ঢাকা ০১:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

শিক্ষার্থী নিপীড়ন ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ: চবি শিক্ষক রোমানের বেতন স্থগিত, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় প্রশাসন

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:০৩:১৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ রোমানের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী নির্যাতন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দমন-পীড়নকে সমর্থন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ওই শিক্ষকের বেতন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। বর্তমানে একটি উচ্চতর তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, যার ওপর ভিত্তি করে তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান চলাকালে শিক্ষার্থীদের ওপর সংঘটিত গণহত্যার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগে হাসান মোহাম্মদ রোমানকে ক্যাম্পাসে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করেন আইন বিভাগের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এমনকি গত আগস্ট মাসে তার কুশপুত্তলিকাও দাহ করা হয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সহকারী প্রক্টরের দায়িত্ব পালনকালে তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক তকমা দিয়ে হয়রানি ও শারীরিক-মানসিক নির্যাতন করতেন।

নির্যাতনের একটি সুনির্দিষ্ট ঘটনায় জানা যায়, ২০২২ সালের আগস্ট মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের চক্রাকার বাসের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী জুবায়ের হোসেন সোহাগকে আটক করে প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে যান রোমান। সেখানে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদের পর সোহাগকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি সাজানো মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। ওই মামলায় সোহাগকে তিন মাস কারাভোগ করতে হয়েছিল। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, রোমান ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে শিক্ষার্থীদের ‘শিবির’ ট্যাগ দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করতেন এবং ছাত্রলীগের ক্যাডারদের ব্যবহার করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হুমকি দিতেন।

এছাড়া তার বিরুদ্ধে আরও কিছু চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। সংবাদ সম্মেলনে তারা দাবি করেন, এই শিক্ষক নিজ বাসভবনে মাদকের আসর বসাতেন এবং নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করতেন। ক্লাসরুমে নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে মানহানিকর আচরণ করা এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে ক্যাম্পাসে অস্থিরতা তৈরির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তাছলিম উদ্দীনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি প্রাথমিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় হাসান মোহাম্মদ রোমানের বেতন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বর্তমানে ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের পরিচালক অধ্যাপক ড. আকতার হোসেনের নেতৃত্বে দ্বিতীয় একটি তদন্ত কমিটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত পরিচালনা করছে।

তদন্ত কমিটির প্রধান অধ্যাপক ড. আকতার হোসেন জানান, বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় তারা প্রতিটি তথ্য ও প্রমাণ নিবিড়ভাবে যাচাই করছেন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন জানান, শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে আসা অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। একটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে তার বেতন বন্ধ করা হয়েছে। দ্বিতীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন হাতে পেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ রোমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। এর আগে শিক্ষার্থীদের হাতে আটক হওয়ার সময় তিনি তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ফেনী জেনারেল হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে রান্নার দায়ে দুই নার্স বরখাস্ত

শিক্ষার্থী নিপীড়ন ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ: চবি শিক্ষক রোমানের বেতন স্থগিত, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় প্রশাসন

আপডেট সময় : ১০:০৩:১৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ রোমানের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী নির্যাতন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দমন-পীড়নকে সমর্থন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ওই শিক্ষকের বেতন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। বর্তমানে একটি উচ্চতর তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, যার ওপর ভিত্তি করে তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান চলাকালে শিক্ষার্থীদের ওপর সংঘটিত গণহত্যার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগে হাসান মোহাম্মদ রোমানকে ক্যাম্পাসে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করেন আইন বিভাগের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এমনকি গত আগস্ট মাসে তার কুশপুত্তলিকাও দাহ করা হয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সহকারী প্রক্টরের দায়িত্ব পালনকালে তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক তকমা দিয়ে হয়রানি ও শারীরিক-মানসিক নির্যাতন করতেন।

নির্যাতনের একটি সুনির্দিষ্ট ঘটনায় জানা যায়, ২০২২ সালের আগস্ট মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের চক্রাকার বাসের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী জুবায়ের হোসেন সোহাগকে আটক করে প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে যান রোমান। সেখানে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদের পর সোহাগকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি সাজানো মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। ওই মামলায় সোহাগকে তিন মাস কারাভোগ করতে হয়েছিল। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, রোমান ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে শিক্ষার্থীদের ‘শিবির’ ট্যাগ দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করতেন এবং ছাত্রলীগের ক্যাডারদের ব্যবহার করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হুমকি দিতেন।

এছাড়া তার বিরুদ্ধে আরও কিছু চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। সংবাদ সম্মেলনে তারা দাবি করেন, এই শিক্ষক নিজ বাসভবনে মাদকের আসর বসাতেন এবং নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করতেন। ক্লাসরুমে নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে মানহানিকর আচরণ করা এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে ক্যাম্পাসে অস্থিরতা তৈরির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তাছলিম উদ্দীনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি প্রাথমিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় হাসান মোহাম্মদ রোমানের বেতন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বর্তমানে ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের পরিচালক অধ্যাপক ড. আকতার হোসেনের নেতৃত্বে দ্বিতীয় একটি তদন্ত কমিটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত পরিচালনা করছে।

তদন্ত কমিটির প্রধান অধ্যাপক ড. আকতার হোসেন জানান, বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় তারা প্রতিটি তথ্য ও প্রমাণ নিবিড়ভাবে যাচাই করছেন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন জানান, শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে আসা অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। একটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে তার বেতন বন্ধ করা হয়েছে। দ্বিতীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন হাতে পেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ রোমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। এর আগে শিক্ষার্থীদের হাতে আটক হওয়ার সময় তিনি তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।