ঢাকা ০১:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

সোনালি দিনের নায়ক ও নৃত্যগুরু জাভেদের জীবনাবসান: ৮২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ

বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি যুগের বর্ণিল নায়ক ও প্রখ্যাত নৃত্য পরিচালক জাভেদ আর নেই। আজ বুধবার (২১ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর উত্তরার একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। পাকিস্তানে জন্ম হলেও, তিনি সারাজীবন বাংলাদেশকে আপন করে নিয়েছিলেন এবং এই মাটিতেই তাঁর জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটল।

জাভেদের প্রকৃত নাম ছিল রাজা মোহাম্মদ ইলিয়াস। চলচ্চিত্রে তাঁর প্রধান পরিচয় ছিল দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৃত্য পরিচালক হিসেবে। ছোটবেলা থেকেই নাচের প্রতি তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। এই অনুরাগ তাঁকে টেনে নিয়ে যায় মুম্বাইয়ের মতো জায়গায়, যেখানে তিনি কিংবদন্তি সাধু মহারাজ ও শম্ভু মহারাজের কাছে নাচের তালিম নেন। বলিউডের প্রখ্যাত কোরিওগ্রাফার সরোজ খানের সঙ্গে একই সময়ে নাচের প্রশিক্ষণ নেওয়ার অভিজ্ঞতাও ছিল তাঁর।

নৃত্য পরিচালনা দিয়ে চলচ্চিত্র জগতে অভিষেক হলেও, পরবর্তীতে তিনি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন শতাধিক চলচ্চিত্রে। ১৯৬৪ সালে উর্দু ভাষার ছবি ‘নয়ি জিন্দেগি’ দিয়ে তাঁর নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে। তবে ১৯৭০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মুস্তাফিজ পরিচালিত ‘পায়েল’ ছবিটি তাঁকে তুমুল জনপ্রিয়তা এনে দেয়। এই ছবিতে তিনি নায়করাজ রাজ্জাক ও কিংবদন্তি অভিনেত্রী শাবানার সঙ্গে অভিনয় করে দর্শক হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে তোলেন। এরপর ‘নিশান’ সিনেমার মাধ্যমে তাঁর জনপ্রিয়তা পৌঁছে যায় শিখরে, বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পে তিনি হয়ে ওঠেন এক অপরিহার্য নায়ক।

‘মালকা বানু’, ‘অনেক দিন আগে’, ‘শাহজাদী’, ‘নিশান’, ‘রাজকুমারী চন্দ্রভান’, ‘কাজল রেখা’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘নরম গরম’, ‘তিন বাহাদুর’, ‘চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা’, ‘চোরের রাজা’, ‘জালিম রাজকন্যা’—এমন অসংখ্য আলোচিত ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন। শাবানা, ববিতা, কবরী, অলিভিয়া, অঞ্জু ঘোষ, রোজিনা, নূতন ও সুচরিতার মতো জনপ্রিয় নায়িকাদের সঙ্গে তাঁর জুটি ছিল দর্শকনন্দিত ও সফল।

অভিনয়ের পাশাপাশি নৃত্য পরিচালনায়ও জাভেদ এনেছিলেন এক নতুন ধারা। তাঁর হাত ধরেই বাংলা সিনেমার নাচে আসে আধুনিকতার ছোঁয়া, যা এক নতুন যুগের সূচনা করে। কবরী, শাবানা, ববিতা, রোজিনা, অঞ্জু ঘোষ, সুচরিতাসহ প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় নায়িকা তাঁর কোরিওগ্রাফিতে পর্দায় ঝড় তুলেছেন। শুধু নায়িকারাই নন, রাজ্জাক, আলমগীর, সোহেল রানা, ওয়াসিম, ফারুক, জাফর ইকবাল, ইলিয়াস কাঞ্চনের মতো বাঘা বাঘা নায়করাও তাঁর কাছে নাচের তালিম নিয়েছেন। নাচের গুরু হিসেবে চলচ্চিত্রাঙ্গনে তিনি সবার কাছে ‘ওস্তাদ’ নামেই শ্রদ্ধেয় ছিলেন।

একসময় পুরান ঢাকার সিদ্দিকবাজার এলাকায় জাভেদ বসবাস করতেন। এলাকাবাসীর অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় সেই মহল্লাটিই একসময় ‘জাভেদ মহল্লা’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। সুস্থ থাকা অবস্থায় তিনি সুযোগ পেলেই ফিরে যেতেন সেই প্রিয় এলাকায়, সময় কাটাতেন প্রিয় মানুষদের সঙ্গে। পরবর্তী সময়ে তিনি উত্তরার ১৪ নম্বর সেক্টরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

দীর্ঘ অভিনয় ও নৃত্য পরিচালনা জীবনে তিনি অসংখ্য স্মরণীয় কাজ উপহার দিয়েছেন। তাঁর প্রয়াণে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো। গুণী এই শিল্পীর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শ্রীলঙ্কা থেকে দেশে ফিরলেন আটকে পড়া ২৩৮ ইরানি নাবিক

