ঢাকা ১১:১৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

লাগামহীন নারী ও শিশু নির্যাতন: বিচারহীনতা ও সামাজিক অবক্ষয়ে বাড়ছে অপরাধ

দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের শিকার হচ্ছেন বয়স্ক থেকে শুরু করে কোলের শিশু পর্যন্ত। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, মামলার দীর্ঘসূত্রিতা, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবকে এই লাগামহীনতার প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সমাজবিজ্ঞানী ও মানবাধিকার কর্মীরা। সম্প্রতি নরসিংদী ও পাবনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক লোমহর্ষক ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারিতেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অভাব, রাজনৈতিক বিবেচনা ও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া নারী নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধির মূল কারণ। ভুক্তভোগীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে অনেক মামলা যথাযথ গুরুত্ব পায় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভাবও অপরাধ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা পরিস্থিতি ভয়াবহতা তুলে ধরেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পাবনার ঈশ্বরদীতে মধ্যরাতে বাড়িতে ঢুকে ৬৫ বছর বয়সী দাদি সুফিয়া বেগমকে হত্যা এবং তার ১৫ বছর বয়সী নাতনি জামিলা আক্তারকে (দিইশাইল দাখিল মাদরাসার দশম শ্রেণির ছাত্রী) অপহরণের পর ধর্ষণ করে হত্যার মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। সকালে উপজেলার দাশুড়িয়া ইউনিয়নের দিইশাইল গ্রাম থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গভীর রাতে কান্নাকাটির শব্দ শুনে স্থানীয়রা বের হলেও পরে শব্দ থেমে যায়। সকালে বাড়ির উঠানে সুফিয়া বেগমের রক্তাক্ত লাশ এবং সরিষা ক্ষেতে জামিলার বিবস্ত্র লাশ পাওয়া যায়। নিহতের মা শিরিনা খাতুন জানান, জামিলা বাবা ও দাদির কাছেই থাকত। বাবার অনুপস্থিতিতে তারা একাই ছিলেন। ঈশ্বরদী থানার ওসি মো. মমিনুজ্জামান জানিয়েছেন, লাশ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে এবং নিহতের শরীরে ও মুখে একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে।

এর একদিন আগে, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর মাধবদীতে ১৫ বছর বয়সী আমেনা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ উঠেছে। মহিষাশুড়ার বিলপাড় এলাকার কোতালিরচর দড়িকান্দী গ্রামের একটি সরিষা ক্ষেত থেকে গলায় ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতের পরিবারের দাবি, প্রায় ১৫ দিন আগে স্থানীয় বখাটে নূরা ও তার সহযোগীরা আমেনাকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করেছিল। পরিবার স্থানীয় ইউপি সদস্যের কাছে বিচার চেয়েও কোনো সুরাহা পায়নি। উল্টো অভিযুক্তরা দফায় দফায় হুমকি ও হেনস্তা করে। নিরাপত্তার অভাবে আমেনাকে খালার বাড়িতে রাখা হলেও, ঘটনার রাতে সৎ বাবা আশরাফ হোসেনের সঙ্গে ফেরার পথে নূরা ও তার সহযোগীরা তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ। মাধবদী থানার ওসি মো. কামাল হোসেন জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তের জন্য লাশ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদনে হত্যার আগে ধর্ষণের আলামত মিলেছে এবং এ ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে।

এছাড়াও, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকা থেকে অষ্টম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় দুই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানিয়েছে, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর কিশোরীকে হত্যা করে লাশ ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গত শনিবার ঝিনাইদহে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, চাঞ্চল্যকর নরসিংদীর ধর্ষণ মামলায় যারা জড়িত, তাদের আশ্রয়দাতাদের শেকড় ধরে উপড়ে ফেলা হবে। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, হত্যা ও ধর্ষণকে পুলিশ অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেখে। এমন ঘটনা ঘটলেই দ্রুত মামলা রুজু হয় এবং তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ধর্ষণের ঘটনায় রাজনৈতিক বিবেচনা, সম্পর্কগত বিবেচনা, এলাকাপ্রীতি ও ভয়ভীতিসহ নানাবিধ কারণে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অনেক সময় ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এর ফলে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। আসকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, জানুয়ারিতে মোট ৩৫ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২৫ জন একক এবং ১০ জন দলগত ধর্ষণের শিকার হন। মহিলা পরিষদ ৩১টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে।

বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৬ বছরের নিচে ২ জন এবং ৭ থেকে ১২ বছর বয়সি ১১ জন শিশু এই নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছে। এছাড়া ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সি ৩ জন, ১৯ থেকে ২৪ বছর বয়সি ২ জন, ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সি ২ জন এবং ৩০ বছরের ঊর্ধ্বে দুজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ১৩ জন ভুক্তভোগীর বয়স সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। এই সহিংসতার পরিণতি ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক; ধর্ষণের পর দুজন ভুক্তভোগীকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং একজন ধর্ষণের গ্লানি সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন। এছাড়া আরও আটজন নারী ও শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে নারী নির্যাতনের ধরন অনুযায়ী দেখা যায়, জানুয়ারিতে ৩১টি পারিবারিক পরিবেশে সহিংসতা, ৩৫টি ধর্ষণের, ২টি যৌন হেনস্থার, ৬টি কন্যা বিয়ে ও দাম্পত্যবিষয়ক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। গৃহহিংসার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, যা পরিবার ও সমাজে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার প্রমাণ। শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে ৩৫টি সহিংসতা এবং ২৫টি শিশু হত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশের নিরাপত্তা সংকটে থাকার চিত্র তুলে ধরে।

আইনি পদক্ষেপের ক্ষেত্রে, মোট ৩৫টি ঘটনার মধ্যে ২৮টি ঘটনায় মামলা দায়ের করা সম্ভব হলেও, ৫টি ঘটনার ক্ষেত্রে মামলা সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। আসক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই তথ্যগুলো নির্দেশ করে যে সমাজে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তাব্যবস্থা এখনও চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিচারহীনতা বা লোকলজ্জার ভয়ে অনেক তথ্য অগোচরেই থেকে যাচ্ছে, যা প্রকৃত চিত্রকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

লাগামহীন নারী ও শিশু নির্যাতন: বিচারহীনতা ও সামাজিক অবক্ষয়ে বাড়ছে অপরাধ

আপডেট সময় : ০৯:২২:৪১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬

দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের শিকার হচ্ছেন বয়স্ক থেকে শুরু করে কোলের শিশু পর্যন্ত। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, মামলার দীর্ঘসূত্রিতা, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবকে এই লাগামহীনতার প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সমাজবিজ্ঞানী ও মানবাধিকার কর্মীরা। সম্প্রতি নরসিংদী ও পাবনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক লোমহর্ষক ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারিতেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অভাব, রাজনৈতিক বিবেচনা ও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া নারী নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধির মূল কারণ। ভুক্তভোগীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে অনেক মামলা যথাযথ গুরুত্ব পায় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভাবও অপরাধ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা পরিস্থিতি ভয়াবহতা তুলে ধরেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পাবনার ঈশ্বরদীতে মধ্যরাতে বাড়িতে ঢুকে ৬৫ বছর বয়সী দাদি সুফিয়া বেগমকে হত্যা এবং তার ১৫ বছর বয়সী নাতনি জামিলা আক্তারকে (দিইশাইল দাখিল মাদরাসার দশম শ্রেণির ছাত্রী) অপহরণের পর ধর্ষণ করে হত্যার মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। সকালে উপজেলার দাশুড়িয়া ইউনিয়নের দিইশাইল গ্রাম থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গভীর রাতে কান্নাকাটির শব্দ শুনে স্থানীয়রা বের হলেও পরে শব্দ থেমে যায়। সকালে বাড়ির উঠানে সুফিয়া বেগমের রক্তাক্ত লাশ এবং সরিষা ক্ষেতে জামিলার বিবস্ত্র লাশ পাওয়া যায়। নিহতের মা শিরিনা খাতুন জানান, জামিলা বাবা ও দাদির কাছেই থাকত। বাবার অনুপস্থিতিতে তারা একাই ছিলেন। ঈশ্বরদী থানার ওসি মো. মমিনুজ্জামান জানিয়েছেন, লাশ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে এবং নিহতের শরীরে ও মুখে একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে।

