১৯৪৭ সালের জুলাই মাস। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সূর্য তখন ডুবুডুবু। ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক আকাশে তখন চরম অনিশ্চয়তা আর টানটান উত্তেজনা। দীর্ঘ দুইশ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ব্রিটিশরা বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু সেই বিদায়লগ্নে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়াটি ছিল চরম বিশৃঙ্খল ও নাটকীয়তায় ঠাসা। একদিকে ভারত স্বাধীনতা আইনের মাধ্যমে দেশভাগের আইনি চূড়ান্তকরণ, অন্যদিকে তড়িঘড়ি করে সীমানা নির্ধারণ—সব মিলিয়ে এক অস্থির সময় পার করছিল এই জনপদ।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন নির্ধারিত সময়ের প্রায় ১১ মাস আগেই ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘোষণা দেন। ১৯৪৮ সালের জুনের পরিবর্তে ১৯৪৭ সালের আগস্টেই ব্রিটিশদের বিদায়ের এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক স্তরে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। সীমানা নির্ধারণ, সেনাবাহিনী ও সম্পদ ভাগাভাগির মতো জটিল কাজগুলো করা হয় অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে। এই ত্বরান্বিত সিদ্ধান্তের নেপথ্যে কাজ করেছিল ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা। কিন্তু এই গতির মাশুল দিতে হয়েছিল কয়েক কোটি সাধারণ মানুষকে, যারা রাতারাতি নিজ ভূমিতে পরবাসী হয়ে পড়েছিল।
১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ‘ভারত স্বাধীনতা আইন’ পাসের মাধ্যমে দেশভাগ এক অনিবার্য পরিণতিতে রূপ নেয়। রাজনৈতিক দরকষাকষি তখন আর আদর্শের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ভূখণ্ড দখলের লড়াইয়ে পরিণত হয়। বিশেষ করে পাঞ্জাব ও বাংলার সীমানা নির্ধারণের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্যার সিরিল র্যাডক্লিফকে সময় দেওয়া হয়েছিল মাত্র পাঁচ সপ্তাহ। ভারতীয় জনজীবন সম্পর্কে প্রায় অজ্ঞ এই ব্রিটিশ আইনজীবীর কলমের খোঁচায় নির্ধারিত হয়েছিল কোটি মানুষের ভাগ্য। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এড়াতে মাউন্টব্যাটেন সীমানা নির্ধারণের চূড়ান্ত ম্যাপ বা ‘র্যাডক্লিফ অ্যাওয়ার্ড’ স্বাধীনতার আগে প্রকাশ না করে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত গোপন রাখেন। এই গোপনীয়তা সীমান্ত এলাকায় চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল।
দেশভাগের এই নাটকে সবচেয়ে বড় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু ছিল কলকাতা ও চট্টগ্রাম। তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র কলকাতাকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে চলে তীব্র লড়াই। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শরৎ চন্দ্র বসু ‘যুক্ত বাংলা’র প্রস্তাব দিলেও কংগ্রেস নেতা সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেলের অনমনীয় অবস্থানের কারণে তা ভেস্তে যায়। প্যাটেল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, কলকাতা ছাড়া কোনো সমঝোতা সম্ভব নয়। এমনকি কলকাতা যাতে পাকিস্তানের ভাগে না যায়, সেজন্য তিনি সব ধরনের রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করেন। তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতারা আশঙ্কা করেছিলেন, শিল্পসমৃদ্ধ কলকাতা ছাড়া পূর্ববঙ্গ একটি ‘পল্লি বস্তি’ বা ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
একই ধরনের নাটকীয়তা তৈরি হয়েছিল চট্টগ্রামকে ঘিরে। পার্বত্য চট্টগ্রামের অ-মুসলিম জনসংখ্যার দোহাই দিয়ে কংগ্রেস এই অঞ্চলটিকেও ভারতের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিল। এমনকি স্বাধীনতার মাত্র দুদিন আগে প্যাটেল মাউন্টব্যাটেনকে চিঠি লিখে চট্টগ্রাম দাবি করেন। তবে মাউন্টব্যাটেন বুঝতে পেরেছিলেন, কলকাতা বঞ্চিত পূর্ববঙ্গকে যদি চট্টগ্রামও না দেওয়া হয়, তবে এই ভূখণ্ডটি অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়বে। শেষ পর্যন্ত ফিরোজপুর ভারতকে দেওয়ার বিনিময়ে চট্টগ্রামকে পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
দেশভাগের এই চূড়ান্ত অঙ্কটি কতটা বিভ্রান্তিকর ছিল, তার প্রমাণ মেলে ১৪ থেকে ১৬ আগস্টের চিত্র দেখলে। সীমানা স্পষ্ট না হওয়ায় ওই তিন দিন হিন্দুপ্রধান খুলনায় ভারতের পতাকা উড়লেও শেষ পর্যন্ত তা পাকিস্তানের ভাগে পড়ে। অন্যদিকে মুসলিমপ্রধান মালদহে পাকিস্তানের পতাকা উড়লেও তা ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।
১৯৪৭ সালের আগস্টের সেই দিনগুলো ছিল একইসঙ্গে মুক্তির আনন্দ আর দেশান্তরের বেদনায় সিক্ত। রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষমতার লড়াই আর ব্রিটিশদের ‘ভাগ করো এবং শাসন করো’ নীতির চূড়ান্ত ফল ছিল এই দেশভাগ। যার রেশ আজও উপমহাদেশের ভূ-রাজনীতিতে বিদ্যমান। এক রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা আর কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছিল ভারত ভাগ নাটকের সেই শেষ অঙ্ক।
রিপোর্টারের নাম 

























