‘এলপিজির দাম হুঁ হুঁ করে বাড়ছে। এর মধ্যেই বাসার গ্যাস শেষ। শুক্রবার সারা দিন দোকানে ফোন করেও কোনও এলপিজি পাওয়া যায়নি। শনিবার দোকানি নিজেই ফোন করে বললেন, পাশের দোকান থেকে এনে দিতে পারবেন। কিন্তু সেজন্য আগেই সিলিন্ডারসহ অগ্রিম ২ হাজার ২০০ টাকা দিতে হবে। যাক বাবা, পাওয়া তো যাবে—এই ভেবে সিলিন্ডার আর অগ্রিম টাকা পাঠিয়ে দিলাম। এক ঘণ্টা যায়, দুই ঘণ্টা যায়—এলপিজি আসে না। রান্নার সময় হয়ে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে আবার ফোন করলে দোকানি জানালেন, পাশের দোকানদার এখন আরও ৩০০ টাকা চাইছেন। অর্থাৎ ২ হাজার ৫০০ টাকার নিচে দিতে রাজি নন। উপায় না দেখে আরও ৩০০ টাকা দিয়ে এলপিজি আনতে হলো।’
এভাবেই বাংলা ট্রিবিউনকে ১২ কেজির এক সিলিন্ডার তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) জোগাড়ের অভিজ্ঞতার কথা জানালেন রাজধানীর রামপুরার বাসিন্দা কাজী মিলি। তবে এই ভোগান্তি শুধু তার একার নয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলপিজির সংকট দেখিয়ে খুচরা ব্যবসায়ীরা গ্রাহকদের কার্যত জিম্মি করে বাড়তি দাম আদায় করছেন।
উত্তরার বাসিন্দা হাসিনা ইসলাম বলেন, তিনি দুই মাস পর পর ৩৫ কেজির একটি সিলিন্ডার কেনেন। জানুয়ারি মাসে এই সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছে ৩ হাজার ৮০৯ টাকা। কিন্তু এই মাসে তিনি সিলিন্ডারই পাচ্ছেন না। দোকানদার জানিয়েছেন গ্যাস নেই—বাড়তি দাম দিলে চেষ্টা করে দেখবেন।
মানিকদির বাসিন্দা অ্যাডভোকেট রানু আক্তার জানান, তার বাসায় পাইপলাইনের গ্যাস থাকলেও চুলা জ্বলে না। তাই বিকল্প হিসেবে এলপিজি ব্যবহার করেন। কিন্তু এখন সেই এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না। পেলেও দাম আকাশছোঁয়া। তিনি রবিবার ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনেছেন ২ হাজার টাকায়।
খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা মোহাম্মদ শাহেদ বলেন, ডিসেম্বরের ২৫ তারিখ তিনি সিলিন্ডার কিনেছিলেন ১ হাজার ৪০০ টাকায়। এখন সেই একই সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ২০০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। তার প্রশ্ন—এভাবে দাম বাড়ে কীভাবে?
গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, এলাকাভেদে এলপিজির দাম ভিন্ন ভিন্ন। শুধু বাড়তি দাম নয়, অনেক এলাকায় সিলিন্ডারই পাওয়া যাচ্ছে না। যেহেতু এলপিজি সিলিন্ডারে করে পরিবহন করা হয়, তাই মানুষ সাধারণত নিজ এলাকার দোকান থেকেই গ্যাস সংগ্রহ করে। সংকটের কথা বলে দাম নিয়ে দরকষাকষি করলে অনেক দোকানদারই জানিয়ে দেন এলপিজি নেই।
এলপিজির বাড়তি দামের সংকট কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, তা নিয়ে গত রবিবার (৪ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। বৈঠক শেষে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাজার নিয়ন্ত্রণে একে অপরের প্রতি অনুরোধ জানায় সরকার ও এলপিজি সরবরাহকারীরা। তবে একে অপরের ওপর দায়িত্ব চাপানো কতটা যৌক্তিক—তা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব উভয় পক্ষের হলেও কেউই কার্যকরভাবে তা করতে পারছে না।
যদিও মাঠপর্যায়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর সীমিত পরিসরে খুচরা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অভিযান আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
সরকার ও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, গত দুই মাসে যে পরিমাণ এলপিজি আমদানি হয়েছে তা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট। তাহলে বাজারে সংকট কেন—তা অনুসন্ধান করা জরুরি বলে মনে করছেন জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা। জ্বালানি বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা অন্য সময়ের তুলনায় বেশি সিলিন্ডার মজুত করে রেখেছেন কিনা—কোম্পানিগুলো সম্মিলিতভাবে চাইলে সেই তথ্য যাচাই করা সম্ভব।
মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বৈঠক শেষে যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, বাজারে বাড়তি দাম নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, আমদানির পরিমাণ বিবেচনায় কোনও সংকট নেই। তবে, ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর কিছু অপারেটর আমদানি কমিয়ে দিয়েছে বলেও তিনি জানান। যারা নিয়মিত আমদানি করছে, তাদের আমদানির পরিমাণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বাজার তদারকির জন্য ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে, অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রিকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)। সংগঠনটির সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ আহসানুল জব্বার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, কিছু খুচরা বিক্রেতা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করছেন। এতে ভোক্তারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং বাজারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের হস্তক্ষেপ জরুরি বলে জানান তিনি।
রিপোর্টারের নাম 