এর একদিন আগে, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর মাধবদীতে ১৫ বছর বয়সী আমেনা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ উঠেছে। মহিষাশুড়ার বিলপাড় এলাকার কোতালিরচর দড়িকান্দী গ্রামের একটি সরিষা ক্ষেত থেকে গলায় ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতের পরিবারের দাবি, প্রায় ১৫ দিন আগে স্থানীয় বখাটে নূরা ও তার সহযোগীরা আমেনাকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করেছিল। পরিবার স্থানীয় ইউপি সদস্যের কাছে বিচার চেয়েও কোনো সুরাহা পায়নি। উল্টো অভিযুক্তরা দফায় দফায় হুমকি ও হেনস্তা করে। নিরাপত্তার অভাবে আমেনাকে খালার বাড়িতে রাখা হলেও, ঘটনার রাতে সৎ বাবা আশরাফ হোসেনের সঙ্গে ফেরার পথে নূরা ও তার সহযোগীরা তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ। মাধবদী থানার ওসি মো. কামাল হোসেন জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তের জন্য লাশ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদনে হত্যার আগে ধর্ষণের আলামত মিলেছে এবং এ ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে।

এছাড়াও, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকা থেকে অষ্টম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় দুই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানিয়েছে, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর কিশোরীকে হত্যা করে লাশ ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গত শনিবার ঝিনাইদহে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, চাঞ্চল্যকর নরসিংদীর ধর্ষণ মামলায় যারা জড়িত, তাদের আশ্রয়দাতাদের শেকড় ধরে উপড়ে ফেলা হবে। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, হত্যা ও ধর্ষণকে পুলিশ অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেখে। এমন ঘটনা ঘটলেই দ্রুত মামলা রুজু হয় এবং তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ধর্ষণের ঘটনায় রাজনৈতিক বিবেচনা, সম্পর্কগত বিবেচনা, এলাকাপ্রীতি ও ভয়ভীতিসহ নানাবিধ কারণে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অনেক সময় ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এর ফলে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। আসকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, জানুয়ারিতে মোট ৩৫ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২৫ জন একক এবং ১০ জন দলগত ধর্ষণের শিকার হন। মহিলা পরিষদ ৩১টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে।

বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৬ বছরের নিচে ২ জন এবং ৭ থেকে ১২ বছর বয়সি ১১ জন শিশু এই নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছে। এছাড়া ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সি ৩ জন, ১৯ থেকে ২৪ বছর বয়সি ২ জন, ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সি ২ জন এবং ৩০ বছরের ঊর্ধ্বে দুজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ১৩ জন ভুক্তভোগীর বয়স সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। এই সহিংসতার পরিণতি ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক; ধর্ষণের পর দুজন ভুক্তভোগীকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং একজন ধর্ষণের গ্লানি সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন। এছাড়া আরও আটজন নারী ও শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে নারী নির্যাতনের ধরন অনুযায়ী দেখা যায়, জানুয়ারিতে ৩১টি পারিবারিক পরিবেশে সহিংসতা, ৩৫টি ধর্ষণের, ২টি যৌন হেনস্থার, ৬টি কন্যা বিয়ে ও দাম্পত্যবিষয়ক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। গৃহহিংসার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, যা পরিবার ও সমাজে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার প্রমাণ। শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে ৩৫টি সহিংসতা এবং ২৫টি শিশু হত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশের নিরাপত্তা সংকটে থাকার চিত্র তুলে ধরে।

আইনি পদক্ষেপের ক্ষেত্রে, মোট ৩৫টি ঘটনার মধ্যে ২৮টি ঘটনায় মামলা দায়ের করা সম্ভব হলেও, ৫টি ঘটনার ক্ষেত্রে মামলা সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। আসক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই তথ্যগুলো নির্দেশ করে যে সমাজে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তাব্যবস্থা এখনও চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিচারহীনতা বা লোকলজ্জার ভয়ে অনেক তথ্য অগোচরেই থেকে যাচ্ছে, যা প্রকৃত চিত্রকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।