প্রতিদিনের মতো মার্সেইয়ের সৈকত ধরে স্কুলে যাচ্ছিল কয়েকটি শিশু। তারাই ১৫ বছর বয়সি আদেলের নিথর দেহ খুঁজে পায়। প্রায় একই সময় তার মা-বাবা নিখোঁজ ছেলের জন্য থানায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, আদেলকে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর তার মরদেহে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় অপরাধীরা। সমুদ্রতীরে ঘটে যাওয়া সেই নৃশংস ঘটনার ভিডিও কেউ একজন ধারণ করেছিল। ফ্রান্সের এই বন্দরনগরীতে মাদকচক্রের ক্রমবর্ধমান সহিংসতার এক বলি ছিল আদেল—যেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে মাদক কেনাবেচা এবং চক্রে লোক নেওয়া হচ্ছে। নতুন কর্মীদের বড় একটা অংশ শিশু বা কিশোর।
কুড়ির কোঠায় থাকা এক গ্যাং সদস্য বিবিসিকে বলে, এখন সবকিছুতে বিশৃঙ্খলা। ১৫ বছর বয়স থেকে এ লাইনে আছি। কিন্তু এখন সব পাল্টে গেছে। আগের নিয়ম-শৃঙ্খলা নেই। বড়রা শিশুদের ব্যবহার করছে। সামান্য কয়টা অর্থের বিনিময়ে তাদের কাজ করানো হয়। আর অকারণে সহিংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পুরো শহরজুড়েই অরাজকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ফরাসি বিচার মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত আট বছরে মাদকবাণিজ্যে কিশোরদের সম্পৃক্ততা চার গুণেরও বেশি বেড়েছে।
শহরজুড়ে আতঙ্ক
মার্সেইজুড়ে পুলিশ, রাজনীতিক, আইনজীবী ও স্থানীয় কর্মীরা বলছেন, শহরের বহু এলাকায় এক ধরনের সমষ্টিগত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, কঠোর দমননীতিই কি যথেষ্ট, নাকি দীর্ঘদিনের দারিদ্র্যের মূল কারণগুলোই মোকাবিলা করা জরুরি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী আইনজীবী বলেন, এটা মারাত্মক ভীতিকর পরিবেশ। মাদকচক্ররা এখন প্রভাবশালী, প্রতিদিনই তাদের দৌরাত্ম বাড়ছে। আইন-শৃঙ্খলা এখন গ্যাংয়ের অধীনস্থ হয়ে পড়েছে। তাই তিনি গ্যাং-সহিংসতার শিকারদের মামলা নেওয়া বন্ধ করেছেন।
কমিউনিটি সংগঠক মোহাম্মদ বেনমেদদুর বলেন, মাদকবাণিজ্যে মানুষ যে কোনও কিছু করতে প্রস্তুত। ১৩ কি ১৪ বছরের বাচ্চারা পাহারাদার বা ছোটখাটো ডিলার হিসেবে কাজ করছে। তারা প্রতিদিনই সহিংসতার ঘটনা শুনছে ও দেখছে। ফলে ভয় হারিয়ে ফেলছে—মৃত্যু তাদের কাছে ডালভাত।
হুঁশিয়ারি দিতেও হত্যা
বর্তমান আতঙ্কের নতুন মাত্রা যুক্ত হয়, গত মাসে মেহদি কেসাসি নামে এক পুলিশ সদস্যের হত্যাকাণ্ডের পর। মাত্র ২০ বছর বয়সী প্রশিক্ষণরত পুলিশ সদস্য মেহদির কোনও মাদকচক্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল না। ধারণা করা হয়, তার ভাই—২২ বছর বয়সী গ্যাংবিরোধী কর্মী ও উদীয়মান রাজনীতিক আহমেদ কেসাসিকে হুঁশিয়ার করতে ওই হত্যাকাণ্ড হয়।
পুলিশের কঠোর নিরাপত্তায় থাকা আহমেদ আক্ষেপ করে বিবিসিকে বলেন, পরিবারের সবাইকে কি আমার আগেই সরিয়ে নেওয়া উচিত ছিল? এই অপরাধবোধ নিয়ে রীতিমতো লড়াই করে আমার এখন বেঁচে থাকতে হবে।
২০২০ সালে তার বড় ভাই ব্রাহিম—যিনি একসময় গ্যাংয়ের সাথে যুক্ত ছিলেন—হত্যার পর থেকেই আহমেদ পরিচিত হয়ে ওঠেন।
