ঢাকা ০১:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

ভারতীয় সুতার আগ্রাসনে দেশীয় বস্ত্র খাতের ২৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চরম ঝুঁকিতে

ভারতের সস্তা ও নিম্নমানের সুতার অবাধ আমদানিতে দেশের বস্ত্র খাতের প্রায় ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ এখন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। মূলত ভারতীয় সুতা রপ্তানিকারকদের আগ্রাসী বিপণন এবং ‘প্রাইস ডাম্পিং’-এর কারণে স্থানীয় বস্ত্রকলগুলো তাদের উৎপাদন ক্ষমতার অর্ধেকও কাজে লাগাতে পারছে না। খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন যে বিগত সরকারের আমলে ভারতকে একচেটিয়া সুবিধা দিতে সীমান্তঘেঁষা এলাকায় অর্ধশতাধিক ওয়্যারহাউস নির্মাণ করা হয়েছে যা এখন দেশীয় শিল্পকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) এর তথ্যমতে ২০২২ সাল থেকে ভারত থেকে সুতা ও কাপড় আমদানির পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। ২০২৪ সালে কেবল ভারত থেকেই সুতা আমদানি হয়েছে প্রায় ২ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলারের যা মোট আমদানিকৃত সুতার প্রায় ৯৫ শতাংশ। বর্তমানে ভারতীয় সুতা প্রতি কেজি ২ দশমিক ১৯ ডলারে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে অথচ দেশীয় মিলগুলোর উৎপাদন খরচই পড়ছে ২ দশমিক ৩৯ ডলার। ভারত সরকার তাদের রপ্তানিকারকদের অতিরিক্ত ভর্তুকি দেওয়ায় তারা এই অসম প্রতিযোগিতার সুযোগ নিচ্ছে। এর ফলে গত তিন বছরে অন্তত ৩০টি বড় টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়ে গেছে এবং নতুন কোনো বিনিয়োগ আসছে না।

উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন যে ভারত পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশ সীমান্তের চারটি স্থলবন্দরের কাছে গুদাম স্থাপন করায় তাদের পণ্য সরবরাহের সময় বা ‘লিডটাইম’ বহুগুণ কমে গেছে। এছাড়া সমুদ্রপথে নিম্নমানের সুতা এনে স্থানীয় বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ অবশ্য বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত আমদানির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে স্থানীয় সুতার দাম বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে বিটিএমএ বলছে যে ভারতীয় নিম্নমানের সুতা দিয়ে তৈরি পোশাক অনেক সময় ইউরোপ-আমেরিকার ক্রেতারা গ্রহণ করছেন না যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর।

এই সংকট নিরসনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নির্দিষ্ট কিছু কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ করলেও পোশাক রপ্তানিকারকরা এর বিরোধিতা করছেন। বিগত সরকারের আমলে দাতা সংস্থাগুলোর পরামর্শে দেশীয় শিল্পের ‘সেইফগার্ড’ বা সুরক্ষা সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল যা এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল এই বিপর্যয় মোকাবিলায় দ্রুত একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠনের দাবি জানিয়েছেন। ২৫ বিলিয়ন ডলারের এই বিশাল বিনিয়োগ ও লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান রক্ষায় সরকারের দ্রুত নীতি সহায়তা এবং ব্যাংক ঋণের হার কমানো এখন সময়ের দাবি।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

জলাবদ্ধতায় সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ধান কাটা নিয়ে কৃষকদের অনিশ্চয়তা

ভারতীয় সুতার আগ্রাসনে দেশীয় বস্ত্র খাতের ২৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চরম ঝুঁকিতে

আপডেট সময় : ০১:০৪:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬

ভারতের সস্তা ও নিম্নমানের সুতার অবাধ আমদানিতে দেশের বস্ত্র খাতের প্রায় ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ এখন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। মূলত ভারতীয় সুতা রপ্তানিকারকদের আগ্রাসী বিপণন এবং ‘প্রাইস ডাম্পিং’-এর কারণে স্থানীয় বস্ত্রকলগুলো তাদের উৎপাদন ক্ষমতার অর্ধেকও কাজে লাগাতে পারছে না। খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন যে বিগত সরকারের আমলে ভারতকে একচেটিয়া সুবিধা দিতে সীমান্তঘেঁষা এলাকায় অর্ধশতাধিক ওয়্যারহাউস নির্মাণ করা হয়েছে যা এখন দেশীয় শিল্পকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) এর তথ্যমতে ২০২২ সাল থেকে ভারত থেকে সুতা ও কাপড় আমদানির পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। ২০২৪ সালে কেবল ভারত থেকেই সুতা আমদানি হয়েছে প্রায় ২ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলারের যা মোট আমদানিকৃত সুতার প্রায় ৯৫ শতাংশ। বর্তমানে ভারতীয় সুতা প্রতি কেজি ২ দশমিক ১৯ ডলারে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে অথচ দেশীয় মিলগুলোর উৎপাদন খরচই পড়ছে ২ দশমিক ৩৯ ডলার। ভারত সরকার তাদের রপ্তানিকারকদের অতিরিক্ত ভর্তুকি দেওয়ায় তারা এই অসম প্রতিযোগিতার সুযোগ নিচ্ছে। এর ফলে গত তিন বছরে অন্তত ৩০টি বড় টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়ে গেছে এবং নতুন কোনো বিনিয়োগ আসছে না।

উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন যে ভারত পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশ সীমান্তের চারটি স্থলবন্দরের কাছে গুদাম স্থাপন করায় তাদের পণ্য সরবরাহের সময় বা ‘লিডটাইম’ বহুগুণ কমে গেছে। এছাড়া সমুদ্রপথে নিম্নমানের সুতা এনে স্থানীয় বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ অবশ্য বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত আমদানির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে স্থানীয় সুতার দাম বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে বিটিএমএ বলছে যে ভারতীয় নিম্নমানের সুতা দিয়ে তৈরি পোশাক অনেক সময় ইউরোপ-আমেরিকার ক্রেতারা গ্রহণ করছেন না যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর।

এই সংকট নিরসনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নির্দিষ্ট কিছু কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ করলেও পোশাক রপ্তানিকারকরা এর বিরোধিতা করছেন। বিগত সরকারের আমলে দাতা সংস্থাগুলোর পরামর্শে দেশীয় শিল্পের ‘সেইফগার্ড’ বা সুরক্ষা সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল যা এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল এই বিপর্যয় মোকাবিলায় দ্রুত একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠনের দাবি জানিয়েছেন। ২৫ বিলিয়ন ডলারের এই বিশাল বিনিয়োগ ও লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান রক্ষায় সরকারের দ্রুত নীতি সহায়তা এবং ব্যাংক ঋণের হার কমানো এখন সময়ের দাবি।