২০২৪ সালের জুলাই মাস বাংলাদেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায় রচনা করেছে, যা কেবল একটি রাজনৈতিক পালাবদল নয়, বরং দেশবাসীর দীর্ঘদিনের আশা-আকাঙ্ক্ষার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। এই বিপ্লব বাংলাদেশের বিবর্তনের পথে এক অনস্বীকার্য মাইলফলক, যা ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর সঙ্গে তুলনীয়।
দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হয়েছিল। দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের পর ১৯৭১ সালে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। কিন্তু স্বাধীনতার পর পরবর্তী দশকগুলোতে, বিশেষত শেখ হাসিনার শাসনামলে, বাংলাদেশ এক ধরনের বৈদেশিক আধিপত্যের শিকার হয় বলে অনেকেই মনে করেন। দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসন জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে।
এই প্রেক্ষাপটে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এক নতুন মাত্রা লাভ করে। আবু সাঈদ নামে এক শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে, যা দ্রুতই এক গণআন্দোলনে রূপ নেয়। এই গণঅভ্যুত্থানের মুখে সরকার পতন হয় এবং শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন।
পরবর্তীতে, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই সরকার সংস্কার, বিচার এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের এজেন্ডা নিয়ে কাজ শুরু করে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ‘জুলাই সনদ’ নামে পরিচিত একটি জাতীয় ঐকমত্যের দলিল প্রণীত হয়, যা দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো কর্তৃক স্বাক্ষরিত হয়। অবশেষে, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি বিপুল ভোটে জয়লাভ করে এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ বিরোধী দলে পরিণত হয়।
নতুন সরকার অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কিছু প্রাথমিক পদক্ষেপ, যেমন অপ্রয়োজনীয় প্রটোকল পরিহার এবং সাধারণ জীবনযাপন, দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের সংসদীয় গণতন্ত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা নতুন সরকারের নীতি নির্ধারণে সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়।
তবে, মন্ত্রিসভার কিছু সদস্যের ‘জুলাই সনদ’ এবং ‘জুলাই বিপ্লবের’ চেতনা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর মন্তব্য নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করছে। জুলাই বিপ্লবের তাৎপর্যকে উপেক্ষা করা হলে তা জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি অবহেলা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ, এই বিপ্লবের ফলেই বর্তমান সরকারের আবির্ভাব সম্ভব হয়েছে। জুলাইয়ের চেতনাকে সমুন্নত রাখা প্রজ্ঞার পরিচায়ক।
দেশের জনগণ ‘জুলাই সনদের’ দ্রুত বাস্তবায়ন দেখতে চায়। এর অন্যথা হলে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে, যা কেউই কাম্য করে না। বাংলাদেশীরা আবেগপ্রবণ এবং প্রয়োজনে তারা যেকোনো সময় তাদের কণ্ঠস্বর উঁচু করতে পারে। তাই সরকারের উচিত কথার চেয়ে কাজে বিশ্বাস স্থাপন করা।
বর্তমান সরকার যদি জনগণের এই মানসিক পরিবর্তন অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়, তবে তা ভুল হবে এবং ‘জুলাই বিপ্লবের’ সমর্থকদের প্রতিরোধের মুখে পড়তে পারে। জাতীয় ঐক্য ছাড়া টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়, যা প্রধানমন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছেন। গত ৫৫ বছরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল নিজেদের স্বার্থে বিভাজন সৃষ্টি করে জাতির স্বার্থের পরিপন্থী কাজ করেছে।
যদি সরকার ‘জুলাই বিপ্লবকে’ যথাযথ গুরুত্ব না দেয়, তবে সমাজে বিভেদ সৃষ্টি হতে পারে। অনেকেই এই বিপ্লবকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতা হিসেবে দেখছেন এবং এর সঙ্গে তাঁদের আবেগ জড়িত। যদি সরকার ‘জুলাই বিপ্লবের’ বীরদের সম্মান জানাতে এবং শহীদ ও ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করতে ব্যর্থ হয়, তবে সমাজে ‘জুলাইপন্থী’ ও ‘জুলাইবিরোধী’—এই দুই শিবিরের উদ্ভব হতে পারে, যা দেশকে আবারও অস্থিরতা ও বিভ্রান্তির দিকে ঠেলে দিতে পারে।
কেউই এমন পরিস্থিতি চায় না, যা অতীতের গণতন্ত্র ও বহিরাগত আধিপত্যের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনে। সাম্প্রতিক পরিবর্তনকে কোনো রাজনৈতিক দলই উপেক্ষা করতে পারবে না। ২০২৪ সালের ‘জুলাই বিপ্লবের’ মাধ্যমে যে পরিবর্তন এসেছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই দেশকে এগিয়ে যেতে হবে। ইতিহাস সৃষ্টি করা যায়, কিন্তু তা মুছে ফেলা যায় না।
রিপোর্টারের নাম 

























