেও, তিনি সীমান্ত নিরাপত্তা, গোয়েন্দা প্রতিবেদন বা ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক নন। পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশে যুদ্ধাবস্থা বা চরম বৈরী পরিবেশে খেলতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত রাষ্ট্র বা বোর্ডের বদলে খেলোয়াড়রা নেয়, এমন নজির নেই। ভারত যখন নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে পাকিস্তানে এশিয়া কাপ বা চ্যাম্পিয়নস ট্রফি খেলতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন সেই সিদ্ধান্ত বিরাট কোহলি বা রোহিত শর্মাদের ভোটে নেওয়া হয় না, বরং তা ভারত সরকারের কঠোর সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। তখন এ ধরনের পদক্ষেপকে ‘জাতীয় স্বার্থ’ হিসেবে দেখা হলেও, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ‘এজেন্ডা’ বলাটা দ্বিমুখী আচরণ হিসেবেই গণ্য হচ্ছে।

‘প্রশ্নবিদ্ধ এজেন্ডা’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের মাটিতে বাংলাদেশি সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা কোনো গুজব নয়, বরং প্রতিষ্ঠিত সত্য। এমনকি ভারতের গণমাধ্যমও পশ্চিমবঙ্গে জন্ম নেওয়া এক মুসলিমকে বাংলাদেশি সন্দেহে পিটিয়ে মারার খবর প্রকাশ করেছে। শিবসেনা নেতারা প্রকাশ্যেই মুম্বাইয়ে খেলা হতে না দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের খেলোয়াড়, সমর্থক ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা কোথায়?

সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে মোস্তাফিজুর রহমানের ঘটনা। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) নিজেই যখন আইপিএলের একটি ফ্র্যাঞ্চাইজিকে (কেকেআর) মোস্তাফিজকে স্কোয়াড থেকে বাদ দিতে নির্দেশ দেয়, কারণ তারা উগ্রবাদীদের হুমকির মুখে মোস্তাফিজুরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছিল না, তখন বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে পুরো দলের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টে একজন খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা দিতে যারা ব্যর্থ, তারা বিশ্বকাপের মতো আসরে পুরো বহরের নিরাপত্তা দেবে—এই আশ্বাস হাস্যকর মনে হচ্ছে।

অনেকে যুক্তি দেখাচ্ছেন, আইসিসির স্বাধীন নিরাপত্তা দল নাকি ঝুঁকি দেখেনি। তবে এই তথাকথিত ‘স্বাধীন’ অ্যাসেসমেন্টের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। যদি ঝুঁকি না-ই থাকবে, তবে মোস্তাফিজকে কেন সরানো হলো? এই প্রশ্নের উত্তর আইসিসি বা বিসিসিআই কেউ দিতে পারেনি। কারণ উত্তর দিতে গেলে তাদের স্বীকার করতে হবে যে, সেখানে বাংলাদেশিদের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব চরমে।

বিশ্বকাপের ভেন্যু বদলের যে যৌক্তিক দাবি বাংলাদেশ তুলেছিল, তা পাশ কাটিয়ে লজিস্টিকস এবং টিকিট বিক্রির বিষয়কে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। মানুষের জীবনের ঝুঁকির চেয়ে হোটেল বুকিং বা ব্রডকাস্টিং শিডিউল বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। ১৯৪ পৃষ্ঠার নিরাপত্তা পরিকল্পনায় যদি খেলোয়াড়দের জীবনের গ্যারান্টি না থাকে, তবে সেই পরিকল্পনার মূল্য কাগজের টুকরোর চেয়ে বেশি কিছু নয়।

সৈয়দ আশরাফুল হক এবং তার মতো যারা মনে করছেন যে, বয়কট করলে খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে, তাদের জন্য পাল্টা প্রশ্ন—যদি খেলতে গিয়ে কোনো খেলোয়াড় শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হন, বা তার চেয়েও খারাপ কিছু ঘটে, তার দায়ভার কি তারা নেবেন? ২০০৯ সালে লাহোরে শ্রীলঙ্কা দলের ওপর হামলার পর বিশ্ব ক্রিকেট বুঝেছে যে, নিরাপত্তা শঙ্কাকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। খেলোয়াড়দের ‘লাইফটাইম অ্যামবিশন’ বা বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্নের চেয়ে তাদের জীবন এবং আত্মসম্মান অনেক বেশি মূল্যবান।

