ভেনেজুয়েলায় মার্কিন বাহিনীর নাটকীয় অভিযান এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের ঘটনা ইরানকে এক নতুন উদ্বেগের মুখে ঠেলে দিয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে চলা অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ ও গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে তেহরান এখন যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপের এক অস্বস্তিকর আশঙ্কায় ভুগছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, গত সপ্তাহে ইরানের মুদ্রার রেকর্ড দরপতনের প্রতিবাদে দোকানদাররা রাস্তায় নামলে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ৮৮টি শহরে ছড়িয়ে পড়া এসব বিক্ষোভে এ পর্যন্ত অন্তত ৩৪ জন নিহত হয়েছেন এবং ২ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ।
গত শনিবার প্রায় ৭ হাজার মাইল দূরে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে মার্কিন বাহিনীর এক দুঃসাহসিক অভিযানে প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রীকে নিজ শয়নকক্ষ থেকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে দ্বিতীয় দফায় কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
এয়ারফোর্স ওয়ানে থাকা অবস্থায় ট্রাম্প বলেন, “অতীতে তারা যেভাবে করেছে, এবারও যদি সেভাবে মানুষ হত্যা শুরু করে, তবে আমি মনে করি তারা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অত্যন্ত কঠোর আঘাতের সম্মুখীন হবে।” এরপর আরেকবার হুমকি দিয়ে তিনি বলেছেন, “ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে, তাহলে দেশটিকে নরক দেখতে হবে।”
ট্রাম্পের এই প্রকাশ্য হুঁশিয়ারিতে ইরানের নেতৃত্ব আরও ক্ষুব্ধ হয়ে বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বিক্ষোভকারীদের সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে কাজ করার অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, “দাঙ্গাকারীরা সরকারি সম্পত্তিতে হামলা চালাচ্ছে। ইরান কোনোভাবেই বিদেশিদের চর বা ভাড়াটেদের এমন কর্মকাণ্ড সহ্য করবে না।”
খামেনি ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে আরও বলেন, “গত রাতে তেহরানে একদল দাঙ্গাকারী রাষ্ট্রীয় ভবন ধ্বংস করেছে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মন জয় করতে।” তিনি ট্রাম্পকে নিজের দেশ সামলানোর পরামর্শও দিয়েছেন।
আমেরিকার চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানি বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। এতে তেহরানে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। এরপর থেকে ইরানি কর্মকর্তারা কিছু বিক্ষোভকারীকে ‘দাঙ্গাকারী’, ‘ভাড়াটে সন্ত্রাসী’ এবং ‘বিদেশি সংযোগযুক্ত উস্কানিদাতা’ হিসেবে নিন্দা জানিয়ে আসছেন। গত গ্রীষ্মে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর থেকেই দেশটি অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নেতানিয়াহুর সমর্থন ইরানে সন্দেহ ও আতঙ্ক আরও বাড়িয়েছে। এরই মধ্যে তেহরানে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হয়ে কাজ করার সন্দেহে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে ইরান।
জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওয়ালি নাসর সিএনএনকে বলেছেন, ইরান এখন মনে করছে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য দেশটির ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগ করা। অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ এবং বাইরের সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কায় ইরান এখন এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি।
ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক থিংক ট্যাংক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান প্রোগ্রামের পরিচালক অ্যালেক্স ভাটাঙ্কা রয়টার্সকে বলেন, “এটা শুধু রিয়ালের (ইরানি মুদ্রা) পতন নয়, বরং জনগণের আস্থারও ধ্বস।” তার মতে, রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাস দ্রুত নষ্ট হচ্ছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ, যেমন সিরিয়া, লিবিয়া এবং ইরাকে দীর্ঘদিনের শাসকরা কেবল বিক্ষোভ এবং সামরিক হস্তক্ষেপের সমন্বয়ের পরই পতনের মুখে পড়েছিলেন। ভাটাঙ্কা বলেন, “ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা বারবার বিক্ষোভ দমন-পীড়ন এবং কৌশলগত ছাড়ের মাধ্যমে দমিয়েছে। কিন্তু এই কৌশল এখন শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। এখন পরিবর্তন অনিবার্য বলে মনে হচ্ছে। শাসনব্যবস্থার পতন সম্ভব, তবে তা নিশ্চিত নয়।”
রিপোর্টারের নাম 






















