ঢাকা ১১:১৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

জোটের রাজনীতিতে ভোটের হিসাব: কমিশনের পরিসংখ্যানে কতটা স্পষ্ট চিত্র?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:১৯:৪২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতিতে জোটবদ্ধ নির্বাচন একটি চিরাচরিত কৌশল। সংসদীয় গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন এবং কাঙ্ক্ষিত প্রার্থীর জয় নিশ্চিত করতে বড় দলগুলো যেমন জোটের পথে হাঁটে, তেমনি ছোট দলগুলোর জন্যও এটি একটি সহজ পথ। এটি একদিকে যেমন বড় দলগুলোর জন্য সহজ জয় নিশ্চিত করে, তেমনি ছোট দলগুলোকে রাজনৈতিক মূল স্রোতে টিকে থাকার সুযোগ করে দেয়। তবে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর জোটের ভোটের হিসাব এবং নির্বাচন কমিশনের দেওয়া পরিসংখ্যান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে জোটের কৌশল নতুন নয়। অতীতেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোটের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপরীতে বিএনপি-জামায়াতসহ চারদলীয় জোটের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়। সেই নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২৫২টি আসনে লড়ে ১৯৩টি আসন ও প্রদত্ত ভোটের ৪০.৯৭ শতাংশ পায়। তাদের জোটসঙ্গী জামায়াত, নাজিউর রহমান মঞ্জুর জাতীয় পার্টি ও ইসলামী ঐক্যজোট ৪৮টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ২৩টি আসন এবং ৬.০৮ শতাংশ ভোট লাভ করে। সম্মিলিতভাবে চারদলীয় জোট ৩০০ আসনের মধ্যে ২১৬টি আসন এবং ৪৭.০৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে মাত্র ৬২টি আসন ও ৪০.১৩ শতাংশ ভোট পেয়েছিল।

একইভাবে, ওয়ান-ইলেভেনের পরের ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে রেকর্ড ৮৬.২৯ শতাংশ ভোট পড়েছিল। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসন এবং ৪৮.১৩ শতাংশ ভোট পেয়ে ভূমিধস জয় লাভ করে। বিপরীতে, বিএনপি মাত্র ৩০টি আসন ও ৩২.৪৯ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। চারদলীয় জোটের শরিক হিসেবে ৩৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জামায়াতে ইসলামী মাত্র দুটি আসনে জয়লাভ করে এবং ৪.৬০ শতাংশ ভোট পায়, যা দলটির জন্য ছিল একটি বড় ভরাডুবি।

তবে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে জোটের রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ দেখা যায়। দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী বিএনপি ও জামায়াত এই নির্বাচনে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে নামে। পরবর্তীতে অভ্যুত্থানের অন্যতম অংশীদার জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন করে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় পাওয়া বিএনপি ৪৯.৯৭ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামী ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। ২৯৯ আসনের এই নির্বাচনে ৬০টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ৫০টি দল অংশ নেয়। ইসি জানায়, বিএনপি ২০৯টি আসন, জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন, এনসিপি ছয়টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি, গণ অধিকার পরিষদ একটি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ও খেলাফত মজলিস একটি করে আসন পেয়েছে। জাতীয় পার্টিসহ ৪১টি দল কোনো আসন পায়নি। অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এনসিপি ৩.৫ শতাংশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২.৯ শতাংশ এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২.৭০ শতাংশ ভোট পেয়েছে।

কিন্তু এই পরিসংখ্যান প্রকাশের পর জোটের রাজনীতিতে ভোটের হিসাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিএনপি ৪৯.৯৭ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামী ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট পেলে বাকি ১৮.২৭ শতাংশ ভোট অন্যান্য ৪৮টি দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পেয়েছেন। প্রশ্ন হলো, নির্বাচন কমিশন এই যে শতকরা হিসাবের সমীকরণ মেলাচ্ছে, তা কি ভোটের আসল চিত্র প্রকাশ করছে? জোটবদ্ধ নির্বাচনে, বিশেষ করে একই প্রতীকে (যেমন ধানের শীষ) একাধিক দল যখন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, তখন সেই প্রতীকে প্রদত্ত সব ভোট কি কেবল বিএনপির সমর্থক ভোট হিসেবে গণ্য করা যায়? একইভাবে, দাঁড়িপাল্লা বা শাপলা কলি প্রতীকে জয়ী প্রার্থীরা কি কেবল তাদের নিজ দলের সমর্থন পেয়েছেন?

পর্যবেক্ষকদের মতে, জোটের রাজনীতিতে একক দলের ভোটের হিসাব প্রকাশ করা অনেক সময় বিভ্রান্তিকর হতে পারে। পত্রিকার পাতায় আমরা যে ভোটের হিসাব দেখতে পাই, তা আলাদা আলাদা দলের প্রকৃত ভোটের হিসাব নয়, বরং এর হিসাব হওয়া উচিত ছিল জোটভিত্তিক, অর্থাৎ জোটের বাইরের দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ভোট আলাদা করে দেখানো। এতে ভোটারদের প্রকৃত সমর্থন এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের একটি স্বচ্ছ চিত্র পাওয়া যেত, যা বর্তমান পদ্ধতিতে অনেকটাই অস্পষ্ট থেকে যাচ্ছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

চোর আটক ঘিরে রণক্ষেত্র রায়পুর: পুলিশ-জনতা সংঘর্ষে আহত ২০, সড়ক অবরোধে ভোগান্তি

জোটের রাজনীতিতে ভোটের হিসাব: কমিশনের পরিসংখ্যানে কতটা স্পষ্ট চিত্র?