বাংলাদেশ বিশ্বকাপ বয়কটের কথা বলেনি, কেবল ভেন্যু বদলানোর দাবি জানিয়েছে। এই দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক এবং মানবিক। শ্রীলঙ্কায় খেলা হলে সমস্যা কোথায়? তারা তো সহ-আয়োজক। অতীতেও নিরাপত্তার কারণে শেষ মুহূর্তে ভেন্যু বদলানোর বহু নজির ক্রিকেট বিশ্বে আছে। নিউজিল্যান্ড যখন নিরাপত্তার অজুহাতে পাকিস্তান সফর বাতিল করে, তখন সেটা হয় ‘পেশাদার সিদ্ধান্ত’। ইংল্যান্ড যখন সফর বাতিল করে, তখন সেটা হয় ‘নিরাপত্তা প্রটোকল’। আর বাংলাদেশ যখন নিজ নাগরিকদের পিটিয়ে মারার দৃশ্য দেখে ভারতে যেতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন সেটাকে ‘আবেগ’ বা ‘রাজনীতি’ বলাটা ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছু নয়।

১৪-২ ভোটে হেরে যাওয়া হয়তো আমাদের কূটনৈতিক দুর্বলতা, কিন্তু নৈতিকতার ভোটে বাংলাদেশ হারেনি। বাংলাদেশ একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আমরা জানিয়ে দিয়েছি, আইসিসির টাকার বস্তা বা ভারতের প্রভাব-প্রতিপত্তি আমাদের আত্মসম্মান কিনে নিতে পারে না। আমাদের খেলোয়াড়দের জীবনের মূল্য অন্য যেকোনো দেশের খেলোয়াড়দের চেয়ে কম নয়।

আইসিসিকে বুঝতে হবে, তারা কোনো নির্দিষ্ট দেশের ক্রিকেট কাউন্সিল নয়, তারা ‘ইন্টারন্যাশনাল’ ক্রিকেট কাউন্সিল। তাদের নিরপেক্ষতা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। যদি তারা সত্যিই নিরপেক্ষ হতো, তবে ভারত ও পাকিস্তানের জন্য যে ‘হাইব্রিড মডেল’ বা ‘নিউট্রাল ভেন্যু’র ব্যবস্থা করা হয়, বাংলাদেশের প্রকৃত নিরাপত্তা ঝুঁকির ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা করা হতো। এই বিশ্বকাপ ভারতের মাটিতে নয়, শ্রীলঙ্কায় খেলার বাংলাদেশের দাবিটা ছিল ন্যায্য। এটি কোনো বিলাসিতা নয়, এটি অস্তিত্ব ও আত্মসম্মানের প্রশ্ন। এই প্রশ্নে আপস করা মানে হলো ভবিষ্যতে যেকোনো অপমান মেনে নেওয়ার লাইসেন্স দিয়ে দেওয়া। ক্রিকেট অবশ্যই আবেগের জায়গা, কিন্তু তা কখনোই জীবন এবং সম্মানের ঊর্ধ্বে নয়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কাতারের আকাশসীমায় ইরানের আগ্রাসন প্রতিহত: দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ভেন্যু বিতর্ক: আত্মমর্যাদা নিয়ে আপস নয়, অভিজ্ঞ সংগঠকের মন্তব্যে প্রশ্ন

আপডেট সময় : ০৯:০৪:২০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬

আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ভেন্যু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্কে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে প্রবীণ সংগঠক সৈয়দ আশরাফুল হকের সাম্প্রতিক মন্তব্যে ক্রীড়াঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একসময় তুখোড় সংগঠক হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তিত্বের মন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে, যেখানে দেশের আত্মসম্মান ও খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার বিষয়টি মুখ্য হয়ে উঠেছে। তার বক্তব্যকে বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন এবং দেশের ক্রীড়া নীতির পরিপন্থী হিসেবেও দেখছেন কেউ কেউ।

ভারতভিত্তিক একটি ক্রিকেট ওয়েবসাইটে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সৈয়দ আশরাফুল হক মন্তব্য করেন যে, যেকোনো আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন ক্রিকেট বোর্ডের উচিত ছিল আইসিসির নিরাপত্তা পরিকল্পনা খেলোয়াড়দের সামনে তুলে ধরা এবং তাদের সিদ্ধান্ত নিতে বলা। তিনি আরও যোগ করেন, একটি ‘প্রশ্নবিদ্ধ এজেন্ডা’ বাস্তবায়নের জন্য খেলোয়াড়দের বিশ্বকাপ খেলার আজন্ম স্বপ্ন থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। তার এমন মন্তব্যের পর দেশের ক্রিকেট মহলে বিস্ময় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, একটি বিশ্বকাপ না খেললে বাংলাদেশের ক্রিকেট কি সত্যিই ধ্বংস হয়ে যাবে? আর্থিক ক্ষতি বা র‍্যাংকিংয়ে সাময়িক অবনতি হলেও দেশের সম্মান ও নাগরিকদের নিরাপত্তা কি তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়?

উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়, দুবারের ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায়নি। একইভাবে, চারবারের বিশ্বকাপ ফুটবল চ্যাম্পিয়ন ইতালিও শেষ দুটি বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ হারায়। এতে তাদের ক্রিকেট বা ফুটবল ধ্বংস হয়ে যায়নি, বরং নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রেরণা পেয়েছে। সুতরাং, একটি টুর্নামেন্টে অংশ না নেওয়া মানেই ক্রিকেটের বিনাশ নয়।

খেলোয়াড়দের সিদ্ধান্ত নেওয়ার যে তত্ত্ব সৈয়দ আশরাফুল হক তুলে ধরেছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একজন ক্রিকেটার ২২ গজের বিশেষজ্ঞ হলেও, তিনি সীমান্ত নিরাপত্তা, গোয়েন্দা প্রতিবেদন বা ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক নন। পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশে যুদ্ধাবস্থা বা চরম বৈরী পরিবেশে খেলতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত রাষ্ট্র বা বোর্ডের বদলে খেলোয়াড়রা নেয়, এমন নজির নেই। ভারত যখন নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে পাকিস্তানে এশিয়া কাপ বা চ্যাম্পিয়নস ট্রফি খেলতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন সেই সিদ্ধান্ত বিরাট কোহলি বা রোহিত শর্মাদের ভোটে নেওয়া হয় না, বরং তা ভারত সরকারের কঠোর সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। তখন এ ধরনের পদক্ষেপকে ‘জাতীয় স্বার্থ’ হিসেবে দেখা হলেও, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ‘এজেন্ডা’ বলাটা দ্বিমুখী আচরণ হিসেবেই গণ্য হচ্ছে।

‘প্রশ্নবিদ্ধ এজেন্ডা’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের মাটিতে বাংলাদেশি সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা কোনো গুজব নয়, বরং প্রতিষ্ঠিত সত্য। এমনকি ভারতের গণমাধ্যমও পশ্চিমবঙ্গে জন্ম নেওয়া এক মুসলিমকে বাংলাদেশি সন্দেহে পিটিয়ে মারার খবর প্রকাশ করেছে। শিবসেনা নেতারা প্রকাশ্যেই মুম্বাইয়ে খেলা হতে না দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের খেলোয়াড়, সমর্থক ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা কোথায়?

সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে মোস্তাফিজুর রহমানের ঘটনা। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) নিজেই যখন আইপিএলের একটি ফ্র্যাঞ্চাইজিকে (কেকেআর) মোস্তাফিজকে স্কোয়াড থেকে বাদ দিতে নির্দেশ দেয়, কারণ তারা উগ্রবাদীদের হুমকির মুখে মোস্তাফিজুরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছিল না, তখন বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে পুরো দলের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টে একজন খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা দিতে যারা ব্যর্থ, তারা বিশ্বকাপের মতো আসরে পুরো বহরের নিরাপত্তা দেবে—এই আশ্বাস হাস্যকর মনে হচ্ছে।

অনেকে যুক্তি দেখাচ্ছেন, আইসিসির স্বাধীন নিরাপত্তা দল নাকি ঝুঁকি দেখেনি। তবে এই তথাকথিত ‘স্বাধীন’ অ্যাসেসমেন্টের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। যদি ঝুঁকি না-ই থাকবে, তবে মোস্তাফিজকে কেন সরানো হলো? এই প্রশ্নের উত্তর আইসিসি বা বিসিসিআই কেউ দিতে পারেনি। কারণ উত্তর দিতে গেলে তাদের স্বীকার করতে হবে যে, সেখানে বাংলাদেশিদের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব চরমে।