তিনি বলেন, কোভিডের পর সবকিছু বদলে গেছে। মাদক অপরাধে জড়িত এবং তাদের শিকার- দুপক্ষের বয়সই কমছে। আমার ছোট ভাই ছিল সম্পূর্ণ নির্দোষ। আগে গ্যাংগুলো কিছু সীমা মেনে চলত—দিনেদুপুরে, জনসমক্ষে সহিংসতা এড়িয়ে চলত। এখন এসব নিয়ম উধাও হয়ে গেছে।
মাদকের ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি সিস্টেম’
ডিজেড মাফিয়া নামের একটি বড় গ্যাং এখন মাদকবাণিজ্যের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ করছে, এটি বিভিন্ন ছোট গ্রুপকে দায়িত্ব ভাগ করে দেয়। এসব গ্রুপে অনেক সময় কিশোর, এমনকি কাগজবিহীন অভিবাসীদেরও জোর করে কাজে লাগানো হয়, আর তারা একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে।
ধারণা করা হয়, মার্সেইতে প্রায় ২০ হাজার মানুষ এই বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। শুধু গত বছরই মাদক বাণিজ্যে ৪২ মিলিয়ন ইউরো মূল্যের দ্রব্য জব্দ করা হয়েছে।
টিকটকে নিয়মিতই দেখা যায় মাদক বিক্রির বিজ্ঞাপন, যেখানে কোকেন, হাশিশ বা মারিজুয়ানার জন্য আলাদা ইমোজি ব্যবহার করা হয়। আবার নতুন সদস্য নেওয়ার বিজ্ঞাপন থাকে—“কর্মী চাই”, “পাহারা দিলে ২৫০ ইউরো”, “মাল বহন করলে ৫০০ ইউরো” ইত্যাদি।
প্রধান প্রসিকিউটর নিকোলা বেসোন বলেন, এটা এল ডোরাডো (গল্পের স্বর্ণনগর) নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রলুব্ধ হয়ে, দৈনিক ২০০ ইউরো কামাতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে তরুণরা মার্সেইতে আসে। কিন্তু শেষটা হয় যন্ত্রণা, সহিংসতা কিংবা মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।
তিনি আরও জানান, মাদকচক্ররা কিশোরদের ওপর ভুয়া ঋণের বোঝা চাপিয়ে তাদের নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরায়। অল্প টাকা হারালেও হুমকি বা শাস্তি দেয়।
এক নারী আইনজীবী বলেন, এক তরুণ, যে কোনওভাবেই এসবে যুক্ত হতে চায়নি, তাকে স্কুল শেষে জোর করে তুলে নেওয়া হয়। এরপর তাকে মারধর এবং ধর্ষণ করে কাজে বাধ্য করা হয়। তাকে ও তার পরিবারকে ভয় দেখানো, হুমকি দেওয়া-সবই করা হয়। কর্মী নিতে তারা সব পদ্ধতি ব্যবহার করে।
সমাধান নিয়ে মতবিরোধ
ডানপন্থী রাজনীতিবিদ ফ্রাঙ্ক আলিসিও দাবি করছেন, কঠোর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং কড়া অভিবাসননীতি ছাড়া সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। অতিরিক্ত অভিবাসন এখন মাদকবাণিজ্যের বড় কারণ।
তবে সমালোচকরা বলছেন, ন্যাশনাল র্যালি দল জনভিত্তিক ক্ষোভকে উসকে দিচ্ছে এবং ভুলভাবে অভিবাসীদের দায়ী করছে।
মাদকবাণিজ্য বিষয়ক লেখক ফিলিপ প্যুজোল বলেন, সহিংসতার কারণ শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়—এটা বহু বছরের দারিদ্র্য, অবহেলা, দুর্নীতি ও ভুল নীতির ফল।
তিনি আরও বলেন, দলবদ্ধ অবস্থায় এই কিশোররা ভয়াবহ বখে যাওয়া আচরণ করে, কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু একাকী কথা বললে দেখবেন, তারা এখনও শিশু—তাদেরও স্বপ্ন আছে। তারা সহিংসতায় জীবন কাটাতে চায় না।
সূত্র: বিবিসি
রিপোর্টারের নাম 



















