রাজনীতির ময়দানে শব্দের ব্যবহার একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। একজন দায়িত্বশীল রাজনীতিকের একটি সুচিন্তিত বক্তব্য যেমন জনমনে আশার সঞ্চার করতে পারে, তেমনি একটি অসতর্ক বা ‘বেফাঁস’ মন্তব্য কেবল ব্যক্তিকেই নয়, বরং পুরো দল ও সরকারকে চরম বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিতে পারে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, ক্ষমতার মদমত্ততায় বা পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করতে না পেরে অনেক প্রভাবশালী নেতা এমন সব মন্তব্য করেছেন, যা পরবর্তীতে তাদের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে, যেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমগুলো মুহূর্তের মধ্যে যেকোনো বক্তব্যকে বিশ্লেষণ ও প্রচার করতে সক্ষম, সেখানে শব্দচয়নে সামান্যতম ভুলও বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
সম্প্রতি সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায়ের দুজন মন্ত্রীর কিছু মন্তব্য জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। শপথ গ্রহণের অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের এমন অনাহূত বক্তব্য নতুন প্রশাসনকে এক ধরনের অস্বস্তিতে ফেলেছে। যদিও সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এ নিয়ে সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়নি, তবে জনমানসে এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইতিহাসের শিক্ষা বলে যে, যখনই কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব জনআবেগের বাইরে গিয়ে কোনো ঢালাও মন্তব্য করেন, তখন সমাজ ও রাজনীতিতে তার সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বেফাঁস মন্তব্যের কারণে রাজনৈতিক পতনের উদাহরণ আমাদের ইতিহাসে বিরল নয়। সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জুলাই আন্দোলনের সময়কার একটি মন্তব্য এর বড় প্রমাণ। কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালীন সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীদের ইঙ্গিত করে করা তার একটি বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য পরিস্থিতিকে অগ্নিগর্ভ করে তুলেছিল। সেই একটি উক্তিই মূলত আন্দোলনকারীদের চূড়ান্ত ক্ষোভের মুখে ঠেলে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত তার সরকারের পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে গণ্য হয়। একইভাবে অতীতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ‘ইউরেনিয়াম’ ঢেলে দেওয়ার হুমকি কিংবা শেখ মুজিবুর রহমানের পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে সিরাজ শিকদারকে নিয়ে করা মন্তব্যগুলোও তৎকালীন সময়ে বিবেকবান মানুষকে স্তম্ভিত করেছিল।
কেবল আওয়ামী লীগ নয়, বিএনপির শাসনামলেও এমন নজির রয়েছে। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেনের ‘আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে’—এমন একটি সাধারণ ধর্মীয় বিশ্বাসপ্রসূত মন্তব্যও মিডিয়ার উপস্থাপনায় রাজনৈতিকভাবে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল, যা আজও তাকে বিব্রত করে। এমনকি ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ‘উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’—এই একটি একগুঁয়ে মন্তব্যই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলনের দাবানল জ্বালিয়ে দিয়েছিল, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে একজন মন্ত্রীর ‘চাঁদাবাজি’ ও ‘সমঝোতা’ বিষয়ক মন্তব্যটি অত্যন্ত বিতর্কিত। তার মতে, সমঝোতার মাধ্যমে নেওয়া টাকা চাঁদাবাজি নয়। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, যেখানে এক পক্ষ প্রবল শক্তিশালী এবং অন্য পক্ষ দুর্বল, সেখানে সমঝোতা বলতে কিছু থাকে না; বরং তা হয় ভয়ভীতির মুখে নতি স্বীকার। পরিবহন খাত বা ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেওয়া টাকাকে সমঝোতা বলে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা মূলত অপরাধকেই প্রশ্রয় দেওয়ার শামিল।
অন্যদিকে, আরেকজন মন্ত্রীর ‘ইনকিলাব’ শব্দ নিয়ে আপত্তি তোলা এবং একে বাংলা ভাষার পরিপন্থী হিসেবে তুলে ধরাটাও তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল। বাংলা ভাষা একটি সমৃদ্ধ ও সংকর ভাষা, যেখানে আরবি, ফারসি, ইংরেজি ও সংস্কৃত শব্দের অবাধ মিশেল রয়েছে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্ম থেকে শুরু করে প্রাত্যহিক জীবনের বহু শব্দই বিদেশি উৎস থেকে আসা। এমনকি ‘আওয়ামী লীগ’ নামটির মধ্যেও আরবি ও ইংরেজি শব্দের সমন্বয় রয়েছে। ফলে ভাষাগত সংকীর্ণতা দিয়ে রাজনৈতিক স্লোগানকে বিচার করাটা ঐতিহাসিক ও ভাষাতাত্ত্বিক—উভয় দিক থেকেই অযৌক্তিক।
পরিশেষে বলা যায়, গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ব্যক্তিদের উচিত পরিবেশ ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে কথা বলা। জনআবেগ ও বাস্তবতাকে অস্বীকার করে দেওয়া যেকোনো বক্তব্য হিতে বিপরীত হতে পারে। ইতিহাসের এই শিক্ষাগুলো যদি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজনীতিকরা ধারণ না করেন, তবে জনবিচ্ছিন্নতা ও রাজনৈতিক বিপর্যয় এড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে। শব্দের ধার তলোয়ারের চেয়েও বেশি, আর রাজনীতির মঞ্চে এই ধারের অপব্যবহার কখনোই শুভ ফল বয়ে আনে না।
রিপোর্টারের নাম 

