আপডেট সময় : ০৯:১৯:৪২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতিতে জোটবদ্ধ নির্বাচন একটি চিরাচরিত কৌশল। সংসদীয় গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন এবং কাঙ্ক্ষিত প্রার্থীর জয় নিশ্চিত করতে বড় দলগুলো যেমন জোটের পথে হাঁটে, তেমনি ছোট দলগুলোর জন্যও এটি একটি সহজ পথ। এটি একদিকে যেমন বড় দলগুলোর জন্য সহজ জয় নিশ্চিত করে, তেমনি ছোট দলগুলোকে রাজনৈতিক মূল স্রোতে টিকে থাকার সুযোগ করে দেয়। তবে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর জোটের ভোটের হিসাব এবং নির্বাচন কমিশনের দেওয়া পরিসংখ্যান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে জোটের কৌশল নতুন নয়। অতীতেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোটের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপরীতে বিএনপি-জামায়াতসহ চারদলীয় জোটের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়। সেই নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২৫২টি আসনে লড়ে ১৯৩টি আসন ও প্রদত্ত ভোটের ৪০.৯৭ শতাংশ পায়। তাদের জোটসঙ্গী জামায়াত, নাজিউর রহমান মঞ্জুর জাতীয় পার্টি ও ইসলামী ঐক্যজোট ৪৮টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ২৩টি আসন এবং ৬.০৮ শতাংশ ভোট লাভ করে। সম্মিলিতভাবে চারদলীয় জোট ৩০০ আসনের মধ্যে ২১৬টি আসন এবং ৪৭.০৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে মাত্র ৬২টি আসন ও ৪০.১৩ শতাংশ ভোট পেয়েছিল।

একইভাবে, ওয়ান-ইলেভেনের পরের ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে রেকর্ড ৮৬.২৯ শতাংশ ভোট পড়েছিল। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসন এবং ৪৮.১৩ শতাংশ ভোট পেয়ে ভূমিধস জয় লাভ করে। বিপরীতে, বিএনপি মাত্র ৩০টি আসন ও ৩২.৪৯ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। চারদলীয় জোটের শরিক হিসেবে ৩৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জামায়াতে ইসলামী মাত্র দুটি আসনে জয়লাভ করে এবং ৪.৬০ শতাংশ ভোট পায়, যা দলটির জন্য ছিল একটি বড় ভরাডুবি।

তবে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে জোটের রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ দেখা যায়। দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী বিএনপি ও জামায়াত এই নির্বাচনে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে নামে। পরবর্তীতে অভ্যুত্থানের অন্যতম অংশীদার জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন করে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় পাওয়া বিএনপি ৪৯.৯৭ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামী ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। ২৯৯ আসনের এই নির্বাচনে ৬০টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ৫০টি দল অংশ নেয়। ইসি জানায়, বিএনপি ২০৯টি আসন, জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন, এনসিপি ছয়টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি, গণ অধিকার পরিষদ একটি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ও খেলাফত মজলিস একটি করে আসন পেয়েছে। জাতীয় পার্টিসহ ৪১টি দল কোনো আসন পায়নি। অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এনসিপি ৩.৫ শতাংশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২.৯ শতাংশ এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২.৭০ শতাংশ ভোট পেয়েছে।

কিন্তু এই পরিসংখ্যান প্রকাশের পর জোটের রাজনীতিতে ভোটের হিসাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিএনপি ৪৯.৯৭ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামী ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট পেলে বাকি ১৮.২৭ শতাংশ ভোট অন্যান্য ৪৮টি দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পেয়েছেন। প্রশ্ন হলো, নির্বাচন কমিশন এই যে শতকরা হিসাবের সমীকরণ মেলাচ্ছে, তা কি ভোটের আসল চিত্র প্রকাশ করছে? জোটবদ্ধ নির্বাচনে, বিশেষ করে একই প্রতীকে (যেমন ধানের শীষ) একাধিক দল যখন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, তখন সেই প্রতীকে প্রদত্ত সব ভোট কি কেবল বিএনপির সমর্থক ভোট হিসেবে গণ্য করা যায়? একইভাবে, দাঁড়িপাল্লা বা শাপলা কলি প্রতীকে জয়ী প্রার্থীরা কি কেবল তাদের নিজ দলের সমর্থন পেয়েছেন?

পর্যবেক্ষকদের মতে, জোটের রাজনীতিতে একক দলের ভোটের হিসাব প্রকাশ করা অনেক সময় বিভ্রান্তিকর হতে পারে। পত্রিকার পাতায় আমরা যে ভোটের হিসাব দেখতে পাই, তা আলাদা আলাদা দলের প্রকৃত ভোটের হিসাব নয়, বরং এর হিসাব হওয়া উচিত ছিল জোটভিত্তিক, অর্থাৎ জোটের বাইরের দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ভোট আলাদা করে দেখানো। এতে ভোটারদের প্রকৃত সমর্থন এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের একটি স্বচ্ছ চিত্র পাওয়া যেত, যা বর্তমান পদ্ধতিতে অনেকটাই অস্পষ্ট থেকে যাচ্ছে।