ঢাকা ০৮:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দীর্ঘ আট বছর গুমের পর মুক্তি: ওজন মেপে হত্যার পরিকল্পনার চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি

দীর্ঘ আট বছর গুম ও অমানুষিক নির্যাতনের পর মুক্তি পাওয়া ব্যারিস্টার আরমান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এক চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি দিয়েছেন। বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলের সামনে প্রথম সাক্ষী হিসেবে তিনি এই জবানবন্দি পেশ করেন। এই জবানবন্দিতে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমানের ১২ জন সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় অভিযোগ আনেন।

আরমান জানান, ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টার দিকে একদল অস্ত্রধারী লোক তাকে তার বাসা থেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। তিনি ছিলেন জুডিশিয়াল কিলিংয়ের শিকার শহীদ মীর কাসেম আলীর ছেলে এবং তার বাবার মামলায় তিনি আইনজীবী হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। তার বাবার ফাঁসির রায় হয়েছিল এবং আপিল বিভাগেও সেই রায় বহাল ছিল। এই সময়েই তিনি গুমের শিকার হন।

দীর্ঘ আট বছর তাকে একটি সংকীর্ণ সেলে আটকে রাখা হয়। সেখানে তাকে পরনের কাপড় খুলে লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরতে বাধ্য করা হত এবং চোখ বেঁধে রাখা হত। স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে ইঁদুর ও তেলাপোকার মধ্যে তাকে ১৬ দিন রাখা হয়। পরে তাকে অন্য একটি সেলে স্থানান্তরিত করা হয়, যা আগের চেয়ে বড় ছিল। জবানবন্দিতে তিনি উল্লেখ করেন, যে সেলে তাকে রাখা হয়েছিল, সেটি র‍্যাব-১ কম্পাউন্ডের অধীনে পরিচালিত র‍্যাব ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের টিএফআই সেল ছিল।

প্রহরীদের আচরণ ছিল নির্মম। তাকে সবসময় চোখ বেঁধে ও হাতকড়া পরিয়ে রাখা হত। নামাযের সময় বা দিন-রাতের হিসেব বোঝার কোনো উপায় ছিল না। অন্যান্য সেলের বন্দিদের নির্যাতনের আর্তচিৎকারও তিনি শুনতে পেতেন।

এক পর্যায়ে একজন প্রহরী তাকে জানায় যে, তাকে যখন এখানে আনা হয়েছিল, তখন তার ওজন মাপা হয়েছিল এবং সেই অনুযায়ী তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এসিড দিয়ে চেহারা ও হাত ঝলসে দিয়ে ওজন অনুযায়ী ইট বেঁধে তাকে বরিশাল নদীতে ফেলে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে, যিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তিনি সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হওয়ায় পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হয়নি।

আরমান জানান, তিনি যখন গুম হন, তখন জিয়া কর্ণেল পদে ছিলেন এবং পরে জেনারেল হন। তিনি জিয়াকে এই গুমের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে উল্লেখ করেন। দীর্ঘ আট বছর গুম থাকার সময় তিনি আটটি রমজান মাস গণনা করেন।

গুমের কয়েক বছর পর, একদিন গভীর রাতে তাকে অন্য একটি স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একজন বয়স্ক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করেন এতদিন কোথায় ছিল এবং তারা কারা। ভয়ে তিনি উত্তর দিতে পারেননি। পরে তাকে একটি গাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। তিনি মনে করেছিলেন তাকে হত্যা করা হচ্ছে এবং মৃত্যু সহজ করার জন্য তিনি সূরা ইয়াসিন পড়তে থাকেন।

অনেকক্ষণ পর তিনি বুঝতে পারেন যে তিনি একা। তিনি বাঁধন খুলে একটি নির্মাণাধীন ভবনের কাছে পৌঁছান, যেখানে ‘দিয়াবাড়ী, উত্তরা’ লেখা ছিল। সেখান থেকে তিনি ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টার উত্তরা শাখায় যান। সেখানে ম্যানেজার তাকে চিনতে না পারলেও, তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে সাহায্য চান। গুগল সার্চে নিজের ছবি দেখে ম্যানেজার তাকে চিনতে পারেন এবং আবেগে জড়িয়ে ধরে বলেন, তারা দ্বিতীয়বার স্বাধীন হয়েছেন এবং তাদের ভাইকে ফিরে পেয়েছেন। তিনি জানতে পারেন যে, ফ্যাসিস্ট হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কক্সবাজারে অনুমোদনহীন এলপিজি পাম্পে ভয়াবহ বিস্ফোরণ: দগ্ধ ১৫, পুড়লো অর্ধশতাধিক ঘর ও ১৫ গাড়ি

