ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এখন এক দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং মুদ্রার ব্যাপক মান হ্রাসের প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই আন্দোলন বর্তমানে দেশের প্রায় প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন-পীড়ন, টিয়ার গ্যাস ও ছররা গুলি উপেক্ষা করেও হাজারো মানুষ রাজপথে নেমে এসেছেন, যাদের কণ্ঠে এখন কেবল একটিই স্লোগান—মুক্তি ও পরিবর্তন।
মাশহাদ শহরের রাস্তায় এমনই এক বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন মাজিদ (ছদ্মনাম)। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি জানান, পুলিশি নির্যাতন সত্ত্বেও বিক্ষোভকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে আবারও জড়ো হচ্ছেন এবং ভোররাত পর্যন্ত স্লোগান দিচ্ছেন। মাজিদের মতো আরও অনেক বিক্ষোভকারী জানেন, রাস্তায় নামলে হয়তো জীবনের ঝুঁকি আছে, তবুও তারা একটি সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য লড়ছেন। এই বিক্ষোভের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর ব্যাপকতা ও অংশগ্রহণকারীদের বৈচিত্র্য। ২০২২-২৩ সালের মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হওয়া বিক্ষোভের চেয়ে এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। ৫০ বছর বয়সী নারী থেকে শুরু করে রাস্তার আবর্জনা সংগ্রাহক পর্যন্ত, তরুণ-বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্লোগান দিচ্ছেন।
বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবি, বছরের পর বছর ধরে চলা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সম্প্রতি ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের প্রভাবে ইরানের অর্থনীতি এখন খাদের কিনারায়। মোবাইল দোকানদার মাজিদের মতে, এটি সরকারের বিরুদ্ধে তাদের শেষ লড়াই। পশ্চিম ইরানের কেরমানশাহ শহরের ৪৩ বছর বয়সী এক ব্যবসায়ীও ধর্মঘটে যোগ দিয়ে বলেন, মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে, মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে পেরে ওঠা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর জন্য বর্তমান শাসকগোষ্ঠীকেই দায়ী করছেন তারা।
নরওয়েভিত্তিক এনজিও ইরান হিউম্যান রাইটস-এর তথ্যমতে, নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে এখন পর্যন্ত ৪৫ জন নিহত হয়েছেন। যদিও সরকারি হিসাবে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ নিহতের সংখ্যা ২১ বলে জানানো হয়েছে। বিক্ষোভ দমনে সরকার দেশের বড় অংশে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট জারি করেছে, ফলে বাইরের বিশ্বে বিক্ষোভের চিত্র পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে। এমনকি যে ফুটেজগুলো বাইরে আসছে, সেগুলোতে বিক্ষোভকারীদের পরিচয় গোপন রাখতে ছবি ব্লার করা হচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দেশে বাড়তে থাকা বিক্ষোভ আন্দোলনকে উসকে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, তারা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকে বিভেদমূলক ও সহিংস করে তোলার চেষ্টা করছে। এর আগে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও বিক্ষোভকারীদের সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে কাজ করার অভিযোগ এনেছিলেন এবং বলেছিলেন, ইরান বিদেশিদের চর বা ভাড়াটেদের এমন কর্মকাণ্ড সহ্য করবে না।
তবে বিক্ষোভকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, শাসনব্যবস্থার পতন ছাড়া অন্য কিছুতে তারা সন্তুষ্ট নন। তেহরানের এক নারী বাসিন্দা জানান, তারা রাতের বেলা জানালা দিয়ে স্লোগান দিচ্ছেন, যেমনটা ২০২২ সালের ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনে করতেন। তার মতে, অসন্তোষের মাত্রা এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। তিনি বলেন, বিপ্লবের পর গত ৪৭ বছর ধরে বেঁচে থাকাটাই তাদের জন্য এক বড় সংগ্রাম হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু তারা স্বাধীনতার জন্য লড়াই চালিয়ে যাবেন। কুর্দিস্তান প্রদেশের সাক্কেজ শহরের এক ব্যবসায়ীও একই প্রতিধ্বনি করে বলেন, আগামী দিনগুলোতে কুর্দি শহরগুলোতে বিক্ষোভের ঢেউ আরও তীব্র ও ব্যাপক হবে।
এই চরম অনিশ্চয়তা ও দমন-পীড়নের মধ্যেও একবুক আশা নিয়ে ইরানের সাধারণ মানুষ একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের অপেক্ষায় রাজপথে অটল। এই সংগ্রাম কতদিন চলবে, বা এর পরিণতি কী হবে, তা বলা কঠিন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, ইরানি জনগণ এখন আমূল পরিবর্তন চায় এবং সে লক্ষ্যেই তারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে লড়ছে।
রিপোর্টারের নাম 






















