সম্প্রতি লন্ডনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে আয়োজিত একটি সুধী সমাবেশ এবং তাতে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন মহলের ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক ও বিশ্লেষক মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্টজনদের একাংশের মন্তব্য এবং তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেকে। বিশেষ করে, তারেক রহমানকে ‘বদলে যাওয়া’ বা ‘পরিবর্তিত’ হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ চলছে।
অনুষ্ঠানে একটি পত্রিকার সম্পাদক ফ্যাসিবাদী সময়ে নিপীড়িত সাংবাদিকদের দুর্দশা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, ক্যানসারে আক্রান্ত সাংবাদিক রুহুল আমিন গাজীর জেলখানায় বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু, একাত্তরের রণাঙ্গন পত্রিকার সম্পাদকের হয়রানি ও দীর্ঘ কারাবাস এবং শফিক রেহমানের কারাবাসের মতো ঘটনাগুলো তিনি ছাড়া আর কেউ হয়তো প্রকাশ্যে আনবেন না। এছাড়া, স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতি এবং গত ১৭ বছর ধরে তারেক রহমানের নির্বাসিত জীবনকে তুলনা করেন তিনি। যদিও তারেক রহমানের ক্ষেত্রে ডিজিটাল যোগাযোগের মাধ্যমে দেশবাসীর সঙ্গে তার সংযোগ অব্যাহত ছিল, যা শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ের পরিস্থিতি থেকে ভিন্ন।
জবাবে তারেক রহমান বলেন, গত ১৭ বছরে দেশে যা ঘটেছে, যারা দেশে ছিলেন তারা অবশ্যই তার থেকে ভালো জানবেন। তবে তিনি সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। প্রযুক্তিগত উন্নতির কারণে কয়েক হাজার মাইল দূর থেকেও তিনি প্রতি মুহূর্তের খবর পেয়েছেন এবং দলের দ্বিতীয় প্রধান নেতা ও পরে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে সাংগঠনিক যোগাযোগ বজায় রেখেছেন।
তবে, এই সমাবেশের মূল আকর্ষণ হয়ে ওঠে ‘তারেক রহমান পরিবর্তিত হয়ে গেছেন’ শীর্ষক বয়ান। একটি পত্রিকার সম্পাদক তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তিনি ২৩ বছর আগের তারেক রহমান থেকে অনেক বদলে গেছেন। এই মন্তব্যকে বিএনপির প্রতি নীরব সম্মতি আদায়ের চেষ্টা হিসেবে দেখছেন অনেকে। প্রশ্ন উঠেছে, এই ‘পরিবর্তন’ কি কেবল একটি প্রচারণার অংশ, যা অতীতের ‘হাওয়া ভবন’ সংশ্লিষ্ট নেতিবাচক ধারণাকে মুছে ফেলতে চাইছে?
সমাবেশে উপস্থিত অন্য একজন সম্পাদক, যিনি জাতীয়তাবাদী ধারার কবি হিসেবেও পরিচিত, তারেক রহমানকে নিয়মিত এ ধরনের আয়োজন করার পরামর্শ দেন। তার মতে, এতে ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী দেশ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকতে পারবেন। তবে, এই ধরনের পরামর্শের পেছনে ‘অলিগার্ক’ বা প্রভাবশালী মহলের স্বার্থ জড়িত থাকতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, অতীতেও এমন ‘রাজকবিদের’ মাধ্যমে রাজনৈতিক যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত জনগণের জন্য শুভ ফল বয়ে আনেনি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দুটি ভিন্ন মতাদর্শের মধ্যেকার পার্থক্য। একজন সম্পাদক যেখানে তারেক রহমানের মধ্যে ‘উগ্রবাদের গন্ধ’ খুঁজে পেয়েছেন এবং তার ‘পরিবর্তন’ নিয়ে কথা বলেছেন, সেখানে অন্য একজন সম্পাদক বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের প্রতি তার অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছেন এবং তার নেতৃত্বে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, কিন্তু কোনো উগ্রবাদের প্রসঙ্গ তোলেননি। এই পার্থক্যটুকু অনুধাবন করা তারেক রহমানের জন্য জরুরি বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
অনুষ্ঠানে এক পরিচিত মুখ, যিনি সাধারণত রাজনীতি ও জঙ্গিবাদ নিয়ে কথা বলেন, তাকে পরিবেশ, পানি ও বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ে কথা বলতে দেখা গেছে। তার এই হঠাৎ প্রকৃতিপ্রেম অনেকের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি করেছে, এটি কি তারেক রহমানের মন জয় করার একটি সুচিন্তিত কৌশল, যেমনটি চলচ্চিত্রে দেখা যায়?
সব মিলিয়ে, এই সুধী সমাবেশ এবং এর পারিপার্শ্বিক ঘটনাপ্রবাহ একটি বৃহত্তর ‘তারেক রহমান বশীকরণ’ মিশনের অংশ কি না, তা নিয়ে জোর সন্দেহ দানা বাঁধছে। যে ব্যক্তিরা তারেক রহমানের মধ্যে ‘উগ্রবাদের গন্ধ’ খুঁজে পান এবং তাকে ‘বদলে যাওয়া’ হিসেবে উপস্থাপন করতে চান, তাদের এই প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে তারেক রহমানের জন্য সম্পদ না হয়ে দায়বদ্ধতা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের এই ‘প্রশংসা’ ভবিষ্যতে কোনো ভিন্ন উদ্দেশ্য সাধনের জন্য কি না, সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক মহলে।
রিপোর্টারের নাম 

























