নারীদের বৈষম্য ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সমাজে হাসিঠাট্টার শেষ নেই। অথচ বহু বছর ধরে বেশ যত্নের সঙ্গে নারীদের মস্তিষ্কের বারোটা বাজাচ্ছে সমাজে বিদ্যমান বৈষম্য। দৈনন্দিন জীবনে সহ্য করা সূক্ষ্ম লিঙ্গবৈষম্যমূলক আচরণ সাধারণত পাত্তা দেন না নারীরা। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, বহু বছরের বিদ্বেষমূলক আচরণের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক প্রভাব রয়েছে। এমনকি এর কারণে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশের কোষ ক্ষয় হতে পারে।
অনেক নারীরই দিন বা রাতে ক্যাটকলিংয়ের (যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্য) শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। দুর্ভাগ্যক্রমে নারীরা এরসঙ্গে নিয়মিত মানিয়ে চললেও, তাৎক্ষণিকভাবে তাদের শরীরে ও মনে যে তীব্র চাপ তৈরি হয়, তা দেহকে সংক্রিয়ভাবে আত্মরক্ষা ধাপে নিয়ে যায়, ফলে শরীর কাপা এবং দুর্বল বোধ করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্য তাৎক্ষণিক হুমকি হয় না এবং সমাজে নারীদেরই উলটো ‘ভিক্টিম ব্লেমিং’ করা হয় বলে, অনেক সময় এসব নারীরা এড়িয়ে যান। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, এর স্থায়ী মানসিক ক্ষতিকর প্রভাব নেই। নতুন গবেষণা বলছে, প্রতিদিনকার সাধারণ লিঙ্গবৈষম্য মানুষের শরীর ও জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
নারীদের স্বাস্থ্যের ওপর এসব প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান না হলেও তা গুরুতর হতে পারে। ২৯টি দেশের সাত হাজার ৮০০’র বেশি ব্রেইন স্ক্যান বিশ্লেষণ করে এক বৃহৎ গবেষণায় দেখা গেছে, সমাজে লিঙ্গবৈষম্য নারীর মস্তিষ্কে গাঠনিকভাবে বদলে ফেলে, এবং তা নেতিবাচকভাবে।
অধিক বৈষম্যমূলক দেশগুলোতে নারীদের কর্টিকাল থিকনেস কম পাওয়া গেছে। এই অংশ আবেগ নিয়ন্ত্রণ, মানসিক স্থিতি, বিষণ্নতা বা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
চিলির পন্টিফিকাল ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটির মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিকোলাস ক্রসলি বলেন, নারীরা যে বৈষম্যের মুখোমুখি হন, তা যেন “মস্তিষ্কে দাগ ফেলে।” প্লাস্টিসিটি প্রক্রিয়ার কারণে, বৈষম্য থেকে সৃষ্ট চাপ মস্তিষ্ককে পরিবর্তিত করতে পারে। প্লাস্টিসিটি হচ্ছে মস্তিষ্কের সে পদ্ধতি, যার কারণে এটি জীবনভর কিছু শিখতে পারে। যেমন ব্যাটিং করতে শিখলে মস্তিষ্ক ওই কাজে যথাযথ প্রতিক্রিয়া দেখানোর জন্য পরিবর্তিত হয়। তেমনি সমাজে সারাজীবন অবমূল্যায়ন মোকাবিলা করার অভিজ্ঞতা স্থায়ী প্রভাব ফেলবে। দীর্ঘস্থায়ী চাপ মস্তিষ্কের অভিযোজন ক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যেসব দেশে নারীরা কম বৈষম্যের শিকার হন, সেসব দেশে এই মস্তিষ্কগত পার্থক্য অনেক কম দেখা গেছে। পুরুষদের ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে কম ছিল, যদিও সবচেয়ে বৈষম্যমূলক দেশগুলোতে পুরুষরাও কিছুটা ক্ষতির শিকার হন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। ক্রসলির মতে, যদি লিঙ্গসমতার উন্নতি হয়, নারীদের স্বাস্থ্য উন্নত হবে।