বিশ্বকাপের ভেন্যু বদলের যে যৌক্তিক দাবি বাংলাদেশ তুলেছিল, তা পাশ কাটিয়ে লজিস্টিকস এবং টিকিট বিক্রির বিষয়কে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। মানুষের জীবনের ঝুঁকির চেয়ে হোটেল বুকিং বা ব্রডকাস্টিং শিডিউল বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। ১৯৪ পৃষ্ঠার নিরাপত্তা পরিকল্পনায় যদি খেলোয়াড়দের জীবনের গ্যারান্টি না থাকে, তবে সেই পরিকল্পনার মূল্য কাগজের টুকরোর চেয়ে বেশি কিছু নয়।

সৈয়দ আশরাফুল হক এবং তার মতো যারা মনে করছেন যে, বয়কট করলে খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে, তাদের জন্য পাল্টা প্রশ্ন—যদি খেলতে গিয়ে কোনো খেলোয়াড় শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হন, বা তার চেয়েও খারাপ কিছু ঘটে, তার দায়ভার কি তারা নেবেন? ২০০৯ সালে লাহোরে শ্রীলঙ্কা দলের ওপর হামলার পর বিশ্ব ক্রিকেট বুঝেছে যে, নিরাপত্তা শঙ্কাকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। খেলোয়াড়দের ‘লাইফটাইম অ্যামবিশন’ বা বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্নের চেয়ে তাদের জীবন এবং আত্মসম্মান অনেক বেশি মূল্যবান।

বাংলাদেশ বিশ্বকাপ বয়কটের কথা বলেনি, কেবল ভেন্যু বদলানোর দাবি জানিয়েছে। এই দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক এবং মানবিক। শ্রীলঙ্কায় খেলা হলে সমস্যা কোথায়? তারা তো সহ-আয়োজক। অতীতেও নিরাপত্তার কারণে শেষ মুহূর্তে ভেন্যু বদলানোর বহু নজির ক্রিকেট বিশ্বে আছে। নিউজিল্যান্ড যখন নিরাপত্তার অজুহাতে পাকিস্তান সফর বাতিল করে, তখন সেটা হয় ‘পেশাদার সিদ্ধান্ত’। ইংল্যান্ড যখন সফর বাতিল করে, তখন সেটা হয় ‘নিরাপত্তা প্রটোকল’। আর বাংলাদেশ যখন নিজ নাগরিকদের পিটিয়ে মারার দৃশ্য দেখে ভারতে যেতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন সেটাকে ‘আবেগ’ বা ‘রাজনীতি’ বলাটা ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছু নয়।

১৪-২ ভোটে হেরে যাওয়া হয়তো আমাদের কূটনৈতিক দুর্বলতা, কিন্তু নৈতিকতার ভোটে বাংলাদেশ হারেনি। বাংলাদেশ একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আমরা জানিয়ে দিয়েছি, আইসিসির টাকার বস্তা বা ভারতের প্রভাব-প্রতিপত্তি আমাদের আত্মসম্মান কিনে নিতে পারে না। আমাদের খেলোয়াড়দের জীবনের মূল্য অন্য যেকোনো দেশের খেলোয়াড়দের চেয়ে কম নয়।

আইসিসিকে বুঝতে হবে, তারা কোনো নির্দিষ্ট দেশের ক্রিকেট কাউন্সিল নয়, তারা ‘ইন্টারন্যাশনাল’ ক্রিকেট কাউন্সিল। তাদের নিরপেক্ষতা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। যদি তারা সত্যিই নিরপেক্ষ হতো, তবে ভারত ও পাকিস্তানের জন্য যে ‘হাইব্রিড মডেল’ বা ‘নিউট্রাল ভেন্যু’র ব্যবস্থা করা হয়, বাংলাদেশের প্রকৃত নিরাপত্তা ঝুঁকির ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা করা হতো। এই বিশ্বকাপ ভারতের মাটিতে নয়, শ্রীলঙ্কায় খেলার বাংলাদেশের দাবিটা ছিল ন্যায্য। এটি কোনো বিলাসিতা নয়, এটি অস্তিত্ব ও আত্মসম্মানের প্রশ্ন। এই প্রশ্নে আপস করা মানে হলো ভবিষ্যতে যেকোনো অপমান মেনে নেওয়ার লাইসেন্স দিয়ে দেওয়া। ক্রিকেট অবশ্যই আবেগের জায়গা, কিন্তু তা কখনোই জীবন এবং সম্মানের ঊর্ধ্বে নয়।