ঢাকা ১২:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ ৯ এনবিএফআইয়ের শেয়ার শূন্য হচ্ছে

ব্যাংকখাতে সংস্কারের ধারাবাহিকতায় এবার ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (এনবিএফআই) বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার শূন্য করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহের মধ্যেই এসব প্রতিষ্ঠানকে আনুষ্ঠানিকভাবে অকার্যকর বা ‘নন-ভায়েবল’ ঘোষণা করা হবে। এরপর ফরেনসিক অডিটের মাধ্যমে তাদের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা ও নেট অ্যাসেট ভ্যালু (এনএভি) নির্ধারণ করা হবে। অডিট প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সোমবার (৫ জানুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এসব তথ্য জানান।

গভর্নর বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদের প্রকৃত অবস্থান কতটা নেতিবাচক, তা ফরেনসিক অডিট শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। অডিট রিপোর্ট হাতে পেলেই পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।’

তিনি জানান, দীর্ঘদিনের দুর্বল ব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও দায়ভার সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। গ্রাহকের স্বার্থ সুরক্ষা এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল লক্ষ্য।

গভর্নর আরও জানান, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান তদারকির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি নতুন ‘ব্যাংকিং রেজুলেশন ডিভিশন’ গঠন করা হয়েছে। কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়াই হবে এই বিভাগের প্রধান কাজ। ইতোমধ্যে পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক দিয়ে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রয়োজনে ভবিষ্যতে আরও প্রতিষ্ঠান এই কাঠামোর আওতায় আসতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে বহু এনবিএফআই গভীর সংকটে পড়ে। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ বর্তমানে গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে অক্ষম। এর মধ্যে চারটি প্রতিষ্ঠান বহুল আলোচিত প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের নিয়ন্ত্রণাধীন বলে জানা গেছে। এছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলমের একটি প্রতিষ্ঠানও এই তালিকায় রয়েছে।

সব মিলিয়ে নয়টি এনবিএফআইয়ের নিবন্ধন সনদ বা লাইসেন্স বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), এফএএস ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স ও প্রিমিয়ার লিজিং।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানতের পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের জমা রয়েছে ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা এবং ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের আমানত ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা।

ব্যক্তি আমানতকারীদের সবচেয়ে বেশি অর্থ আটকে আছে পিপলস লিজিংয়ে—১ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। এছাড়া আভিভা ফাইন্যান্সে ৮০৯ কোটি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৬৪৫ কোটি এবং প্রাইম ফাইন্যান্সে ৩২৮ কোটি টাকা আটকে রয়েছে।

ক্ষুদ্র আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধের জন্য সরকারকে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই অর্থ দিয়ে পর্যায়ক্রমে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমে ২০টি এনবিএফআই বন্ধের উদ্যোগ নিলেও ১১টি প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন পরিকল্পনা জমা দেয়। ওই পরিকল্পনায় সন্তুষ্ট হয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আপাতত সেসব প্রতিষ্ঠান চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রধানমন্ত্রীর নতুন বাসভবন: মাটির নিচে অত্যাধুনিক বাংকার ও টানেল নির্মাণের পরিকল্পনা

গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ ৯ এনবিএফআইয়ের শেয়ার শূন্য হচ্ছে

আপডেট সময় : ১০:৫৫:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬

ব্যাংকখাতে সংস্কারের ধারাবাহিকতায় এবার ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (এনবিএফআই) বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার শূন্য করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহের মধ্যেই এসব প্রতিষ্ঠানকে আনুষ্ঠানিকভাবে অকার্যকর বা ‘নন-ভায়েবল’ ঘোষণা করা হবে। এরপর ফরেনসিক অডিটের মাধ্যমে তাদের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা ও নেট অ্যাসেট ভ্যালু (এনএভি) নির্ধারণ করা হবে। অডিট প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সোমবার (৫ জানুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এসব তথ্য জানান।

গভর্নর বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদের প্রকৃত অবস্থান কতটা নেতিবাচক, তা ফরেনসিক অডিট শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। অডিট রিপোর্ট হাতে পেলেই পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।’

তিনি জানান, দীর্ঘদিনের দুর্বল ব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও দায়ভার সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। গ্রাহকের স্বার্থ সুরক্ষা এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল লক্ষ্য।

গভর্নর আরও জানান, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান তদারকির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি নতুন ‘ব্যাংকিং রেজুলেশন ডিভিশন’ গঠন করা হয়েছে। কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়াই হবে এই বিভাগের প্রধান কাজ। ইতোমধ্যে পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক দিয়ে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রয়োজনে ভবিষ্যতে আরও প্রতিষ্ঠান এই কাঠামোর আওতায় আসতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে বহু এনবিএফআই গভীর সংকটে পড়ে। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ বর্তমানে গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে অক্ষম। এর মধ্যে চারটি প্রতিষ্ঠান বহুল আলোচিত প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের নিয়ন্ত্রণাধীন বলে জানা গেছে। এছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলমের একটি প্রতিষ্ঠানও এই তালিকায় রয়েছে।

সব মিলিয়ে নয়টি এনবিএফআইয়ের নিবন্ধন সনদ বা লাইসেন্স বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), এফএএস ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স ও প্রিমিয়ার লিজিং।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানতের পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের জমা রয়েছে ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা এবং ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের আমানত ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা।

ব্যক্তি আমানতকারীদের সবচেয়ে বেশি অর্থ আটকে আছে পিপলস লিজিংয়ে—১ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। এছাড়া আভিভা ফাইন্যান্সে ৮০৯ কোটি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৬৪৫ কোটি এবং প্রাইম ফাইন্যান্সে ৩২৮ কোটি টাকা আটকে রয়েছে।

ক্ষুদ্র আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধের জন্য সরকারকে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই অর্থ দিয়ে পর্যায়ক্রমে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমে ২০টি এনবিএফআই বন্ধের উদ্যোগ নিলেও ১১টি প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন পরিকল্পনা জমা দেয়। ওই পরিকল্পনায় সন্তুষ্ট হয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আপাতত সেসব প্রতিষ্ঠান চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।