গত এক শতাব্দিতে নারী অধিকার আন্দোলনে বহু সাফল্য এসেছে। বহু দেশে সমান বেতন এখন আইনগত বাধ্যবাধকতা এবং লিঙ্গ বৈষম্য নিষিদ্ধ। যুক্তরাজ্যে তিনজন নারী প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন এবং বিশ্বব্যাপীও নারী নেতৃত্ব বাড়ছে।
তবে যুক্তরাজ্যসহ বহু দেশে লিঙ্গসমতা স্থবির হয়ে আছে বা পিছিয়ে যাচ্ছে বলেও উদ্বেগের জায়গা রয়েছে। লিঙ্গভিত্তিক মজুরিবৈষম্য রয়ে গেছে এবং নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে। প্রায় দুদশক উন্নতির পর, তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে বছরে বছরে নারীদের জীবনমান তলাবিহীন কুয়োর ধরে নেমে যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী পরিস্থিতি ভয়াবহ উদ্বেগজনক। প্রায় প্রতি তিনজন নারীর একজন জীবনে শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। পাশাপাশি রয়েছে প্রতিদিনের ক্ষুদ্র কিন্তু ছাপ রেখে যাওয়ার মতো বৈষম্য—যেমন কাউকে হেয় করা, বা “নারীরা বেশি আবেগপ্রবণ, পুরুষেরা বেশি যুক্তিনিষ্ঠ” ধরনের মন্তব্য। এগুলো ক্ষতিকর লিঙ্গধারণাকে জিইয়ে রাখে এবং নারীর ক্ষমতায়ন কমায়।
লিঙ্গ-বৈষম্যের মানসিক স্বাস্থ্যপ্রভাব অন্যান্য গবেষণাতেও পাওয়া গেছে। যুক্তরাজ্যের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা লিঙ্গবৈষম্যের শিকার হন, চার বছর পর তাদের মানসিক স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যায়। প্রায় তিন হাজার নারীর ওপর চালানো ওই গবেষণায় প্রতি পাঁচজনের একজন বৈষম্যের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন—হয় জনসমক্ষে নিরাপত্তাহীনতা, নয় অপমান, কিংবা শারীরিক আক্রমণ। এরা মানসিক চাপে ভোগার সম্ভাবনায় তিনগুণ বেশি এবং জীবনে সন্তুষ্টিও কম।
কিংস কলেজ লন্ডনের স্বাস্থ্যমনোবিজ্ঞানী রুথ হ্যাকেট বলেন, পুনঃপুন চাপের অভিজ্ঞতা শরীরে ক্ষয় সৃষ্টি করে, যা পরবর্তীতে মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি মানুষকে ভেঙে ফেলে।
হ্যাকেটের পরবর্তী গবেষণায় বয়স্ক নারীদের ক্ষেত্রেও একই ফল পাওয়া গেছে—যারা হয়রানি বা অসম আচরণের শিকার হয়েছেন, তাদের ছয় বছর পর মানসিক স্বাস্থ্য অবনতি, একাকিত্ব বৃদ্ধি এবং জীবনসন্তুষ্টি কমে যায়।
অন্যদিকে, গবেষণা বলছে, বেশি লিঙ্গসমতাপূর্ণ সমাজে নারীদের মধ্যে বিষণ্নতার হার কম, এবং সমতাভিত্তিক সম্পর্কেও একই প্রবণতা দেখা যায়।
শুধু মানসিক নয়, নারীদের শারীরিক স্বাস্থ্যসেবাতেও বৈষম্য রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে নারীর ব্যথা বা শারীরিক সমস্যাকে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের এক গবেষণায়ও দেখা গেছে, একই উপসর্গ থাকা সত্ত্বেও নারীদের কম ব্যথানাশক প্রেসক্রিপশন দেওয়া হয়।
হোমান ব্যাখ্যা করেন, স্ট্রাকচারাল সেক্সিজম নারীদের সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদে—যেমন ন্যায্য বেতন প্রাপ্তি বা নিজের মতো চলার অধিকার কমিয়ে দেয়। পাশাপাশি ডমেস্টিক ভায়োলেন্স, ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্র ও দীর্ঘমেয়াদি চাপের ঝুঁকিও বাড়ায়।
পুরুষদের ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। বেশি বেতন বা কম গৃহকর্মের সুবিধা থাকলেও, নেতিবাচক পুরুষালি আচরণ, যেমন অহেতুক ঝুঁকি নেওয়া, সহিংসতা, মাদকাসক্তি বা চিকিৎসা এড়িয়ে যাওয়ার মতো অভ্যাস তারা লালন করতে শেখে। প্রায় ১৯ হাজার জনকে নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, নারীর ওপর আধিপত্য ও যৌন আগ্রাসনের মতো পুরুষত্ব ধারণ করলে মানসিক স্বাস্থ্য খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। গবেষণায় বলা হয়েছে, সেক্সিজম শুধু সামাজিক অবিচার নয়—এটি যারা এসব মানসিকতা ধারণ করে তাদের জন্যও ক্ষতিকর।
অর্থাৎ কঠোর পুরুষালি বৈশিষ্ট্য ধরে রাখলে পুরুষরাও দীর্ঘস্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যে ব্যবস্থা পুরুষকে সুবিধা দেয়, তা ই পুরুষত্বের অবাস্তব ধারণা চাপিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব
এই অবস্থার পরিবর্তনে ব্যক্তিগত ও সামাজিক উভয় উদ্যোগ প্রয়োজন। ছোটবেলা থেকেই লিঙ্গ-ধারণা ও উপযুক্ত আচরণ নিয়ে শিশুদের শেখাতে পারেন অভিভাবকরা। কারণ তিন মাস বয়স থেকে লিঙ্গধারণা গঠন শুরু হতে পারে। ঘরেও লিঙ্গভিত্তিক প্রচলিত ধারণা চ্যালেঞ্জ করা প্রয়োজন। কারণ “হোস্টাইল ম্যাসকিউলিনিটি”—যা নারীর প্রতি বিদ্বেষ তৈরি করে—নারী সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ায়।
সমাজিক পর্যায়ে আইন সংস্কার করে বৈষম্য কমানো যায়—যেমন পুরো পরিবারের জন্য সবেতন ছুটি। নর্ডিক দেশগুলোতে এই ছুটি দেওয়া হয় ‘ইউজ ইট অর লুজ ইট’ পদ্ধতিতে, অর্থাৎ ছুটি সময়মতো না কাটালে পরে তা দেওয়া হবে না। এরপর থেকে পুরুষদের পিতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়া বেড়েছে। এতে ঘরে তাদের সময় দেওয়া হার বৃদ্ধি পাওয়ায় নারীর জীবনে স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করেছে। এতে পুরুষত্বের ‘টক্সিক’ প্রবণতা ‘কেয়ারিং’ এর দিকে পরিবর্তিত হয়।
হোমানের মতে, নারীরা ক্ষমতায় গেলে সমাজই উপকৃত হয়—স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তায় বেশি বিনিয়োগ হয়। বিপরীতে, স্ট্রাকচারাল সেক্সিজম বাড়লে এসব খাতে বিনিয়োগ কমে—যার ক্ষতি সবার, এমনকি পুরুষদেরও।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, লিঙ্গবৈষম্যের ক্ষতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা সচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলা মানসিক স্বাস্থ্যেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে ব্যক্তিগত পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়—কারণ সমস্যা কাঠামোগত।
বর্তমান প্রমাণ দেখায়, নারীরা এখনো নিরাপদ ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ থেকে অনেক দূরে। তবে পরিবর্তন সম্ভব, যদি আরও মানুষ এই বিষয়ে সরব হয়।
সূত্র: বিবিসি
রিপোর্টারের নাম 



