দীর্ঘ আট বছর গুমের পর মুক্তি: ওজন মেপে হত্যার পরিকল্পনার চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি

আপডেট সময় : ১০:৪০:৩৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬

দীর্ঘ আট বছর গুম ও অমানুষিক নির্যাতনের পর মুক্তি পাওয়া ব্যারিস্টার আরমান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এক চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি দিয়েছেন। বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলের সামনে প্রথম সাক্ষী হিসেবে তিনি এই জবানবন্দি পেশ করেন। এই জবানবন্দিতে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমানের ১২ জন সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় অভিযোগ আনেন।

আরমান জানান, ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টার দিকে একদল অস্ত্রধারী লোক তাকে তার বাসা থেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। তিনি ছিলেন জুডিশিয়াল কিলিংয়ের শিকার শহীদ মীর কাসেম আলীর ছেলে এবং তার বাবার মামলায় তিনি আইনজীবী হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। তার বাবার ফাঁসির রায় হয়েছিল এবং আপিল বিভাগেও সেই রায় বহাল ছিল। এই সময়েই তিনি গুমের শিকার হন।

দীর্ঘ আট বছর তাকে একটি সংকীর্ণ সেলে আটকে রাখা হয়। সেখানে তাকে পরনের কাপড় খুলে লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরতে বাধ্য করা হত এবং চোখ বেঁধে রাখা হত। স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে ইঁদুর ও তেলাপোকার মধ্যে তাকে ১৬ দিন রাখা হয়। পরে তাকে অন্য একটি সেলে স্থানান্তরিত করা হয়, যা আগের চেয়ে বড় ছিল। জবানবন্দিতে তিনি উল্লেখ করেন, যে সেলে তাকে রাখা হয়েছিল, সেটি র‍্যাব-১ কম্পাউন্ডের অধীনে পরিচালিত র‍্যাব ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের টিএফআই সেল ছিল।

প্রহরীদের আচরণ ছিল নির্মম। তাকে সবসময় চোখ বেঁধে ও হাতকড়া পরিয়ে রাখা হত। নামাযের সময় বা দিন-রাতের হিসেব বোঝার কোনো উপায় ছিল না। অন্যান্য সেলের বন্দিদের নির্যাতনের আর্তচিৎকারও তিনি শুনতে পেতেন।

এক পর্যায়ে একজন প্রহরী তাকে জানায় যে, তাকে যখন এখানে আনা হয়েছিল, তখন তার ওজন মাপা হয়েছিল এবং সেই অনুযায়ী তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এসিড দিয়ে চেহারা ও হাত ঝলসে দিয়ে ওজন অনুযায়ী ইট বেঁধে তাকে বরিশাল নদীতে ফেলে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে, যিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তিনি সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হওয়ায় পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হয়নি।

আরমান জানান, তিনি যখন গুম হন, তখন জিয়া কর্ণেল পদে ছিলেন এবং পরে জেনারেল হন। তিনি জিয়াকে এই গুমের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে উল্লেখ করেন। দীর্ঘ আট বছর গুম থাকার সময় তিনি আটটি রমজান মাস গণনা করেন।

গুমের কয়েক বছর পর, একদিন গভীর রাতে তাকে অন্য একটি স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একজন বয়স্ক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করেন এতদিন কোথায় ছিল এবং তারা কারা। ভয়ে তিনি উত্তর দিতে পারেননি। পরে তাকে একটি গাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। তিনি মনে করেছিলেন তাকে হত্যা করা হচ্ছে এবং মৃত্যু সহজ করার জন্য তিনি সূরা ইয়াসিন পড়তে থাকেন।

অনেকক্ষণ পর তিনি বুঝতে পারেন যে তিনি একা। তিনি বাঁধন খুলে একটি নির্মাণাধীন ভবনের কাছে পৌঁছান, যেখানে ‘দিয়াবাড়ী, উত্তরা’ লেখা ছিল। সেখান থেকে তিনি ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টার উত্তরা শাখায় যান। সেখানে ম্যানেজার তাকে চিনতে না পারলেও, তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে সাহায্য চান। গুগল সার্চে নিজের ছবি দেখে ম্যানেজার তাকে চিনতে পারেন এবং আবেগে জড়িয়ে ধরে বলেন, তারা দ্বিতীয়বার স্বাধীন হয়েছেন এবং তাদের ভাইকে ফিরে পেয়েছেন। তিনি জানতে পারেন যে, ফ্যাসিস্ট হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন।