ঢাকা ০৬:৫৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

কোটালীপাড়া বোমা মামলা: বিচারিক প্রক্রিয়া ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আলেমদের দীর্ঘ কারাবাস

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৩০:৫৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় ২০০০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভাস্থলের কাছে বোমা উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বেশ কয়েকজন আলেম বছরের পর বছর ধরে কারাবন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া এবং আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে শুরু থেকেই নানা বিতর্ক ও প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় থাকা আলেমদের মধ্যে রয়েছেন মুফতি শফিকুর রহমান, মাওলানা আমিরুল ইসলাম, মুফতি আবদুল হাই, মাওলানা শেখ ফরিদ, মাওলানা আবু বকর, মাওলানা আব্দুর রউফ ও মাওলানা জাহাঙ্গীর আলম। উল্লেখ্য, বিচার চলাকালীন সময়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মাওলানা ইয়াহ ইয়া কারাগারে নির্যাতনে মারা যান বলে অভিযোগ রয়েছে।

চাঞ্চল্যকর এই মামলার প্রথম চার্জশিটে ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছিল, যেখানে বর্তমান মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আলেমদের নাম ছিল না। সিআইডির তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার মুন্সি আতিকুর রহমান এই চার্জশিট দাখিল করেন। তবে ২০০৯ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম তখনকার প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক বিরোধিতার অভিযোগে বেশ কিছু আলেমকে এই মামলায় অন্তর্ভুক্ত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে, ২০১৭ সালে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারপতি মমতাজ বেগম এই আলেমদের ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার রায় দেন। এরপর ২০২১ সালে হাইকোর্টের বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও মোহাম্মদ বদরুজ্জামান নিম্ন আদালতের সেই রায় বহাল রাখেন।

মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এই আলেমদের মৃত্যুদণ্ড মূলত অন্য একটি মামলার আসামি মুফতি হান্নানের দেওয়া জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছে। যদিও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে উচ্চ আদালত মুফতি হান্নানের জবানবন্দিগুলোকে ‘আইনের চোখে অবিশ্বাসযোগ্য’ ঘোষণা করে বাতিল করেছিল। আদালত সেসময় উল্লেখ করে, জবানবন্দিগুলো নিয়মবহির্ভূতভাবে এবং অমানবিক নির্যাতনের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছিল। মুফতি হান্নানের সেই জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে শফিকুর রহমান, আব্দুল হাই, শেখ ফরিদ, আবু তাহের, ইয়াহিয়া, আব্দুর রউফসহ অনেক আলেমকে ২১ আগস্টের মামলাতেও আসামি করা হয়েছিল, কিন্তু সম্প্রতি উচ্চ আদালত তাদের নির্দোষ ঘোষণা করে খালাস দিয়েছেন।

কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলায় এসব আলেমদের বিরুদ্ধে কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অথবা সমর্থনমূলক সাক্ষ্য প্রসিকিউশন উপস্থাপন করতে না পারলেও তাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়। সাধারণত, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বা সমর্থনমূলক প্রমাণ ছাড়া শুধু একজনের জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে অন্য কাউকে সাজা দেওয়া যায় না। তবে এই মামলায় আইনের সেই মৌলিক নীতি মানা হয়নি বলে আইনজীবীদের অভিযোগ।

মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বদরুজ্জামান উল্লেখ করেন, “যেহেতু ষড়যন্ত্র আকারে ইঙ্গিতে কিংবা নীরবতার মাধ্যমেও হতে পারে, তাই সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো একজনের জবানবন্দির ভিত্তিতেই বাকিদের সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে বাড়তি সাক্ষ্যের কিংবা সমর্থনমূলক সাক্ষ্যে কিংবা অন্য কোনো প্রমাণের দরকার নেই।” রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারকরা আরও বলেন, শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আসার পর ষড়যন্ত্রকারীরা তাকে ২০ বার হত্যার চেষ্টা করেছে। আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে উল্লিখিত নৃশংস ও ন্যক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হতে পারে।

পর্যবেক্ষণে বিচারক আরও বলেন, মুফতি হান্নানের আদালতে দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী ২০০০ সালের জুলাই মাসে হুজির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে বৈধ সরকারকে উৎখাতের জন্য শেখ হাসিনাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই বছরই কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনার সমাবেশস্থলে ও হেলিপ্যাডের কাছে ৭৬ কেজি ও ৪০ কেজি ওজনের শক্তিশালী বোমা পুঁতে রাখা হয়েছিল।

বিচারপতিদের পূর্ববর্তী ভূমিকা
এই মামলার রায় প্রদানকারী বিচারপতিদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক থাকাকালে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী, মতিউর রহমান নিজামী এবং এটিএম আজহারুল ইসলামের ফাঁসির আদেশ দেন। পরবর্তীতে ২০২২ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্টে নিয়োগ পান। জুলাই বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হলে বিচারপতি জাহাঙ্গীর পদত্যাগ করেন। বিচারপতি বদরুজ্জামান তৎকালীন সরকারের আমলে দায়িত্ব পালন করা ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জান্নাতুল ফেরদৌসী রুপার স্বামী। দুর্নীতি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর ৯ মার্চ ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত রুপার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে। জুলাই বিপ্লবের পর বিচারপতি বদরুজ্জামানকে বিচারিক কার্যক্রম থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

২০০০ সালের ২২ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার শেখ লুৎফুর রহমান সরকারি কলেজ মাঠে শেখ হাসিনার জনসভার প্যান্ডেল প্রস্তুতকালীন ২০ জুলাই ৭৬ কেজি ওজনের বোমা উদ্ধার করা হয়। এর তিনদিন পর ২৩ জুলাই শেখ হাসিনার হেলিকপ্টার নামার জন্য তৈরি হেলিপ্যাডের কাছ থেকে আরও ৪০ কেজি ওজনের বোমা উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মোট তিনটি মামলা হয়েছিল।

একই রকম দুটি বোমা উদ্ধারের ঘটনা হলেও, মামলা দুটির আসামিদের তালিকা ভিন্ন ভিন্ন। ২০ জুলাই উদ্ধার হওয়া বোমা মামলায় যাদের আসামি করা হয়, ২৩ তারিখে উদ্ধার হওয়া বোমা মামলায় বিস্ফোরকদ্রব্য আইন, রাষ্ট্রদ্রোহ ও হত্যা ষড়যন্ত্র আইনে সম্পূর্ণ ভিন্ন ১৪ জনকে আসামি করা হয়। এই ১৪ জনের বিরুদ্ধেও মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে। একই ঘটনার আসামি ভিন্ন ভিন্ন হওয়ায় মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

উচ্চ আদালতে শুনানির অপেক্ষায়
এই হত্যাচেষ্টা মামলার নিম্ন আদালতের রায়সহ সব নথি ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট হাইকোর্টে পাঠানো হয়। এরপর তৎকালীন প্রধান বিচারপতির নির্দেশে জরুরি ভিত্তিতে পেপারবুক তৈরি হলে হাইকোর্টে আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়। কিন্তু হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ কয়েকবার পুনর্গঠিত হওয়ায় মামলাটি শুনানিতে আসেনি। জুলাই বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে মামলাটি শুনানির জন্য বারবার তোলার কথা বলা হলেও তা এখনো হয়নি। ফলে এই আলেমদের বছরের পর বছর ধরে কারাবন্দি থাকতে হচ্ছে।

পরিবারের দাবি ও আইনজীবীদের বক্তব্য
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মাওলানা আমিরুল ইসলামের ছেলে মুজাহিদুল ইসলাম জানান, ২০০০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের আজীবন নিরাপত্তা বিল পাস করার জন্য কোটালীপাড়ায় বোমা মামলার ঘটনা সাজানো হয়েছিল। তিনি অভিযোগ করেন, এই ধরনের ঘটনা সাজিয়ে তৎকালীন সরকার অনেক আলেম ও ইসলামী চিন্তাবিদকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে জেলখানায় পাঠিয়েছে, কারণ তারা রাজনৈতিকভাবে সোচ্চার ছিলেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে তারা ন্যায়বিচার পাবেন।

আরেক কারাবন্দি মুফতি শফিকুর রহমানের জামাতা গিয়াস উদ্দিনের মতে, তার শ্বশুর ইসলামী ঐক্যজোট গঠনের অন্যতম কারিগর হওয়ায় তৎকালীন সরকারের টার্গেটে পরিণত হন। তিনি বলেন, ৭৬ কেজি বোমার ঘটনা সম্পূর্ণ একটি সাজানো ঘটনা, যেখানে কোনো বিস্ফোরণ হয়নি বা কেউ হতাহত হয়নি। এই ধরনের একটি বানোয়াট ঘটনায় কাউকে ২০ বছর, কাউকে ২৫ বছর ধরে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। আইনি জটিলতার কারণে মামলার শুনানি হচ্ছে না, এবং তারা রায়ও পাচ্ছেন না।

মুফতি আব্দুল হাই, মুফতি শফিকুর রহমান এবং মাওলানা শেখ ফরিদের আইনজীবীরা জানান, মামলার এজাহার, চার্জশিট এবং রায়সহ প্রতিটি বিষয়ে আলেমরা নির্দোষ প্রমাণিত হন। তারা আরও উল্লেখ করেন, অন্য মামলায় আদালত রায়ে বলেছে, সাজানো স্বীকারোক্তিতে এই মামলায় আলেমদের সাজা দেওয়া হয়েছে। মামলার দীর্ঘসূত্রতার জেরে তাদের এখনো জেলে অন্তরীণ রাখা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে মানবাধিকার সংগঠন লাইট হাউসের সদস্য সচিব এবিএম সাইফুল্লাহ মন্তব্য করেন, স্বনামধন্য আলেমদের মিথ্যা মামলায় জড়ানো একটি সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ। তিনি অভিযোগ করেন, এভাবে বিভিন্ন অজুহাতে আলেমদের জঙ্গী হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করা হয়েছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

উজিরপুরে অগ্নিকাণ্ডে ৫ পরিবারের স্বপ্ন ভস্ম, লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি

কোটালীপাড়া বোমা মামলা: বিচারিক প্রক্রিয়া ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আলেমদের দীর্ঘ কারাবাস

আপডেট সময় : ০৮:৩০:৫৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় ২০০০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভাস্থলের কাছে বোমা উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বেশ কয়েকজন আলেম বছরের পর বছর ধরে কারাবন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া এবং আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে শুরু থেকেই নানা বিতর্ক ও প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় থাকা আলেমদের মধ্যে রয়েছেন মুফতি শফিকুর রহমান, মাওলানা আমিরুল ইসলাম, মুফতি আবদুল হাই, মাওলানা শেখ ফরিদ, মাওলানা আবু বকর, মাওলানা আব্দুর রউফ ও মাওলানা জাহাঙ্গীর আলম। উল্লেখ্য, বিচার চলাকালীন সময়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মাওলানা ইয়াহ ইয়া কারাগারে নির্যাতনে মারা যান বলে অভিযোগ রয়েছে।

চাঞ্চল্যকর এই মামলার প্রথম চার্জশিটে ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছিল, যেখানে বর্তমান মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আলেমদের নাম ছিল না। সিআইডির তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার মুন্সি আতিকুর রহমান এই চার্জশিট দাখিল করেন। তবে ২০০৯ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম তখনকার প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক বিরোধিতার অভিযোগে বেশ কিছু আলেমকে এই মামলায় অন্তর্ভুক্ত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে, ২০১৭ সালে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারপতি মমতাজ বেগম এই আলেমদের ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার রায় দেন। এরপর ২০২১ সালে হাইকোর্টের বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও মোহাম্মদ বদরুজ্জামান নিম্ন আদালতের সেই রায় বহাল রাখেন।

মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এই আলেমদের মৃত্যুদণ্ড মূলত অন্য একটি মামলার আসামি মুফতি হান্নানের দেওয়া জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছে। যদিও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে উচ্চ আদালত মুফতি হান্নানের জবানবন্দিগুলোকে ‘আইনের চোখে অবিশ্বাসযোগ্য’ ঘোষণা করে বাতিল করেছিল। আদালত সেসময় উল্লেখ করে, জবানবন্দিগুলো নিয়মবহির্ভূতভাবে এবং অমানবিক নির্যাতনের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছিল। মুফতি হান্নানের সেই জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে শফিকুর রহমান, আব্দুল হাই, শেখ ফরিদ, আবু তাহের, ইয়াহিয়া, আব্দুর রউফসহ অনেক আলেমকে ২১ আগস্টের মামলাতেও আসামি করা হয়েছিল, কিন্তু সম্প্রতি উচ্চ আদালত তাদের নির্দোষ ঘোষণা করে খালাস দিয়েছেন।

কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলায় এসব আলেমদের বিরুদ্ধে কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অথবা সমর্থনমূলক সাক্ষ্য প্রসিকিউশন উপস্থাপন করতে না পারলেও তাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়। সাধারণত, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বা সমর্থনমূলক প্রমাণ ছাড়া শুধু একজনের জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে অন্য কাউকে সাজা দেওয়া যায় না। তবে এই মামলায় আইনের সেই মৌলিক নীতি মানা হয়নি বলে আইনজীবীদের অভিযোগ।

মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বদরুজ্জামান উল্লেখ করেন, “যেহেতু ষড়যন্ত্র আকারে ইঙ্গিতে কিংবা নীরবতার মাধ্যমেও হতে পারে, তাই সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো একজনের জবানবন্দির ভিত্তিতেই বাকিদের সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে বাড়তি সাক্ষ্যের কিংবা সমর্থনমূলক সাক্ষ্যে কিংবা অন্য কোনো প্রমাণের দরকার নেই।” রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারকরা আরও বলেন, শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আসার পর ষড়যন্ত্রকারীরা তাকে ২০ বার হত্যার চেষ্টা করেছে। আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে উল্লিখিত নৃশংস ও ন্যক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হতে পারে।

পর্যবেক্ষণে বিচারক আরও বলেন, মুফতি হান্নানের আদালতে দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী ২০০০ সালের জুলাই মাসে হুজির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে বৈধ সরকারকে উৎখাতের জন্য শেখ হাসিনাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই বছরই কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনার সমাবেশস্থলে ও হেলিপ্যাডের কাছে ৭৬ কেজি ও ৪০ কেজি ওজনের শক্তিশালী বোমা পুঁতে রাখা হয়েছিল।

বিচারপতিদের পূর্ববর্তী ভূমিকা
এই মামলার রায় প্রদানকারী বিচারপতিদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক থাকাকালে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী, মতিউর রহমান নিজামী এবং এটিএম আজহারুল ইসলামের ফাঁসির আদেশ দেন। পরবর্তীতে ২০২২ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্টে নিয়োগ পান। জুলাই বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হলে বিচারপতি জাহাঙ্গীর পদত্যাগ করেন। বিচারপতি বদরুজ্জামান তৎকালীন সরকারের আমলে দায়িত্ব পালন করা ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জান্নাতুল ফেরদৌসী রুপার স্বামী। দুর্নীতি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর ৯ মার্চ ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত রুপার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে। জুলাই বিপ্লবের পর বিচারপতি বদরুজ্জামানকে বিচারিক কার্যক্রম থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

২০০০ সালের ২২ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার শেখ লুৎফুর রহমান সরকারি কলেজ মাঠে শেখ হাসিনার জনসভার প্যান্ডেল প্রস্তুতকালীন ২০ জুলাই ৭৬ কেজি ওজনের বোমা উদ্ধার করা হয়। এর তিনদিন পর ২৩ জুলাই শেখ হাসিনার হেলিকপ্টার নামার জন্য তৈরি হেলিপ্যাডের কাছ থেকে আরও ৪০ কেজি ওজনের বোমা উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মোট তিনটি মামলা হয়েছিল।

একই রকম দুটি বোমা উদ্ধারের ঘটনা হলেও, মামলা দুটির আসামিদের তালিকা ভিন্ন ভিন্ন। ২০ জুলাই উদ্ধার হওয়া বোমা মামলায় যাদের আসামি করা হয়, ২৩ তারিখে উদ্ধার হওয়া বোমা মামলায় বিস্ফোরকদ্রব্য আইন, রাষ্ট্রদ্রোহ ও হত্যা ষড়যন্ত্র আইনে সম্পূর্ণ ভিন্ন ১৪ জনকে আসামি করা হয়। এই ১৪ জনের বিরুদ্ধেও মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে। একই ঘটনার আসামি ভিন্ন ভিন্ন হওয়ায় মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

উচ্চ আদালতে শুনানির অপেক্ষায়
এই হত্যাচেষ্টা মামলার নিম্ন আদালতের রায়সহ সব নথি ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট হাইকোর্টে পাঠানো হয়। এরপর তৎকালীন প্রধান বিচারপতির নির্দেশে জরুরি ভিত্তিতে পেপারবুক তৈরি হলে হাইকোর্টে আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়। কিন্তু হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ কয়েকবার পুনর্গঠিত হওয়ায় মামলাটি শুনানিতে আসেনি। জুলাই বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে মামলাটি শুনানির জন্য বারবার তোলার কথা বলা হলেও তা এখনো হয়নি। ফলে এই আলেমদের বছরের পর বছর ধরে কারাবন্দি থাকতে হচ্ছে।

পরিবারের দাবি ও আইনজীবীদের বক্তব্য
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মাওলানা আমিরুল ইসলামের ছেলে মুজাহিদুল ইসলাম জানান, ২০০০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের আজীবন নিরাপত্তা বিল পাস করার জন্য কোটালীপাড়ায় বোমা মামলার ঘটনা সাজানো হয়েছিল। তিনি অভিযোগ করেন, এই ধরনের ঘটনা সাজিয়ে তৎকালীন সরকার অনেক আলেম ও ইসলামী চিন্তাবিদকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে জেলখানায় পাঠিয়েছে, কারণ তারা রাজনৈতিকভাবে সোচ্চার ছিলেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে তারা ন্যায়বিচার পাবেন।

আরেক কারাবন্দি মুফতি শফিকুর রহমানের জামাতা গিয়াস উদ্দিনের মতে, তার শ্বশুর ইসলামী ঐক্যজোট গঠনের অন্যতম কারিগর হওয়ায় তৎকালীন সরকারের টার্গেটে পরিণত হন। তিনি বলেন, ৭৬ কেজি বোমার ঘটনা সম্পূর্ণ একটি সাজানো ঘটনা, যেখানে কোনো বিস্ফোরণ হয়নি বা কেউ হতাহত হয়নি। এই ধরনের একটি বানোয়াট ঘটনায় কাউকে ২০ বছর, কাউকে ২৫ বছর ধরে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। আইনি জটিলতার কারণে মামলার শুনানি হচ্ছে না, এবং তারা রায়ও পাচ্ছেন না।

মুফতি আব্দুল হাই, মুফতি শফিকুর রহমান এবং মাওলানা শেখ ফরিদের আইনজীবীরা জানান, মামলার এজাহার, চার্জশিট এবং রায়সহ প্রতিটি বিষয়ে আলেমরা নির্দোষ প্রমাণিত হন। তারা আরও উল্লেখ করেন, অন্য মামলায় আদালত রায়ে বলেছে, সাজানো স্বীকারোক্তিতে এই মামলায় আলেমদের সাজা দেওয়া হয়েছে। মামলার দীর্ঘসূত্রতার জেরে তাদের এখনো জেলে অন্তরীণ রাখা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে মানবাধিকার সংগঠন লাইট হাউসের সদস্য সচিব এবিএম সাইফুল্লাহ মন্তব্য করেন, স্বনামধন্য আলেমদের মিথ্যা মামলায় জড়ানো একটি সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ। তিনি অভিযোগ করেন, এভাবে বিভিন্ন অজুহাতে আলেমদের জঙ্গী হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করা হয়েছে।