ঢাকা ১১:০৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু: ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার তীব্র জবাব তেহরানের

মধ্যপ্রাচ্যে এক সর্বাত্মক যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। সুইজারল্যান্ডে পরমাণু আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার মাত্র একদিন পর গত শনিবার ইরানের রাজধানী তেহরানসহ অন্তত ২৪টি শহরে ভয়াবহ যৌথ হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর তীব্র পাল্টা জবাব দিয়েছে তেহরানও, ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ড এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে দেশটি। এই ভয়াবহ সংঘাতে ইরানে দুই শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে যুদ্ধের কালো মেঘ।

ইরানের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে চালানো এই হামলায় ভয়াবহ প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, হামলায় অন্তত ২০১ জন নিহত এবং ৭৪৭ জন আহত হয়েছেন। দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলায় অন্তত ৮৫ জন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

পাল্টা আক্রমণে ইরানও ইসরায়েলের একাধিক শহরে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। তেলআবিব, জেরুজালেম ও হাইফায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া ইরাক, সিরিয়া, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সৌদি আরব, জর্ডান এবং ওমানে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ইসরায়েল জানিয়েছে, তাদের ৮৯ জন নাগরিক সামান্য আহত হয়েছেন। সিরিয়ায় চারজন এবং ইরাকে দুজন নিহত হয়েছেন।

যৌথ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, আমেরিকান জনগণকে রক্ষায় এই অভিযান চালানো হয়েছে। তিনি এটিকে ‘বড় ধরনের যুদ্ধ অভিযান’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ইরানি শাসকগোষ্ঠীর হুমকি দূর করে আমেরিকানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য। একই সুরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, অস্তিত্বের হুমকি মোকাবিলায় ইরানের ওপর হামলা চালানো হয়েছে।

এই সংঘাতের জেরে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ঢাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী সব ফ্লাইটও স্থগিত করা হয়েছে। বিশ্ব জ্বালানি তেলের প্রধান সরবরাহ রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান, যা বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি করেছে। এছাড়া, ইরানে ইন্টারনেট ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।

যদিও ইসরায়েল দাবি করেছে, তাদের হামলায় ইরানের বেশ কয়েকজন সিনিয়র ব্যক্তি নিহত হয়েছেন এবং সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে, তবে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নিরাপদ আছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ২০০টিরও বেশি বিমান ব্যবহার করে ৫০০টি ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে, যা তাদের পরিচালিত সবচেয়ে বড় বিমান হামলা।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এই সংঘাত অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স, তুরস্ক, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ওমান, রাশিয়া, বেলজিয়াম, নরওয়ে, পাকিস্তান, স্পেন এবং ভেনিজুয়েলা উভয় পক্ষকে সংযত হওয়ার এবং আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার অনুরোধ জানিয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র দিমিত্রি মেদভেদেভ যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, কথিত শান্তিপ্রতিষ্ঠাকারী আবার তার আসল রূপ দেখাল।

অন্যদিকে, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং সৌদি আরব তাদের ভূখণ্ডে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। এসব দেশ এটিকে সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং তাদের নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আক্রমণ হিসেবে উল্লেখ করে পাল্টা জবাব দেওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করার কথা জানিয়েছে।

ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠী কাতায়িব হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী এই সংঘাতে ইরানের পক্ষে লড়াইয়ে যোগ দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। তারা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার কথা ঘোষণা করেছে।

এদিকে, লেবাননেও ইসরায়েল হিজবুল্লাহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অবকাঠামোতে হামলা জোরদার করেছে। হিজবুল্লাহ ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও এই সংঘাতে তারা সরাসরি যুক্ত হবে কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু: ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার তীব্র জবাব তেহরানের

আপডেট সময় : ০৯:০০:২৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে এক সর্বাত্মক যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। সুইজারল্যান্ডে পরমাণু আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার মাত্র একদিন পর গত শনিবার ইরানের রাজধানী তেহরানসহ অন্তত ২৪টি শহরে ভয়াবহ যৌথ হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর তীব্র পাল্টা জবাব দিয়েছে তেহরানও, ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ড এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে দেশটি। এই ভয়াবহ সংঘাতে ইরানে দুই শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে যুদ্ধের কালো মেঘ।

ইরানের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে চালানো এই হামলায় ভয়াবহ প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, হামলায় অন্তত ২০১ জন নিহত এবং ৭৪৭ জন আহত হয়েছেন। দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলায় অন্তত ৮৫ জন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

পাল্টা আক্রমণে ইরানও ইসরায়েলের একাধিক শহরে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। তেলআবিব, জেরুজালেম ও হাইফায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া ইরাক, সিরিয়া, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সৌদি আরব, জর্ডান এবং ওমানে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ইসরায়েল জানিয়েছে, তাদের ৮৯ জন নাগরিক সামান্য আহত হয়েছেন। সিরিয়ায় চারজন এবং ইরাকে দুজন নিহত হয়েছেন।

যৌথ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, আমেরিকান জনগণকে রক্ষায় এই অভিযান চালানো হয়েছে। তিনি এটিকে ‘বড় ধরনের যুদ্ধ অভিযান’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ইরানি শাসকগোষ্ঠীর হুমকি দূর করে আমেরিকানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য। একই সুরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, অস্তিত্বের হুমকি মোকাবিলায় ইরানের ওপর হামলা চালানো হয়েছে।

এই সংঘাতের জেরে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ঢাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী সব ফ্লাইটও স্থগিত করা হয়েছে। বিশ্ব জ্বালানি তেলের প্রধান সরবরাহ রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান, যা বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি করেছে। এছাড়া, ইরানে ইন্টারনেট ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।

যদিও ইসরায়েল দাবি করেছে, তাদের হামলায় ইরানের বেশ কয়েকজন সিনিয়র ব্যক্তি নিহত হয়েছেন এবং সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে, তবে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নিরাপদ আছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ২০০টিরও বেশি বিমান ব্যবহার করে ৫০০টি ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে, যা তাদের পরিচালিত সবচেয়ে বড় বিমান হামলা।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এই সংঘাত অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স, তুরস্ক, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ওমান, রাশিয়া, বেলজিয়াম, নরওয়ে, পাকিস্তান, স্পেন এবং ভেনিজুয়েলা উভয় পক্ষকে সংযত হওয়ার এবং আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার অনুরোধ জানিয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র দিমিত্রি মেদভেদেভ যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, কথিত শান্তিপ্রতিষ্ঠাকারী আবার তার আসল রূপ দেখাল।

অন্যদিকে, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং সৌদি আরব তাদের ভূখণ্ডে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। এসব দেশ এটিকে সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং তাদের নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আক্রমণ হিসেবে উল্লেখ করে পাল্টা জবাব দেওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করার কথা জানিয়েছে।

ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠী কাতায়িব হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী এই সংঘাতে ইরানের পক্ষে লড়াইয়ে যোগ দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। তারা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার কথা ঘোষণা করেছে।

এদিকে, লেবাননেও ইসরায়েল হিজবুল্লাহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অবকাঠামোতে হামলা জোরদার করেছে। হিজবুল্লাহ ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও এই সংঘাতে তারা সরাসরি যুক্ত হবে কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয়।