সোনালি দিনের নায়ক ও নৃত্যগুরু জাভেদের জীবনাবসান: ৮২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ

আপডেট সময় : ১০:২৯:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি যুগের বর্ণিল নায়ক ও প্রখ্যাত নৃত্য পরিচালক জাভেদ আর নেই। আজ বুধবার (২১ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর উত্তরার একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। পাকিস্তানে জন্ম হলেও, তিনি সারাজীবন বাংলাদেশকে আপন করে নিয়েছিলেন এবং এই মাটিতেই তাঁর জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটল।

জাভেদের প্রকৃত নাম ছিল রাজা মোহাম্মদ ইলিয়াস। চলচ্চিত্রে তাঁর প্রধান পরিচয় ছিল দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৃত্য পরিচালক হিসেবে। ছোটবেলা থেকেই নাচের প্রতি তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। এই অনুরাগ তাঁকে টেনে নিয়ে যায় মুম্বাইয়ের মতো জায়গায়, যেখানে তিনি কিংবদন্তি সাধু মহারাজ ও শম্ভু মহারাজের কাছে নাচের তালিম নেন। বলিউডের প্রখ্যাত কোরিওগ্রাফার সরোজ খানের সঙ্গে একই সময়ে নাচের প্রশিক্ষণ নেওয়ার অভিজ্ঞতাও ছিল তাঁর।

নৃত্য পরিচালনা দিয়ে চলচ্চিত্র জগতে অভিষেক হলেও, পরবর্তীতে তিনি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন শতাধিক চলচ্চিত্রে। ১৯৬৪ সালে উর্দু ভাষার ছবি ‘নয়ি জিন্দেগি’ দিয়ে তাঁর নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে। তবে ১৯৭০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মুস্তাফিজ পরিচালিত ‘পায়েল’ ছবিটি তাঁকে তুমুল জনপ্রিয়তা এনে দেয়। এই ছবিতে তিনি নায়করাজ রাজ্জাক ও কিংবদন্তি অভিনেত্রী শাবানার সঙ্গে অভিনয় করে দর্শক হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে তোলেন। এরপর ‘নিশান’ সিনেমার মাধ্যমে তাঁর জনপ্রিয়তা পৌঁছে যায় শিখরে, বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পে তিনি হয়ে ওঠেন এক অপরিহার্য নায়ক।

‘মালকা বানু’, ‘অনেক দিন আগে’, ‘শাহজাদী’, ‘নিশান’, ‘রাজকুমারী চন্দ্রভান’, ‘কাজল রেখা’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘নরম গরম’, ‘তিন বাহাদুর’, ‘চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা’, ‘চোরের রাজা’, ‘জালিম রাজকন্যা’—এমন অসংখ্য আলোচিত ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন। শাবানা, ববিতা, কবরী, অলিভিয়া, অঞ্জু ঘোষ, রোজিনা, নূতন ও সুচরিতার মতো জনপ্রিয় নায়িকাদের সঙ্গে তাঁর জুটি ছিল দর্শকনন্দিত ও সফল।

অভিনয়ের পাশাপাশি নৃত্য পরিচালনায়ও জাভেদ এনেছিলেন এক নতুন ধারা। তাঁর হাত ধরেই বাংলা সিনেমার নাচে আসে আধুনিকতার ছোঁয়া, যা এক নতুন যুগের সূচনা করে। কবরী, শাবানা, ববিতা, রোজিনা, অঞ্জু ঘোষ, সুচরিতাসহ প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় নায়িকা তাঁর কোরিওগ্রাফিতে পর্দায় ঝড় তুলেছেন। শুধু নায়িকারাই নন, রাজ্জাক, আলমগীর, সোহেল রানা, ওয়াসিম, ফারুক, জাফর ইকবাল, ইলিয়াস কাঞ্চনের মতো বাঘা বাঘা নায়করাও তাঁর কাছে নাচের তালিম নিয়েছেন। নাচের গুরু হিসেবে চলচ্চিত্রাঙ্গনে তিনি সবার কাছে ‘ওস্তাদ’ নামেই শ্রদ্ধেয় ছিলেন।

একসময় পুরান ঢাকার সিদ্দিকবাজার এলাকায় জাভেদ বসবাস করতেন। এলাকাবাসীর অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় সেই মহল্লাটিই একসময় ‘জাভেদ মহল্লা’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। সুস্থ থাকা অবস্থায় তিনি সুযোগ পেলেই ফিরে যেতেন সেই প্রিয় এলাকায়, সময় কাটাতেন প্রিয় মানুষদের সঙ্গে। পরবর্তী সময়ে তিনি উত্তরার ১৪ নম্বর সেক্টরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

দীর্ঘ অভিনয় ও নৃত্য পরিচালনা জীবনে তিনি অসংখ্য স্মরণীয় কাজ উপহার দিয়েছেন। তাঁর প্রয়াণে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো। গুণী এই শিল্পীর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।